ওষুধ হিসেবে যাত্রা শুরু, যেভাবে বাড়ল টমেটো সসের রমরমা..

History of Tomato Ketchup: ১৮৩০ নাগাদ টমেটো কেচাপের ব্যবহার শুরু হয় ওষুধ হিসেবে। ডায়রিয়া, বদহজম এমনকী জন্ডিস সারাতেও নাকি অব্যর্থ ছিল ওই সস।

Sohini Das
৩ মিনিট
ওষুধ হিসেবে যাত্রা শুরু, যেভাবে বাড়ল টমেটো সসের রমরমা..

রোল হোক বা চাউমিন, সিঙাড়া হোক বা পকোরা, সঙ্গে একটু সস না-হলে চলে নাকি! খাবারে আরও একটু স্বাদ যোগ করতে এই সস বস্তুটির জুড়ি মেলা ভার। শুধু এখানে নয়, গোটা বিশ্ব জুড়েই সসের খদ্দের কিছু কম নেই। সসের প্রকারভেদেরও শেষ নেই। কোথাও সোয়া তো কোথাও চিলি। তবে সস বললেই আমাদের মাথায় যে ছবিটা সবার আগে ভেসে ওঠে, তা বোধহয় কাঁচের লম্বা বোতল ভর্তি টমেটো কেটাপ। যে কোনও সাদামাটা খাবারকে সুস্বাদু 'ইয়াম্মি' করে তুলতে অদ্বিতীয় এই ম্যাজিক উপকরণটি। রেস্তোরাঁ হোক গেরস্থবাড়ি, রান্নাঘরের ব়্যাক আলো করে এই একটি জিনিস থাকবেই। তবে এই টমেটো সস বা কেচাপের শুরুর গল্পটা জানেন কি? আদৌ কি খাবারকে সুস্বাদু করে তোলার উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি হয়েছিল খাবারটি? শোনা যায় যে টোমাটো কেচাপ খাবারে আলাদা মাত্রা এনে দেয়, তা একদিন তৈরি হয়েছিল শরীরের প্রয়োজনে। ঠিকই পড়ছেন, টক-ঝাল-মিষ্টি স্বাদের এই দুর্দান্ত জিনিসটির আবিষ্কার ওষুধ হিসেবেই।

খুঁজতে বেরিয়ে সুদূর চিনে টমেটো কেচাপের উৎস খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা। সেখানে নাকি Ge-thcup বা Koe-cheup নামে ডাকা হত সসকে। সেগুলি অবশ্য ছিল মাছ থেকে প্রস্তুত সস। এখনও ভারতের উত্তরপূর্বের এলাকাগুলিতে মাছের সস বেশ জনপ্রিয়। সোয়াবিন ও মাছ থেকে তৈরি হত এই ধরনের সসগুলি। স্বাদ ছিস অনেক বেশি নোনতা ধরনের। ১৭৩৬ সালে সসের ইতিহাসে আসল প্রথম মোড়। ছোট মাছ ও বাসি মদ ফুটিয়ে এক ধরনের তরল তৈরি করা হত। এরপর সেটাকে পচিয়ে তৈরি হত এক ধরনের সস। খাবারের সঙ্গে খেতে দিব্য লাগত ব্যপারটি। ক্রমে সেই রেসিপি পৌঁছে গেল চিন থেকে ইংল্যান্ডে। কিন্তু প্রথম বার টমেটো কেচাপ তৈরি হল ১৮১২ সালে। নেপথ্যে ছিলেন জেমস মিয়াজে নামে এক বিজ্ঞানী ও হর্টিকালচারিস্ট। তাঁর হাতেই তৈরি হয়েছিল টমেটো কেচাপের রেসিপি। তবে তার ব্যবহার মোটেও শুরু হয়নি তখনও।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মুড়ি অথবা চা, চানাচুর ছাড়া জমে না সন্ধার জলখাবার, জানেন একে ইংরেজিতে কী বলে?

English synonyms of Chanachur : ভিন্ন স্বাদের চানাচুরে মজেন যখন তখন, জানেন এর ইংরেজি প্রতিশব্দ?

