স্টেশন মাস্টার থেকে শৌচাগারের রক্ষণাবেক্ষণ, রাজ্যের প্রথম মহিলা পরিচালিত স্টেশনের খোঁজ

২০২২ সাল থেকে এই স্টেশনের ভার সম্পূর্ণ মহিলাদের হাতে ছাড়া হল। সেই সুবাদে শিলিগুড়ি টাউন স্টেশন উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেল তো বটেই, এমনকি গোটা পশ্চিমবঙ্গে প্রথম পূর্ণাঙ্গ মহিলা পরিচালিত স্টেশন।

Sindhu Som
৩ মিনিট
স্টেশন মাস্টার থেকে শৌচাগারের রক্ষণাবেক্ষণ, রাজ্যের প্রথম মহিলা পরিচালিত স্টেশনের খোঁজ

দার্জিলিং জেলার নিউ জলপাইগুড়ি জাংশান থেকে উত্তর-পূর্ব সীমান্তের রেলপথটি দু'টি দিকে ভাগ হয়ে যায়। একটি জলপাইগুড়ি, কোচবিহার পার করে চলে যায় গুয়াহাটির দিকটিতে। অপরটি খানিক এগিয়ে শিলিগুড়ি জাংশান থেকে আবার দুটি ভাগে ছড়িয়ে পড়ে। শুকনা হয়ে টয়ট্রেনের ন্যারো গেজের লাইন, যাচ্ছে দার্জিলিং শহর অবধি। আরেকটি সেভক, ওদলাবাড়ি, মালবাজার, চালসা হয়ে আলিপুরদুয়ারের দিকে চলে গিয়েছে। এই শিলিগুড়ি জাংশান ও নিউজলপাইগুড়ি জাংশানের মাঝে রয়েছে একটি বহু পুরনো রেল স্টেশন। শিলিগুড়ি টাউন। এর উপর দিয়ে গিয়েছে মহাবীরস্থান উড়ালপুল। মূলত এই স্টেশনটিকে কেন্দ্র করেই শিলিগুড়ি শহরের গড়ে ওঠা। ১৮৭৮ সালে যখন স্টেশনটি তৈরি হচ্ছে তখন শিলিগুড়িতে তেমন জনপদ ছিল না। ব্রিটিশদের দার্জিলিং ভ্রমণের উদ্দেশ্যে টয় ট্রেন চালুর জন্য তখন এটি তৈরি করেছিল ব্রিটিশ সরকার। এখন এর একপাশে শিলিগুড়ির ২৮ নম্বর ওয়ার্ড টিকিয়া পাড়া, অন্যপাশে ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাগরোকাট সহ একাধিক বস্তি।

এর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন বাঘা যতীন, রবীন্দ্রনাথের মতো ব্যক্তিত্ব। এই স্টেশনেই বাঘা যতীন দুই ব্রিটিশ পুলিশকে উচিত শিক্ষা দেন। সে ঘটনার স্মরণে প্ল্যাটফর্মে রয়েছে একটি স্মৃতিস্তম্ভও। মংপু কিম্বা কালিম্পং ভ্রমণের সময় এই স্টেশনেই নামতেন রবীন্দ্রনাথ। তারপরে শুরু হত সরু লাইনের টয় ট্রেনে যাত্রা। গেইলখোলা হয়ে কালিম্পঙে যেতেও এখানেই নাবতে হত। এনজেপি বলে কিছু ছিল না তখনও। আরও অনেক দশক পরে ১৯৬১ নাগাদ নিউ জলপাইগুড়ি জাংশান তৈরি হবে। এই স্টেশনে নেমে দার্জিলিং গিয়েছেন গান্ধীজি, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। এই ধরনের নানা বিখ্যাত মানুষের স্মৃতি বয়ে ফিরছে এই প্রাচীন স্টেশনটি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রাত নামলে পা রাখে না মানুষ! হাড় হিম করা এই রেলস্টেশনগুলি রয়েছে ভারতেই

Haunted Stations: ঢুঁ মারবেন নাকি এই স্টেশনগুলিতে?

তবে বর্তমানে এর গুরুত্ব অন্য। ২০২২ সাল থেকে এই স্টেশনের ভার সম্পূর্ণ মহিলাদের হাতে ছাড়া হল। সেই সুবাদে শিলিগুড়ি টাউন স্টেশন উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেল তো বটেই, এমনকি গোটা পশ্চিমবঙ্গে প্রথম পূর্ণাঙ্গ মহিলা পরিচালিত স্টেশন। গোটা দেশে এমন স্টেশন রয়েছে মাত্র তিনটি। রাজ্যেও এমন স্টেশন আর নেই যেখানে ট্রেনের আসা-যাওয়া থেকে সিগনাল, লগ, অপারেশন, যাবতীয় কাজ মহিলারাই করে থাকেন। ফলত গোটা রাজ্যের মধ্যেই ব্যতিক্রমী হিসেবে নজর টেনেছে স্টেশনটি। এখানকার স্টেশন ম্যানেজার মহিলা। তিনজন পয়েন্টস্‌ম্যান মহিলা। দুজন পোর্টার। তারাও মহিলা। চারজন জুনিয়র কমার্সিয়াল ক্লার্ক, এগারোজন মাল্টিস্কিল্ড স্টাফ, শৌচাগার রক্ষক– সবাই মহিলা। চারজন গেটকিপারের মধ্যেও দুইজন মহিলা। এই ধরনের পদে এক দুজন পুরুষ রয়ে গিয়েছেন এখনও। তবে স্টেশনটি মূলত পরিচালনা করেন মহিলারাই নিজস্ব দক্ষতায়। এই ঐতিহ্যবাহী স্টেশন মহিলাকর্মীদের হাতে একটু করে একটু করে আবার তার হৃতসর্বস্ব মর্যাদা ফিরে পাচ্ছে। এই স্টেশন দিয়ে প্রতিদিন ৪টি যাত্রীবাহী ত্রেন ছাড়াও ৩০ টি ট্রেন যাতায়াত করে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দেশের সব মেট্রো স্টেশনকে বলে বলে গোল দেবে শিয়ালদহ মেট্রো, কী কী ব্যবস্থা অন্দরে

