কেন রাজপথে গুলি জাপানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে? প্রকাশ্যে এল আসল কারণ

পদে থাকাকালীন জাপানের নিরাপত্তার দিকে গুরত্ব দিয়েছিলেন আবে। তাঁর বিদেশনীতি জাপানের যুদ্ধবিরোধী সংবিধানকেই আরও পুষ্ট করেছিল। এছাড়া ‘আবেনমিক্স’-এর জন্যও বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়েছিলেন।

Sindhu Som
৩ মিনিট
কেন রাজপথে গুলি জাপানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে? প্রকাশ্যে এল আসল কারণ

যে বন্দুক নিয়ে জাপানে এত সতর্কতা, সেই বন্দুকই কেড়ে নিল শিনজো আবের প্রাণ। ৮ জুলাই জাপানের নারা শহরের রাস্তায় প্রকাশ্যে দু'-দু'বার গুলি করা হয় তাঁকে। হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যান জাপানের ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী। নিরাপত্তারক্ষীরা আততায়ীকে আটক করে ঘটনাস্থলেই। বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে সে। আততায়ীর নাম তেতসুয়া ইয়ামাগামি। বয়স একচল্লিশ। পুলিশের কাছে সে গুলি চালানোর কথা স্বীকার করে নিয়েছে। জানিয়েছে, তার বন্দুকটি ঘরে বানানো। পুলিশ জানিয়েছে, একটি ‘বিশেষ দল’-এর প্রতি তার রাগ ছিল। সেই কারণেই এই হত্যা।

প্রেস কনফারেন্সে পুলিশ জানায় এমন আরও অনেক হাতে বানানো বন্দুক আততায়ীর ঘর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এমনকী, তার ঘর থেকে বিস্ফোরকও পাওয়া গিয়েছে। পুলিশ ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদের আপাতত সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে অন্যত্র। আততায়ীর জবানিতে এই ‘বিশেষ সংগঠন’-টির সঙ্গে ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রীর যোগসাজশ ছিল। কেন সেই ‘বিশেষ সংগঠন’-এর বাকি সদস্যদের ছেড়ে শিনজো আবেকেই বেছে নিল আততায়ী— তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। জাপানের এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ইয়ামাগামি আবেকে খুন করার উদ্দেশ্য নিয়েই গুলি চালিয়েছিল কি? ইয়ামাগামি শুধুমাত্র গুলি চালানোর কথাই স্বীকার করেছে, বাকিটা তদন্তসাপেক্ষ– উত্তরে জানিয়েছে পুলিশ। জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা এই আক্রমণের কড়া নিন্দা করে বলেন, “এই আক্রমণ বর্বরোচিত এবং ঘৃণ্য। এ বরদাস্ত করা হবে না। নির্বাচন আমাদের গণতন্ত্রের বুনিয়াদ। নির্বাচনের সময় এমন হিংসাত্মক ঘটনা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।”

আবে-র গলার পাশে দু'টি বুলেটের ক্ষত পাওয়া গিয়েছিল। ডাক্তাররা জানিয়েছেন, হৃদযন্ত্রও জখম হয়েছিল তাঁর। আহত অবস্থাতেও জ্ঞান ছিল। কিন্তু ৬৭ বছর বয়স। অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। ডাক্তাররা জানিয়েছেন, হাসপাতালে নিয়ে আসার সময়েই কোনও সাড় পাওয়া যাচ্ছিল না। চিকিৎসাধীন অবস্থায় চার ঘণ্টা ধরে ১০০ ইউনিট রক্ত দেওয়া হয় তাঁকে। কিন্তু তাতেও কোনও ফল হয় না। অবশেষে বিকেল পাঁচটা বেজে তিন মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রকাশ্য রাস্তায় গুলি জাপানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে! ফিরছে ইন্দিরা হত্যার স্মৃতি

এমন নাটকীয় হত্যা ভারতের ইতিহাসে বিরল নয়। ইন্দিরা গান্ধী হত্যার কথা মনে করাচ্ছে এই আক্রমণ। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর।

৮ জুলাই টোকিও থেকে তিনশো মাইল দূরে, নারার দক্ষিণাঞ্চলের শহরে নির্বাচনী প্রার্থী সাতোর সমর্থনে ভাষণ দিচ্ছিলেন আবে। সকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ ঘটনাটা ঘটে। অনেকেই দেখেছে, পিছন থেকে একটি বড় বন্দুক তুলে দু'বার গুলি ছোঁড়েন আততায়ী। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আবে। ভয়ে, আতঙ্কে প্রচণ্ড চেঁচামেচি শুরু হয়। আবের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী ছিল। তা সত্ত্বেও কী করে ইয়ামাগামী তাঁর কয়েক মিটারের মধ্যে পৌঁছল, ভাবার বিষয়। কারওরই নজরে এল না?

