জলপাইগুড়ি শহরের পাঁচ প্রসিদ্ধ কালীবাড়ি, যে ইতিহাস আজও অজানা

Kali Temple of Jalpaiguri City: জলপাইগুড়ি শহরের এইসব কালী মন্দিরের কয়েকটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহুদিনের ইতিহাস। আসুন, আজ তেমন পাঁচটি ঐতিহাসিক কালীবাড়ির ইতিহাস জেনেন নিই।

জলপাইগুড়ি শহরের অলিতে গলিতে একটি করে কালীবাড়ি রয়েছে। শান্তিপাড়া থেকে পাণ্ডাপাড়া, প্রতিটি মহল্লায় অধিষ্ঠিত মহল্লাবাসীর নিজস্ব কালী প্রতিমা। শোনা যায়, এইসব প্রতিমা অত্যন্ত জাগ্রত। গভীর রাতে পাড়ার নিঝুম গলি দিয়ে নাকি হেঁটে যান মা। তাঁর মলের ঝমঝম আওয়াজ শুনেছেন অনেকেই। শোনা যায়, সেই আওয়াজ শুনলে খানিক সময়ের জন্য হাতেপায়ে নিস্তেজ হয়ে পড়েন শ্রোতা। আওয়াজ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলে আবার সাড় ফেরে দেহে। জলপাইগুড়ি শহরের এইসব কালী মন্দিরের কয়েকটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহুদিনের ইতিহাস। আসুন, আজ তেমন পাঁচটি ঐতিহাসিক কালীবাড়ির ইতিহাস জেনেন নিই।

ভদ্রকালীবাড়ি

বৈকুণ্ঠপুর রাজ এস্টেটের রক্ষাকালী হিসেবে মা ভদ্রকালীর মন্দির পাণ্ডাপাড়ায় অবস্থিত। অথবা বলা ভালো, দেবীর অবস্থান থেকেই পাড়ার নাম পাণ্ডাপাড়া। বৈকুণ্ঠপুরের মহারাজা দর্পদেব এই মন্দিরে প্রাত্যহিক পুজো প্রবর্তনের জন্য পুরী থেকে পাণ্ডা এনে এই অঞ্চলে বসান। তার থেকেই এলাকার নাম হয় পাণ্ডা পাড়া। কোচবিহারের মহারাজা মোদনারায়ণও (১৬৬৫-১৬৮০) নাকি এই মন্দিরে পুজো দিয়েছিলেন। ভদ্রকালী পুরাণ মতে দুর্গা, কিন্তু তন্ত্রমতে কালী। লঙ্কা নগরীর রক্ষাকর্ত্রী ছিলেন তিনি। প্রতিমাটি দু'টি গোখরো সাপের লেজের উপর দাঁড়িয়ে। একটি নাগ, অপরটি নাগিনী। দেবীর জিভ দেখা যায় না। কিন্তু তিনি যে সাপ আহার করছেন, তা বোঝা যায়। এই দেবীর মুখের অন্তঃস্থল জামের মতো গাঢ় নীল। চোখ কোটরে বসে গিয়েছে। দেবীর পায়ের কাছে মহাদেবের মূর্তি নেই।

যোগমায়া কালীবাড়ি

বর্তমানে যোগমায়া কালীবাড়ির যে মন্দিরটি রয়েছে, তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৯৮ সাল, তথা ১৩০৫ বঙ্গাব্দের ৩০ চৈত্র। মন্দিরটির বয়েস একশ পঁচিশ বছরের কাছাকাছি। এই মন্দিরে কয়েক দশক যাবৎ পৌরহিত্য করেছিলেন রেবতীমোহন চক্রবর্তী ও অনন্তমোহন চক্রবর্তী। মূলমন্দিরের পূর্বপ্রান্তে লোকনাথ বাবার মন্দির। দুর্গামণ্ডপে, সংলগ্ন নাটমন্দিরে কালীপুজো, বাসন্তী পুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো ও অন্যান্য উৎসব হয়ে থাকে। মন্দিরের ট্রাস্টিবোর্ডের প্রথম সভাপতি ছিলেন নলিনীরঞ্জন ঘোষ। সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ কর্মকার। কৃষ্ণকুমার ঘোষ দস্তিদার পাষাণ প্রতিমাটি দান করেছিলেন মন্দিরে। নীরেন বাগচী, মুকুলেশ সান্যাল প্রমুখদের সহযোগিতায় গড়ে উঠেছিল মন্দিরের বর্তমান পাঁচিলটি। তাপস মুকুটমণি তাঁর মা আশালতা মুকুটমণির স্মৃতিতে একটি অতিথিশালা করে দিয়েছিলেন। মাঝে ভূমিকম্পে মন্দিরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তখন জীবনবীমা নিগম ফটকটি নির্মাণ করে দেন।