২০২২ সালের ১১ জুলাই কেন্দ্রীয় নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী স্মৃতি ইরানির হাতে উদ্বোধন হলো শিয়ালদহ মেট্রোর। ১৪ জুলাই থেকে মেট্রো পরিষেবা শুরু হবে। ন্যূনতম ভাড়া ধার্য হয়েছে দশ টাকা।

দীর্ঘদিন ধরে এই স্টেশন সম্বন্ধে স্থানীয় লোকেদের নানা অভিযোগ ছিল। বিশেষত এনজেপি তৈরি হওয়ার পর থেকে স্বাভাবিক কারণেই এই স্টেশনের গুরুত্ব কমে গিয়েছিল। তাই নিয়ে কোনও অভিযোগ নেই। কিন্তু গুরুত্ব কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিও উদাসীন হয়ে পড়েছিল সরকার। এই নিয়ে বহুদিন বহু অসন্তোষ দেখা গিয়েছে। প্রচুর লেখালেখি করেছেন গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য। অ্যাক্টের প্রধান রাজ বসুও এই নিয়ে সরব হয়েছিলেন। এই চত্বরে পালিত হয়েছিল বিশ্বপর্যটন দিবসও। ক্রমশই দেখভালের অভাবে মাদকাসক্ত, মাতাল, চোর, ছ্যাঁচোড়ের আড্ডা হয়ে উঠছিল স্টেশন চত্বরটি। কাজেই মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত স্টেশনের পরিকল্পনাকে সাধুবাদ জানালেও, পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন অনেকেই। এমনকী তৎকালীন কর্মরতা মহিলা কর্মচারীরাও বারবার অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন স্টেশনে কাজ করার পরিবেশ নেই। চত্বরে কোনও বেড়া দেওয়া নেই। যে কেউ ঢুকে আসতে পারে। স্টেশনের ভেতরেই হাট বসে, প্রচুর বাইরের লোক অবাধে যাতায়াত করে— ইত্যাদি নানা ধরনের অভিযোগ ছিল।

কিন্তু বর্তমানে হাওয়া ঘুরে গিয়েছে। মহিলাদের হাতে এই স্টেশনের অবস্থা ফিরে আসছে দিনের পর দিন। এ বিষয়ে স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র স্টেশন ম্যানেজার প্রতিমা দে বলেন, “আমাদের স্টেশনে যাঁরা নতুন আসেন তাঁরা সবাই মহিলা বলে অনেকে চমকে যান। ভাল করে খুঁটিয়ে দেখেন। প্রথম প্রথম অস্বস্তি হত, এখন গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে।” দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টার ডিউটি মহিলাদের। বাড়ানো হয়েছে স্টেশনের নিরাপত্তা। প্ল্যাটফর্মে ঢোকা ও বেরনোর মুখে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগান হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র স্টেশন ম্যানেজারের বয়ান অনুযায়ী, প্রথম প্রথম যখন তিনি বদলি হয়ে এখানে আসেন তখন সত্যিই রাতের দিকে গা ছমছম করত। জুয়ার ঠেকের পাশাপাশি ছিল মাতালদের উপদ্রব। একটা ভয় ভয় মাখা প্রচার থাকায় আসলে আরও ভয় জাঁকিয়ে বসত। কিন্তু তেমন বড় কোনও সমস্যা হয়নি। ধীরে ধীরে ভয় কেটেছে। ছোটখাট ঝুট ঝামেলা সব জায়গাতেই লেগে থাকে। সেগুলো আরপিএফ সামলে নেয়। আর এখন স্টেশনটিকে আলো, ক্যামেরা–ইত্যাদি দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “প্রত্যেক মহিলাকর্মী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। এখনকার মেয়েরা সীমান্তেও লড়ছে। কোথাও পিছিয়ে নেই। আমিও কাজ করছি। সত্যি বলতে অবশ্যই সহযোগিতারও প্রয়োজন হয়। আর এখানে তা পেয়েছি। এখনও পর্যন্ত কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আমরা মহিলারাই সকাল থেকে রাত এই স্টেশনে কাজ করি। চিন্তার কিছু নেই। আমরাও কাধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পারি। স্টেশনটি পরিচালনার সমস্ত কাজই এখন পুরোদমে চালাচ্ছেন মহিলারা।”

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।