বুলিই সার, জেলনস্কির পাশে দাঁড়ানোর বেলায় কেন ঠুঁটো জগন্নাথ সবাই!

rudranjan
৩ মিনিট
বুলিই সার, জেলনস্কির পাশে দাঁড়ানোর বেলায় কেন ঠুঁটো জগন্নাথ সবাই!

দিন কয়েক আগে ন্যাটোর বিরুদ্ধে উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির জেলেন্সকি। ন্যাটো আদৌ ইউক্রেনকে সদস্যপদ দিতে ইচ্ছুক কিনা সে বিষয়ে স্পষ্ট জবাব চেয়েছিলেন তিনি। তারপর বেশ কিছু দিন কেটে গেলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনোরকম সদুত্তর আসেনি। অবশেষে জেলেন্সকি জানান ন্যাটোর সদস্য হওয়ার বাসনা ত্যাগ করেছে ইউক্রেন। এবার রাষ্ট্রপুঞ্জের বিরুদ্ধেও অসন্তোষের সুর শোনা গেল ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতির গলায়। নিরাপত্তা পরিষদের বক্তৃতায় রুশ সৈন্যদের নৃশংসতার উদাহরণ তুলে দিয়ে তিনি বললেন, ‘আপনারা সক্রিয় না হলে সকলকেই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে।’ রুশ হানাদার বাহিনীকে সে বক্তৃতায় আইএস জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গেও তুলনা করেছেন জেলেন্সকি। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিনের দেশের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কোনও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেয়নি রাষ্ট্রপুঞ্জ, এ নিয়ে ক্ষুব্ধ তিনি। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে তাঁর ক্ষোভ হয়ত অযৌক্তিক নয়। কিন্তু এ যুদ্ধে রাষ্ট্রপুঞ্জ আদৌ কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবে কিনা তা নিয়ে খানিক সংশয় থেকে যায়।

ইউক্রেনকে আক্রমণ করবার কিছুদিনের দিনের মধ্যেই রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় তিরস্কৃত হতে হয় রাশিয়াকে। রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনকে সেখানে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, তিনি যদি সেনা অভিযানে অবিলম্বে রাশ না টানে রাশিয়া তাহলে সমস্ত দিক থেকেই একঘরে করে দেওয়া হবে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভোটাভুটিতে সেখানে অংশগ্রহণ করে ১৪১ টি দেশ। পক্ষান্তরে রাশিয়ার পাশে এসে দাঁড়ায় সিরিয়া বা উত্তর-কোরিয়ার মতো দেশগুলি। কিন্তু কেবল তর্জন-গর্জনই সার। ইউক্রেনকে নৈতিক সমর্থন জানিয়ে আপাতভাবে রাশিয়াকে চোখ রাঙালেও সরাসরি কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার বেলায় মৌনব্রত অবলম্বন করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। কূটনীতিকদের কেউ কেউ অবশ্য মনে করাচ্ছেন, এ ক্ষেত্রে দেশগুলি যে আন্তর্জাতিক নিয়মের শৃঙ্খলে আবদ্ধ, সে কথাও অস্বীকার করা চলে না।

কোনও দেশের আগ্রাসী আচরণের ফলে যদি সামাজিক শান্তি ব্যহত হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ নিতে পারবে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ। তাদের সংবিধানের ৭ নম্বর পরিচ্ছেদে এমনটাই বলা আছে। তবু, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে তাদের হাবভাব যেন ঠিক সংবিধান সম্মত নয়। অর্থাৎ, রাশিয়া কে শুধুমাত্র মৌখিক বার্তাটুকু দিয়েই যেন দায় সারতে চাইছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। কারণটা বুঝে নেওয়া অবশ্য খুব কঠিন নয়।

