সবুজ শিশির গেরুয়া হবেন রাজ্যসভায় গিয়ে?

সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় অথবা তাঁর স্ত্রী ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়, দু'জনকেই 'ওপেন অফার' দেওয়া আছে। যে কোনও একজন রাজি হলেই, রাজ্যসভার মনোনীত সাংসদ হিসেবে নাম ঘোষণা করতে এক মুহূর্তও বাড়তি সময় নেবেন না রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। সেই 'মাহেন্দ্রক্ষণ'-এর অপেক্ষায় আছে কেন্দ্রের শাসক দলও।

 

কিন্তু বেহালা থেকে ইতিবাচক উত্তর দিল্লিতে যদি না যায়? কী হবে তখন? তাহলে কে হবেন রাষ্ট্রপতি-মনোনীত রাজ্যসভার সাংসদ? তাই সময় অপচয় না করে প্ল্যান বি চূড়ান্ত করতে চাইছে বিজেপি। আর এখানেই সম্ভবত বেনজির এক চমক অপেক্ষা করছে।

 

বাংলা থেকে রাষ্ট্রপতি মনোনীত সাংসদ হিসেবে এতদিন রাজ্যসভায় ছিলেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায় এবং স্বপন দাশগুপ্ত। সম্প্রতি দু’জনেরই মেয়াদ শেষ হয়েছে। স্বপনবাবু সম্ভবত ফের সদস্য হচ্ছেন‌। দ্বিতীয় আসনে শাসক দলের প্রথম পছন্দ সৌরভ অথবা ডোনা। গঙ্গোপাধ্যায় দম্পতি বিজেপি-র প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে কট্টর বিরোধী দলের প্রবীণ এক 'সিটিং' লোকসভা সাংসদকে মনোনীত সদস্য হিসেবে রাজ্যসভায় পাঠানো যায় কি না, তা নিয়ে গভীর ভাবনাচিন্তা করছেন মোদি- শাহ। এমন কাণ্ড সত্যিই ঘটলে, তা হবে দেশের সংসদীয় রাজনীতির আঙিনায় বিরল এক ঘটনা।

 

আরও পড়ুন: বিপ্লব দেবকে কেন সরানো হল! ভোটের আগেই ত্রিপুরায় আত্মসমর্পণ বিজেপির?

 

বাংলা সফরে এসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গত ৬ মে সোজা পৌঁছে গিয়েছিলেন সৌরভের বাড়িতে। প্রকাশ্যে যতই বলা হোক, ওটা ছিল নেহাতই নৈশভোজের আমন্ত্রণ, রাজনৈতিক মহল কখনওই তা মানতে চায়নি। শাহ-কে যাঁরা খুব ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন, তাঁরা জানেন, ঠাসা কর্মসূচি নিয়ে কলকাতায় আসা অমিত শাহ স্রেফ ডিনার করতে শহরের আর এক প্রান্তে গিয়ে এক ঘণ্টা কাটিয়ে আসবেন না। এমন ধাতের মানুষই নন শাহ। তখনই জল্পনা শুরু হয়, সৌরভ, না ডোনা, কে হতে চলেছেন রাষ্ট্রপতি মনোনীত রাজ্যসভার সাংসদ। গঙ্গোপাধ্যায় পরিবার এই নিয়ে মুখ না খোলায় আজ পর্যন্ত বিষয়টি জল্পনার স্তরেই রয়েছে। তাই বিকল্প নাম প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে গেরুয়া শিবির।

 