কান্তেশ্বরী কালীমন্দির

কান্তেশ্বরী কালীবাড়ির নাম শোনেননি, এমন জলপাইগুড়িবাসী প্রায় নেই বললেই চলে। কান্তেশ্বরী কালীবাড়ি ও তার সংলগ্ন দিঘিটিও আজকের নয়। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে স্থানীয় জোতদার কান্তেশ্বর দাস দিঘিটি কাটিয়েছিলেন। তখন একটি চালাঘর তুলে কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। তন্ত্রমতে পুজো করতেন তিনি। দেশভাগের পর বামনপাড়া ও বোসপাড়ার যুবকেরা গড়ে তুলেছিলেন 'তরুণ দল' ক্লাবটি। সেই উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন আকাশ সরকার, ভূপেন চন্দ, নির্মল সরকার, বিমল সেন প্রমুখ। এখনও কান্তেশ্বরী মন্দিরে প্রতিদিন পুজো হয়। কালী মন্দিরের পাশে শনি মন্দির ও শিব মন্দির রয়েছে। পৌরসভা থেকে দিঘি সংস্কার হয়। মন্দির সংস্কার করে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা হয়েছে। শহরের বয়স্ক মানুষেরা বিকেলে হাঁটতে আসেন। মন্দির প্রাঙ্গনে বিশ্রাম করেন, গল্পগাছা চলে। দেখা যায় তরুণ মুখেদেরও। কান্তেশ্বরী কালীবাড়ি জলপাইগুড়ির অন্যতম জনপ্রিয় মন্দির গুলির একটি।

kanteshwari kalibari

দিনবাজারের রক্ষাকালী মন্দির

দিনবাজারের রক্ষাকালী মন্দির স্থাপন করেছিলেন যোগেন্দ্রদেব রায়কত (১৮৬৫-১৮৭৭)। তিনি মারা যাওয়ার পর ১৮৮০ নাগাদ তাঁর পত্নী রানি জগদীশ্বরী দেবী সেই স্থানে পাকা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮৫ সালে জলপাইগুড়ি পৌরসভা গঠিত হয়। তখন ওই মন্দির সংলগ্ন স্থানেই দিনবাজার স্থাপনের অনুমতি পান রানি। দীর্ঘদিন মন্দিরটি অসংস্কৃত পড়ে ছিল। ১৯৬১ সালে ভগ্নপ্রায় সেই মন্দির আবার সংস্কার করে আধুনিক মন্দিরটি গড়ে তোলা হয়। পৌরসভার সদস্য ও শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মাতুরাম সিং নিজে উদ্যোগ নিয়ে টাকা দিয়ে আধুনিক মন্দিরটি গড়ে তোলেন। এই কালীবাড়ি থেকেই মন্দির সংলগ্ন এলাকার নাম হয়ে গিয়েছিল কালীবাড়ির ঘাট। আর দিনবাজারকে বলা হত, কালীবাড়ির হাট।

আরও পড়ুন: গর্তেশ্বরী থেকে লোটাদেবীর মন্দির, যে ইতিহাস ছড়িয়ে তরাইয়ের আনাচে কানাচে

দয়াময়ী কালীবাড়ি

দাদাভাই ক্লাবের পাশ দিয়ে সোজা দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গিয়েছে ডাঙাপাড়া রোড। মেহেরুন্নেসা হাইস্কুল থেকে আরও দক্ষিণে ডাঙাপাড়ায় নবাববাড়ির এক আত্মীয় থাকতেন। তাঁর নাম বাচ্চু মিঞা। বাচ্চু মিঞার সম্পত্তির পরিমাণ ছিল বিশাল। বাড়িটিও প্রাসাদতুল্য। দেশভাগের আগে এই বাড়িতেই পুত্রস্নেহে পালিত হতেন স্বাধীনতা সংগ্রামী মণীন্দ্রনাথ (মৈনা) পালচৌধুরী। তাঁর আদি নিবাস ছিল টাঙাইল। দেশভাগের সময় বাচ্চু মিঞার বাড়িতে দাঙ্গার ছোঁয়া লাগে। উদ্বাস্তুরা চড়াও হয় সেই প্রাসাদে। সপরিবারে নিহত হন বাচ্চু মিঞা। পিতৃতুল্য বাচ্চু মিঞার মৃত্যুর পর সেই বিপুল ভূসম্পত্তি নিজের দেশের বাড়ির সঙ্গে বিনিময় করেন মৈনা পাল। দেশে তাঁরও সম্পত্তি ছিল বিস্তর। ছিল দয়াময়ী কালীবাড়ি। দেশভাগের সময় বাচ্চু মিঞার অবশিষ্ট পরিবার-পরিজনেরা বাংলাদেশে চলে গেলেন। নিজের বাড়ি তুললেন মৈনা পাল ডাঙাপাড়াতেই। ১৯৪৮ সালের মাঘী পূর্ণিমায় এ'খানেও প্রতিষ্ঠা করলেন দয়াময়ী কালীবাড়ি। মন্দিরের জন্য বরাদ্দ হল আড়াই বিঘা জমি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত দয়াময়ী কালীবাড়িতে প্রাত্যহিক পুজো পেয়ে আসছেন মা কালী।

dayamayee kalibari jalpaiguri

কৃতজ্ঞতা─উমেশ শর্মা, চারুচন্দ্র সান্যাল

More Articles