প্রিয় মানুষকে নিজের জন্য ডাকনাম রাখতে বলতেন যে লেখক

By: Amit Patihar

October 7, 2021

Share

চিত্রঋণ: গুগল

আদ্যপান্ত একজন যুদ্ধক্ষেত্রের মানুষ, অথচ কী রঙিন জীবন! এমনটা হয় না তা নয়, কিন্তু শেষটা এতটা মর্মান্তিক হোক, তা বোধহয় কেউই চান না। কিন্তু, কে এই লেখক এবং সাংবাদিক এবং… প্রেমিক?

একটু দেখে নেওয়া যাক।

বাবা ছিলেন একাধারে ফিজিশিয়ান এবং রোমাঞ্চপ্রিয়, ছোটবেলায় তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছিলেন বিভিন্ন শহরে ঘুরে শিকার, মাছ ধরা ও ঘুরে বেড়ানোর আগ্রহ। কিন্তু বয়স বাড়তে থাকলে কর্মসূত্রে যুদ্ধের ময়দানে নামতে হল তাঁকে। একের পর এক মারান্তক বড় বড় দুর্ঘটনার সম্মুখীন হলেন অনেকবার। একটার পর একটা প্রেম তাঁর জীবনে এলো, সঙ্গে নিয়ে এলো লেখার রসদ। জিতলেন পুলিৎজার, নোবেল। প্রিয় মানুষদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ডাকনাম রাখলেন, চিঠি লিখলেন প্রেমের। কিন্তু শেষে যে পরিণাম হল তার পরিকল্পনা বোধ হয় কেউই করতে পারেননি কোনওদিন।

১৮৯৯ সালের একুশে জুলাই আমেরিকার ওক পার্কে জন্মগ্রহণ করেন ভদ্রলোক। বাবা একজন ফিজিশিয়ান এবং মা সঙ্গীতশিল্পী। মাত্র এক বছরের মধ্যে জন্ম নেওয়া তাঁর দিদি এবং তাঁকে মা সবসময় যমজ সন্তান হিসেবেই মানুষ করতেন, এমনকি প্রায় তিন বছর বয়স অবধি চুল বড় রেখে দিদির পোশাক পরানো হতো তাঁকে। মা একজন বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী হওয়ায়, তার ছেলেকে রীতিমত জোর করে ভায়োলিন শিখতে বাধ্য করেছিলেন। প্রতি গ্রীষ্মে তিনি পরিবারের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করতে যেতেন, তরুণ বয়সে বাবার সঙ্গে উত্তর মিশিগানের জঙ্গলে এবং হ্রদে শিকার, মাছ ধরা এবং শিবির করতে করতে পরবর্তী জীবনে ভ্রমণ এবং রোমাঞ্চপিপাসু হয়ে ওঠেন। স্বভাবতই বাবার সঙ্গে সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে বেশি গভীর হয়েছিল তাঁর। ১৯১৭ সালে রিভার ফরেস্ট হাই স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে মার্কিন সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং দুর্বল দৃষ্টিশক্তির জন্য প্রত্যাখ্যাত হন। এরপর একটি রেডক্রস সংস্থায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়ে ইতালিতে সামরিক অ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে চলে যান প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে। এই চাকরির প্রথম দিনই মিলান শহরের একটি দুর্ঘটনা স্থলে পাঠানো হয় তাঁকে, যেখানে একটি যুদ্ধাস্ত্র কারখানায় বিস্ফোরণ হয়েছিল। পড়ে ১৯৩২ সালে প্রকাশিত একটু নন-ফিকশন বই ‘ডেথ ইন দ্য আফটারনুন’-এ ঘটনাটি বর্ণনা করে ভদ্রলোক লিখেছিলেন, সেখানে মৃতদেহ খুঁজতে গিয়ে একটিও গোটা মৃতদেহ পাননি তাঁরা। এখানেই সহকর্মীদের জন্য চকলেট ও সিগারেট আনতে বেরিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুরুতরভাবে আহত হন তিনি। আহত হওয়া সত্ত্বেও ইতালিয় সৈন্যদের নিরাপত্তায় সহায়তা করে জিতে নেন ‘মেরিট ক্রস’ সম্মান। যদিও দুর্ঘটনায় দুই পায়ে গুরুতর আঘাত পেয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে কাটিয়েছিলেন তিনি। এই সময় বয়সে সাত বছরের বড় অ্যাগনেসের প্রেমে পড়েন ভদ্রলোক। অ্যাগনেস তাঁকে এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে তিনি অন্য কোনও সম্পর্কে আবদ্ধ আছেন। নিজের দুর্ঘটনা এবং মন ভাঙার পর বাড়ি ফিরে আসা এই যুবক মানসিক ভাবে বিমর্ষ হয়ে পড়েন। এই সময় পরিচয় হয় হেডলির সঙ্গে এবং ক্রমে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন দুজনে। ধীরে ধীরে এই সম্পর্ক বিয়েতে রূপান্তরিত হয়। এই বিয়ের পর জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায় ভদ্রলোকের। কিন্তু ক্রমে সময় বদলায়, কাজের সূত্রে আলাপ হয় পলিন ফাইফারের সঙ্গে এবং একটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন দুজনে। প্যারিসে থাকাকালীন একটি ডাক মারফত জানতে পারেন নিজের পিতার আত্মঘাতী হওয়ার খবর। এই ঘটনায় বিধ্বস্থ হয়ে তিনি মন্তব্য করেছিলেন,’আমিও হয়তো একই ভাবে মারা যাব’। ১৯৩০ সালের নভেম্বরে, একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় তাঁর হাত ভেঙে যায়। প্রায় সাত সপ্তাহ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। ১৯৩৭ সালে, একটি সংবাদ মাধ্যমের হয়ে স্পেনের গৃহযুদ্ধে সাংবাদিকতা করার জন্য যান তিনি। স্ত্রী পলিন তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করতে বারণ করা সত্ত্বেও জোর করে গিয়েছিলেন সেখানে। এই সময় বিচ্ছেদ হয় দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে এবং পরিচয় হয় মার্থা গেলহর্নের সঙ্গে। ১৯৪০ সালে তার সাথে বিয়ের বন্ধনে জুড়ে যান তিনি। মার্থা তাঁকে তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস, ‘ফর হোম দ্য বেল টোলস’ লিখতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