বিকল্প নামে চমক আছে। সোমবারই সামনে এসেছে সেই নাম। গেরুয়া শিবির সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে, কাঁথির তৃণমূল সাংসদ শিশির অধিকারীকে মনোনীত সদস্য হিসেবে রাজ্যসভায় পাঠাতে পারে বিজেপি। কেন্দ্রীয় সরকারের সুপারিশ মেনে তাঁকে রাজ্যসভায় সাংসদ হিসেবে মনোনীত করতে পারেন রাষ্ট্রপতি। এর আগে শোনা গিয়েছিল, উত্তর পূর্বের ছোট কোনও রাজ্যের রাজ্যপাল করা হবে শিশিরবাবুকে। কিন্তু শারীরিক কারণে বাড়ি ছেড়ে দূরে যেতে রাজি হননি তিনি। তাই এবার বিকল্প ভাবনা৷ পুত্র শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে শিশিরবাবুও তৃণমূলের সঙ্গে কার্যত সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। বেশ কিছুদিন ধরেই শিশিরবাবুর শরীর তৃণমূলে থাকলেও, মন রয়েছে গেরুয়া শিবিরের সঙ্গে। এই মুহূর্তে শিশির অধিকারীর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে যে ধোঁয়াশা রয়েছে, সেই ধোঁয়াশা এবার বোধহয় কাটতে পারে। তৃণমূলের অভিযোগ, বিধানসভা এবং পুরসভা নির্বাচনে শিশির অধিকারী বিজেপির হয়ে প্রচার করেছেন। ঘাসফুল শিবির থেকে দাবি করা হয়, শিশির অধিকারী বিজেপি করতেই পারেন, তবে তার আগে তৃণমূলের টিকিটে জেতা শিশিরবাবু লোকসভার সাংসদ পদে ইস্তফা দিন।

 

শিশিরবাবু দীর্ঘদিনের রাজনীতিক। নানা রকম জনপ্রতিনিধি হিসেবেও তিনি পার করেছেন কয়েক দশক। তিনি জানেন, এক দলের টিকিটে সাংসদ নির্বাচিত হয়ে প্রকাশ্যে বা গোপনে অন্য দলের স্বার্থরক্ষা করার কাজ চালানো, বিশ্বাসঘাতকতাই শুধু নয়, বেআইনিও বটে। ওদিকে মোদি-শাহকে বিদ্ধ করে বিরোধীদের এই প্রশ্নও উঠেছে, বিজেপি-র শীর্ষ মহল শিশিরবাবুর এই চরম অনৈতিক কাজে প্রশ্রয় দিচ্ছেন কেন? শিশিরবাবু এটাও জানেন, বিজেপি-র টিকিটে নির্বাচিত বিধায়ক মুকুল রায় এই মুহূর্তে কোন দলে আছেন, তা জানতে পিলার-টু-পোস্ট দৌড়চ্ছেন, আদালতে ছুটছেন, তাঁর পুত্র শুভেন্দু অধিকারী। শিশিরবাবু এটাও জানেন, তিনিও এই একই অভিযোগে অভিযুক্ত। আর তাঁর এই আচরণের কারণে নিত্যদিন কথা শুনতে হচ্ছে শুভেন্দুকে। মুকুল রায় কোন দলে আছেন, এই প্রশ্ন যখনই শুভেন্দু করেন, তখনই তৃণমূলের পাল্টা চিমটি, তাহলে শিশির অধিকারী এখন কোন দলে আছেন? ফলে বিব্রত হতে হয় শুভেন্দুকে। বিশেষ কোনও কারণে সম্ভবত তৃণমূল কংগ্রেস এই ইস্যু নিয়ে আদালতে যাচ্ছে না। তাই আইন-আদালত এখনও পর্যন্ত শিশিরবাবুরা এড়াতে পারলেও, জনতার আদালত এই মামলার রায় ঘোষণা করে দিয়েছে কাঁথি পুরভোটের ফল প্রকাশের দিন। ওই রায়ে কাঁথির মানুষ অধিকারীদের নির্বাসনের সাজা দিয়েছে‌। সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতেই সম্ভবত শুভেন্দু চেয়েছিলেন শিশিরবাবুকে মনোনীত সদস্য করে রাজ্যসভায় পাঠানো হোক।



এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে বিজেপির শীর্ষ মহলে ভাবনাচিন্তা করার মাঝেই কাঁথিতে শিশির অধিকারীর বাড়িতে যান দিলীপ ঘোষ। সর্বভারতীয় বিজেপির সহ-সভাপতি পদে থাকা দিলীপবাবুকেই দল দায়িত্ব দেয় শিশিরবাবুর সঙ্গে প্রস্তাবটি নিয়ে কথা বলার জন‍্য। দিলীপ ঘোষ কথাও বলেছেন প্রবীণ এই তৃণমূল সাংসদের সঙ্গে। শুধুই হাজির হওয়া নয়, দুপুরে একসঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়াও সারেন শিশির-দিলীপ। এই ধরনের 'চমক' দেখানোর মোলাকাত পর্বকে রাজনীতির ভাষায় বলা হয় 'সৌজন্য সাক্ষাৎ'। দিলীপ ঘোষও সেই পথেই হেঁটেছেন। দাবি করেছেন, “এটি নেহাতই সৌজন্য সাক্ষাৎ। রাজনীতির সঙ্গে কোনও সম্পর্কই নেই।" দিলীপ ঘোষ একথা বলেছেন বটে, কিন্তু কাঁথিতে শিশিরবাবুর অফিসেই দলীয় কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক সারেন বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি। এই সাক্ষাৎকার নিয়ে রীতিমতো আলোড়ন পড়ে রাজ্য রাজনৈতিক মহলে। তখন ঠিক স্পষ্ট না হলেও পরে জানা যায়, শিশির অধিকারীকে মনোনীত সদস্য করে রাজ্যসভায় পাঠানো নিয়ে দলের সর্বোচ্চ মহলের প্রস্তাব নিয়েই দিলীপবাবু সেদিন মোলাকাত করেন কাঁথির শান্তিকুঞ্জের বড়কর্তার সঙ্গে। এদিকে শিশিরবাবুর মনোনীত সাংসদ হওয়ার বিষয়টি নিয়ে গেরুয়া শিবির আপাতত মুখে কুলুপ এঁটেছে। রাজ্য বিজেপির সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলেছেন, ‘‘এসব দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়, কোনও মন্তব্য করব না।’’ শিশির অধিকারী জানিয়েছেন, তিনি এই ব্যাপারে কিছুই জানেন না।

 

রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, অসংখ্য 'সক্রিয়' মুখ বিজেপির কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও গেরুয়া শিবির কেন এই মুহূর্তে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় শিশির অধিকারীকে রাষ্ট্রপতি মনোনীত সাংসদ হিসেবে রাজ্যসভার পাঠাতে চাইছে? বিজেপির যুক্তি, পূর্ব মেদিনীপুরের রাজনীতিতে শিশিরবাবুর প্রভাব আজও অস্বীকার করা যায় না। রাজ্যসভার সাংসদ হলে তিনি সক্রিয়ভাবেই বিজেপির হয়ে কথা বলতে পারবেন। আসন্ন পঞ্চায়েত বা লোকসভা নির্বাচনে পূর্ব মেদিনীপুরের বিজেপির কাছে তা ইতিবাচক হবে।

 

সবই মোটামুটি ঠিকঠাক থাকলেও ছোট একটা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সাধারণত শিল্পকলা, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও সামাজিক কাজের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান থাকলে তবেই দেশের রাষ্ট্রপতি কাউকে রাজ্যসভায় মনোনীত সদস্য করেন। প্রশ্ন উঠেছে, শিশির অধিকারীকে তাহলে ঠিক কোন বিভাগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হবে? সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে একটা আপাত-দুর্বল সমাধানসূত্র বিজেপি হাতে পেয়েছে। রাষ্ট্রপতির মনোনয়নে যেহেতু 'সামাজিক কাজের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান' কথাটি রয়েছে, তাই সহজেই রাজনৈতিক নেতা হিসেবে কয়েক দশক ধরে শিশিরবাবুর সামাজিক কাজকে তুলে ধরতে পারে বিজেপি।

 

এটাই একমাত্র পথ। এই যুক্তি আদালতে টিকবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে বলে জানা গিয়েছে।

 

সব অঙ্ক মিলে গেলে, কাঁথির তৃণমূল সাংসদ শিশির অধিকারী 'নিঃশব্দে বিপ্লব' ঘটাবেন। ছিলেন জোড়াফুল, হবেন পদ্মফুল। ছিলেন লোকসভায়, যাবেন রাজ্যসভায়। ছিলেন সবুজ, হবেন গেরুয়া।

More Articles

;