ঘটনার পরে পরে আন্তর্জালে যে সমস্ত ছবি ঘুরছে, তাতে স্পষ্ট আততায়ী আবের ঠিক পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। গুলি করার পর আততায়ী পালানোর কোনও চেষ্টাই করেনি। নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে আটক করে। অস্ত্রটিকেও বাজেয়াপ্ত করা হয়। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ইয়ামাগামি জাপানের মেরিটাইম সেলফ ডিফেন্স ফোর্সের প্রাক্তন সদস্য। ভারতের নেভি যেমন, তেমনই জাপানের মেরিটাইম। ২০০৫ সালে ইয়ামাগামি অবসর নেন। এই সপ্তাহেই জাপানের উচ্চকক্ষের নির্বাচন। লিবারাল ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়েই নির্বাচনী প্রচারের ভাষণ দিচ্ছিলেন আবে। গোটা দেশের মন্ত্রীদের পত্রপাঠ টোকিও ফেরার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। জাপানের সামাজিক মাধ্যমে 'হিংসা নয়, আমরা গণতন্ত্র চাই' হ্যাশট্যাগটি ট্রেন্ডিং ছিল। বহু মানুষই সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নিচ্ছিলেন।

আবে জাপানে দীর্ঘতম প্রধানমন্ত্রিত্বের নজির গড়েছিলেন। ২০০৬ সালে বছরখানেক, ফের ২০১২ থেকে ২০২০ অবধি টানা এই পদে আসীন ছিলেন তিনি। ২০২০ সালে স্বাস্থ্যভঙ্গর কারণে পদ থেকে ইস্তফা দেন তিনি। পরে জানিয়েছিলেন, আলসেরাটিভ কোলিটিসে ভুগছেন। পদে থাকাকালীন জাপানের নিরাপত্তার দিকে গুরত্ব দিয়েছিলেন আবে। তাঁর বিদেশনীতি জাপানের যুদ্ধবিরোধী সংবিধানকেই আরও পুষ্ট করেছিল। এছাড়া ‘আবেনমিক্স’-এর জন্যও বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়েছিলেন। আবের পরে প্রধানমন্ত্রী হন ইয়োশিহিদে সুগা, পরে ফুমিও কিশিদা নির্বাচিত হন।

জাপানের বন্দুকের অপব্যবহার হয় না বললেই চলে। হ্যান্ডগান নিষিদ্ধ জাপানে। আর রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা তো শোনাই যায় না। একটা পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। ২০১৪ সালে জাপানে বন্দুকের অপব্যবহারে মারা গিয়েছিল মাত্র ছ'জন, সে বছর আমেরিকাতে মারা গিয়েছিল ৩৩,৫৯৯ জন। জাপানে বন্দুকের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য কঠিন পরীক্ষা পাশ করতে হয়। তারপর মানসিক স্বাস্থ্যের পরীক্ষা। এতসব বিধিনিষেধের পরেও শুধুমাত্র শটগান এবং রাইফেল কেনার অনুমতি পাওয়া যায়।

ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন-সহ পৃথিবীর নানা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এই আক্রমণের নিন্দা করেছেন। জাপানের আমেরিকান অ্যাম্বাসাডর রেহ্‌ম এমানুয়েল বলেছেন, আবে 'একজন অসাধারণ নেতা', পাশাপাশি আমেরিকার প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বন্ধুভাবাপন্ন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়ুন সুক ইয়ল এই ঘটনাকে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ বলেছেন। আবে-র মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে তিনি বলেন, "জাপান এক শ্রদ্ধেয় রাজনীতিবিদকে হারাল।" চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র জাও লিজিয়ান বলেন, গোটা চিন এই ঘটনায় স্তম্ভিত। তিনি বলেন, "এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে চিন-জাপান সম্পর্কের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার কোনও মানে হয় না।" যদিও চিনের সামাজিক মাধ্যমে মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কোনও মন্তব্য করননি তিনি। চিনের সামাজিক মাধ্যমে এই খুন বিস্তর প্রশংসা কুড়োচ্ছে, কোরিয়ার সমাজমাধ্যমেও এমনটা দেখা গিয়েছে। চিন এবং দক্ষিণ কোরিয়া- উভয়ের সঙ্গেই জাপানের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই কিঞ্চিৎ জটিল। আবে-কে এই দুই দেশের মানুষই অপছন্দ করতেন তাঁর সামরিক ঝোঁকের জন্য।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।