বুলিই সার, জেলনস্কির পাশে দাঁড়ানোর বেলায় কেন ঠুঁটো জগন্নাথ সবাই!

দিন কয়েক আগে ন্যাটোর বিরুদ্ধে উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির জেলেন্সকি। ন্যাটো আদৌ ইউক্রেনকে সদস্যপদ দিতে ইচ্ছুক কিনা সে বিষয়ে স্পষ্ট জবাব চেয়েছিলেন তিনি।  তারপর বেশ কিছু দিন কেটে গেলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনোরকম সদুত্তর আসেনি। অবশেষে জেলেন্সকি জানান ন্যাটোর সদস্য হওয়ার বাসনা ত্যাগ করেছে ইউক্রেন।  এবার রাষ্ট্রপুঞ্জের বিরুদ্ধেও অসন্তোষের সুর শোনা গেল ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতির গলায়। নিরাপত্তা পরিষদের বক্তৃতায় রুশ সৈন্যদের নৃশংসতার উদাহরণ তুলে দিয়ে তিনি বললেন, ‘আপনারা সক্রিয় না হলে সকলকেই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে।’ রুশ হানাদার বাহিনীকে সে বক্তৃতায় আইএস জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গেও তুলনা করেছেন জেলেন্সকি।  রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিনের দেশের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কোনও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেয়নি রাষ্ট্রপুঞ্জ, এ নিয়ে ক্ষুব্ধ তিনি। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে তাঁর ক্ষোভ হয়ত অযৌক্তিক নয়। কিন্তু এ যুদ্ধে রাষ্ট্রপুঞ্জ আদৌ কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবে কিনা তা নিয়ে খানিক সংশয় থেকে যায়।

ইউক্রেনকে আক্রমণ করবার কিছুদিনের দিনের মধ্যেই রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় তিরস্কৃত হতে হয় রাশিয়াকে। রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনকে সেখানে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, তিনি যদি সেনা অভিযানে অবিলম্বে রাশ না টানে রাশিয়া তাহলে সমস্ত দিক থেকেই একঘরে করে দেওয়া হবে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভোটাভুটিতে সেখানে অংশগ্রহণ করে ১৪১ টি দেশ। পক্ষান্তরে রাশিয়ার পাশে এসে দাঁড়ায় সিরিয়া বা উত্তর-কোরিয়ার মতো দেশগুলি। কিন্তু কেবল তর্জন-গর্জনই সার। ইউক্রেনকে নৈতিক সমর্থন জানিয়ে আপাতভাবে রাশিয়াকে চোখ রাঙালেও সরাসরি কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার বেলায় মৌনব্রত অবলম্বন করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। কূটনীতিকদের কেউ কেউ অবশ্য মনে করাচ্ছেন, এ ক্ষেত্রে দেশগুলি যে আন্তর্জাতিক নিয়মের শৃঙ্খলে আবদ্ধ, সে কথাও অস্বীকার করা চলে না।

কোনও দেশের আগ্রাসী আচরণের ফলে যদি সামাজিক শান্তি ব্যহত হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ নিতে পারবে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ। তাদের সংবিধানের ৭ নম্বর পরিচ্ছেদে এমনটাই বলা আছে। তবু, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে তাদের হাবভাব যেন ঠিক সংবিধান সম্মত নয়। অর্থাৎ, রাশিয়া কে শুধুমাত্র মৌখিক বার্তাটুকু দিয়েই যেন দায় সারতে চাইছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। কারণটা বুঝে নেওয়া অবশ্য খুব কঠিন নয়।

প্রথমেই দেখে নেওয়া যাক এই নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য কারা। চিন, মার্কিন-যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং ইউনাইটেড কিংডম ছাড়াও সেখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে রাশিয়া। অর্থাৎ যাদের বিরুদ্ধে শান্তিভঙ্গের অভিযোগ, তারাই নিরাপত্তা পরিষদের কার্যনির্বাহী সমিতির অন্যতম অংশীদার। এবং শুধু তাই নয়। নিজেদের ভেটো প্রয়োগ করে নিরাপত্তা পরিষদের যে কোনও সিদ্ধান্ত কে রদ করে দেওয়ার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতাও তাদের রয়েছে সেখানে। ইতিপূর্বে রুশ-ক্রিমিয়া সংঘর্ষের কালেও এমনটাই ঘটিয়েছিল তারা। রাষ্ট্রপুঞ্জের তৎকালীন মার্কিন প্রতিনিধি সামান্থা পাওয়ার সে সময়ে মনে করেছিলেন, ভেটোর অযাচিত প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে আসলে নিরাপত্তা পরিষদের বৈধতাকেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে রাশিয়া। ফলত, নিরাপত্তা পরিষদ চাইলেও নিজেদের আইনি জটিলতার কারণেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোনোরকম পদক্ষেপ নিতে পারবে না। বলা ভালো, কার্যনির্বাহী সমিতিতে পুতিনের দেশের শক্তিশালী উপস্থিতিই তাদের সেই পদক্ষেপ নেওয়ার ছাড়পত্র দেবে না।

প্রসঙ্গত, ন্যাটোর ক্ষেত্রেও এমন চিত্রই দেখা যাচ্ছে। সেখানেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি বিধি নিষেধই প্রধান অন্তরায়। ইতিপূর্বে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ন্যাটো জেলেন্সকিকে নৈতিক সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু সরাসরি তাদের কাছ থেকে কোনোরকম সাহায্য পায়নি ইউক্রেন। তার কারণ, ন্যাটোর ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, একমাত্র তাদের সদস্য দেশের উপর আক্রমণ নেমে এলেই বাকিরা যৌথভাবে তার প্রতিরোধ করতে পারবে।

শেষবার এ ধারা প্রয়োগ করা হয়েছিল ২০০১ সালে মার্কিন-যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার হামলার সময়ে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এস্তোনিয়া বা লাতভিয়ার মতো বলটিক দেশগুলি স্বেচ্ছায় সদস্য হয়েছিল ন্যাটোর। কেবল ইউক্রেনকেই এখনও পর্যন্ত নিজেদের সদস্য হিসেবে গণ্য করেনি তারা। ইউক্রেনের সঙ্গে ন্যাটোর সম্পর্ক কেবলই বন্ধুত্বের। কোনোরকম কূটনৈতিক চুক্তিতে তারা আবদ্ধ নয়।  অতএব,  এ যুদ্ধে জেলেন্সকি কে  নৈতিক সমর্থন জানালেও ইউক্রেন কে সাহায্য করা আইনত সম্ভব নয় ন্যাটোর পক্ষে।

রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে দ্রুত। ইস্তানবুলে আয়োজিত দুই দেশের সাম্প্রতিক বৈঠক কে যুদ্ধ শেষের প্রথম ধাপ হিসেবেই দেখছেন অনেকে। তবু,  এখনই সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনও সিদ্ধান্তে আসা চলে না। ইতিমধ্যে নিয়মিত রুশ মিসাইলের আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়েছে পূর্ব-ইউক্রেন। প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়েছে। যুদ্ধের কবল থেকে রক্ষা পেতে ইউক্রেনের পশ্চিম সীমান্ত পেরিয়ে তারা আশ্রয় খুঁজেছে অন্যত্র। রুশ সেনাদের আগ্রাসনের ফলে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর কার্যত ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। প্রত্যহ ঘোরতর সংশয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে সেখানকার মানুষ। এমতাবস্থায় দুই দেশের বাক্যালাপের মধ্যে দিয়ে যত দ্রুত সমাধান সূত্র বেরিয়ে আসে ততই মঙ্গল।

More Articles

;