প্রথমেই দেখে নেওয়া যাক এই নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য কারা। চিন, মার্কিন-যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং ইউনাইটেড কিংডম ছাড়াও সেখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে রাশিয়া। অর্থাৎ যাদের বিরুদ্ধে শান্তিভঙ্গের অভিযোগ, তারাই নিরাপত্তা পরিষদের কার্যনির্বাহী সমিতির অন্যতম অংশীদার। এবং শুধু তাই নয়। নিজেদের ভেটো প্রয়োগ করে নিরাপত্তা পরিষদের যে কোনও সিদ্ধান্ত কে রদ করে দেওয়ার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতাও তাদের রয়েছে সেখানে। ইতিপূর্বে রুশ-ক্রিমিয়া সংঘর্ষের কালেও এমনটাই ঘটিয়েছিল তারা। রাষ্ট্রপুঞ্জের তৎকালীন মার্কিন প্রতিনিধি সামান্থা পাওয়ার সে সময়ে মনে করেছিলেন, ভেটোর অযাচিত প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে আসলে নিরাপত্তা পরিষদের বৈধতাকেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে রাশিয়া। ফলত, নিরাপত্তা পরিষদ চাইলেও নিজেদের আইনি জটিলতার কারণেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোনোরকম পদক্ষেপ নিতে পারবে না। বলা ভালো, কার্যনির্বাহী সমিতিতে পুতিনের দেশের শক্তিশালী উপস্থিতিই তাদের সেই পদক্ষেপ নেওয়ার ছাড়পত্র দেবে না।

প্রসঙ্গত, ন্যাটোর ক্ষেত্রেও এমন চিত্রই দেখা যাচ্ছে। সেখানেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি বিধি নিষেধই প্রধান অন্তরায়। ইতিপূর্বে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ন্যাটো জেলেন্সকিকে নৈতিক সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু সরাসরি তাদের কাছ থেকে কোনোরকম সাহায্য পায়নি ইউক্রেন। তার কারণ, ন্যাটোর ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, একমাত্র তাদের সদস্য দেশের উপর আক্রমণ নেমে এলেই বাকিরা যৌথভাবে তার প্রতিরোধ করতে পারবে।

শেষবার এ ধারা প্রয়োগ করা হয়েছিল ২০০১ সালে মার্কিন-যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার হামলার সময়ে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এস্তোনিয়া বা লাতভিয়ার মতো বলটিক দেশগুলি স্বেচ্ছায় সদস্য হয়েছিল ন্যাটোর। কেবল ইউক্রেনকেই এখনও পর্যন্ত নিজেদের সদস্য হিসেবে গণ্য করেনি তারা। ইউক্রেনের সঙ্গে ন্যাটোর সম্পর্ক কেবলই বন্ধুত্বের। কোনোরকম কূটনৈতিক চুক্তিতে তারা আবদ্ধ নয়। অতএব, এ যুদ্ধে জেলেন্সকি কে নৈতিক সমর্থন জানালেও ইউক্রেন কে সাহায্য করা আইনত সম্ভব নয় ন্যাটোর পক্ষে।

রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে দ্রুত। ইস্তানবুলে আয়োজিত দুই দেশের সাম্প্রতিক বৈঠক কে যুদ্ধ শেষের প্রথম ধাপ হিসেবেই দেখছেন অনেকে। তবু, এখনই সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনও সিদ্ধান্তে আসা চলে না। ইতিমধ্যে নিয়মিত রুশ মিসাইলের আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়েছে পূর্ব-ইউক্রেন। প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়েছে। যুদ্ধের কবল থেকে রক্ষা পেতে ইউক্রেনের পশ্চিম সীমান্ত পেরিয়ে তারা আশ্রয় খুঁজেছে অন্যত্র। রুশ সেনাদের আগ্রাসনের ফলে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর কার্যত ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। প্রত্যহ ঘোরতর সংশয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে সেখানকার মানুষ। এমতাবস্থায় দুই দেশের বাক্যালাপের মধ্যে দিয়ে যত দ্রুত সমাধান সূত্র বেরিয়ে আসে ততই মঙ্গল।

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।