জানা গিয়েছে, ১৮৩০ নাগাদ টমেটো কেচাপের ব্যবহার শুরু হয় ওষুধ হিসেবে। ডায়রিয়া, বদহজম এমনকী জন্ডিস সারাতেও নাকি অব্যর্থ ছিল ওই সস। ড. জন কুক বেনেট নামে এক মার্কিন চিকিৎসকের মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল ব্যপারটি। শুধু কি সস, পিল বা ট্যাবলেটের আকারেও মিলত ওই মহৌষধী।

মুখে সবজি বললেও আমরা সকলেই হাড়ে হাড়ে জানি আসলে সেটি একধরনের ফল। যুগযুগ ধরে রান্নাবান্নার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে এই টমেটো। এমনকী পৃথিবীর দ্বিতীয় জনপ্রিয়তম সবজি হিসেবেও নাম রয়েছে টোমাটোর। ভাবছেন প্রথম স্থানে কে? কে আবার? আলু। আর তার পরেই রয়েছে টমেটোর জায়গা। তবে মজার কথা কি জানেন, আজ থেকে দু'শো বছর আগেও নাকি খাবারের প্লেটের থেকে ফুলদানিতেই বেশি শোভা পেত এই ফলটি। শৌখিন বাগানকরিয়েরা মনে করতেন, খাবার সাজানোর চেয়ে ঘর সাজানোর ক্ষেত্রেই টোমাটো অনেক বেশি সুন্দর ও উপকারী। তাই অর্কিড, গোলাপ বা রজনীগন্ধা ফুলের মতোই চাষ করা হত টমেটোও। ওই আকর্ষণীয় রূপ দেখেই বোধহয় দু-একজন দাঁতে কেটে ফেলেছিলেন ফলটিকে। ব্যাস, তাতেই বিপদ বাড়ল টমেটো শ্রেণির। শুরু হল খাবারের পাতে টমেটোর বহুল ব্যবহার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
তরকারি থেকে চাটনি, টমেটো ছাড়া ফ্যাকাসে লাগে স্বাদ, জানেন এর বাংলা প্রতিশব্দ?

Bengali meaning of Tomato : টমেটো শব্দটি বাংলায় বহুল ব্যবহৃত হলেও এটি একটি ইংরেজি শব্দ। ইংরেজি শব্দের চাপে অবশ্য ব্যবহারিক জীবন থেকে একেবারেই হারিয়ে গিয়েছে বাংলা প্রতিশব্দটি, জানুন সেটি

তবে ফুল, ফলের চেয়েও মেগা হিট হয়েছিল ড. বেনেটের ওই রেসিপি। ক্রমে বার্তা রটে গেল টমেটোর ভেষজ গুণের। তখনও পৃথিবীতে নকলনবিশের অভাব ছিল না কোনও। যে যার মতো টমেটো পিল বানিয়ে বেচতে শুরু করল বাজারে। শুরু হয়ে গেল রীতিমতো টমেটো পিলের লড়াই। বাজার ধরতে অনেকে টমেটো ছাড়াই টমেটো পিল বেচতে শুরু করল। স্কার্ভি থেকে শুরু করে সব রোগ সারাতে পারে সেই ট্যাবলেট, এমন দাবিও করে ফেলল তারা। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। অচিরেই ফাঁস হল কুকীর্তি। তারাই দায়িত্ব নিয়ে ধ্বসিয়ে দিল কেচাপ মেডিসিনের সাম্রাজ্য। সেটা ১৮৫০ সালের কথা হবে।

মেডিসিনের সাম্রাজ্য থেকে ক্রমে বিদায় নিল টমেটো। তবে গল্পটা শেষ হল না। প্রায় কয়েক দশক পরে হেনরি হেইনজ নামে এক মার্কিন উদ্যোগপতির হাত ধরে নতুন দুনিয়া দেখল আজকের সস। কাঁচা টমেটো, বিশুদ্ধ ভিনিগার, ব্রাউন সুগার, নুন ও বিভিন্ন রকম মশলা মিশিয়ে বানিয়ে ফেললেন দুর্দান্ত এক রেসিপি। প্রথম থেকেই ভেষজ গুণের অংশটি সসের ভূমিকা থেকে ছেঁটে ফেললেন হেনরি। জানিয়ে দিলেন, এই টমেটো কেচাপ আসলে রান্না বা খাবারের স্বাদবর্ধক ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রথম বার পেনসিলভেনিয়ার পিটসবার্গে বীরদর্পে আত্মপ্রকাশ করল হেনরির তৈরি সস।

ব্যাস তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। নানা স্বাদের নানা উপকরণ দিয়ে তৈরি সস বাজারে এসেছে, গেছে। তবে টমেটো কেচাপের জনপ্রিয়তায় হাত দিতে পারেনি একরত্তি। ক্রমে বিরাট একটি বাজার ধরতে সক্ষম হয়েছে এই টমেটো কেচাপ। এই স্বাদবর্ধকের স্বাদ বর্ধন করতে নিত্য চলছে পরীক্ষানিরিক্ষা। পাড়ার রোলের দোকান থেকে পাঁচ তারা রেস্তোরাঁর নামীদামী পাত, কোথাও একচোখামি নেই এই উপকরণটির। দামী থেকে সস্তা পাত, হেনরির ওই দুর্দান্ত রেসিপি কিন্তু আজও সবেতেই দশে দশ।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।