এতক্ষণ হয়তো অনেকেই বুঝতে পেরে গিয়েছেন যে, ওপরে বর্ণিত গল্পটি বিখ্যাত লেখক, সাংবাদিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের জীবন নিয়ে লিখিত। যাঁরা জানেন না তাঁদের জন্য আরও ভয়ঙ্কর কিছু মোড়কের উন্মোচন এখনও বাকি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন স্ত্রী মার্থাকে বিস্ফোরক ভর্তি একটি জাহাজে বাধ্য হয়ে আটলান্টিক অতিক্রম করতে হয় কারণ হেমিংওয়ে তাঁকে একটি বিমানে প্রেস পাস পেতে সাহায্য করতে অস্বীকার করেছিলেন। বহু কষ্টে ফিরতে পেরে মার্থা যখন আর্নেস্টের কাছে পৌঁছন তখন জানতে পারেন তিনি একটি গাড়ি দুর্ঘটনার কারণে হাসপাতালে ভর্তি। কিন্তু তাঁর পরিস্থিতি দেখে তাঁর প্রতি একটুও সহানুভূতিশীল ছিলেন না তাঁর তৃতীয় স্ত্রী; তারপর পুনরায় আরেকটা সম্পর্ক ভেঙে সদ্যপরিচিতা ম্যারি ওয়েলশকে বিবাহপ্রস্তাব দেন আর্নেস্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর সাহসিকতার জন্য হেমিংওয়েকে একটি ব্রোঞ্জ স্টার প্রদান করা হয়। ১৯৪৬ সালে তিনি ম্যারিকে বিয়ে করেন। ১৯৪৫ সালের একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় তাঁর হাঁটু ভেঙে যায় এবং আরেকটি দুর্ঘটনায় কপালে গভীর চোট পান। একই সময়ে স্ত্রী ম্যারি প্রথমে তার ডান পায়ের গোড়ালি এবং পরবর্তীতে স্কিইং দুর্ঘটনায় তার বাঁ পায়ের গোড়ালি ভেঙে ফেলেন। দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয় ছেলে প্যাট্রিকও। এর আগে থেকেই ক্রমশ হতাশায় ডুবে যেতে থাকেন একের পর এক পাঁচ বন্ধুর মৃত্যুর খবরে। এই সময় মানসিক সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপে ভুগতে শুরু করেন তিনি। রোমান্টিক এই লেখক এরমধ্যেই স্ত্রী ম্যারির সঙ্গে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়ে এক ১৯ বছর বয়সী তরুণী আদ্রিয়ানার প্রেমে পড়েন, যদিও এই সম্পর্কটি বেশি দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এই সময় প্রবল অসুস্থতা নিয়েই মাত্র আট সপ্তাহের মধ্যে ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ লিখেছিলেন তিনি, এবং ১৯৫২ সালে জিতে নেন পুলিৎজার পুরস্কার। আফ্রিকায় থাকাকালীন, স্ত্রী ম্যারিকে উপহার দিতে গিয়ে প্রথমদিন সস্ত্রীক বিমান দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হন। পরদিন, চিকিৎসা করাতে যাওয়ার সময় আবার সস্ত্রীক বিমানে চড়েন এবং বিমানটি বিস্ফোরিত হয়। এর কদিন পর একটি বিস্ফোরণে আবার আহত হন তিনি, পুড়ে যায় অর্ধেক শরীর। ক্রমে অকেজো হয়ে যায় একটি কিডনি, লিভার। ১৯৫৪ সালের অক্টোবরে, হেমিংওয়ে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। কিন্তু ক্রমশ শারীরিক এবং মানসিক পরিস্থিতির অধঃপতন হলে ২  জুলাই, ১৯৬২-র ভোরে তাঁর প্রিয় বন্দুক দিয়ে আত্মহত্যা করেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে।

আগাগোড়া সাহসী সামরিক কর্মী, লেখক এবং কর্মদক্ষ সাংবাদিক ভদ্রলোক আদতে ছিলেন একজন চুড়ান্ত প্রেমিকও। নিজের জীবনে যে তিনি বারবার প্রেমে পড়েছেন তা নয়, তাই নিয়ে একের পর এক লিখে গেছেন উপন্যাস। প্রেমিকাদের চিঠি লিখেছেন যেমন রসালো ভাবে তেমন ভাবেই বিড়াল পুষতেন এবং আদুরে নাম রাখতেন তাদের। প্রথম স্ত্রী হ্যাডলিকে বিয়ে করার পর নিজের জীবন বদলে যাওয়া যেমন স্বীকার করেছেন, দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের সময় নাটকীয় ভাবে ভেঙেও পড়েছেন। ফুল দিয়ে সাজিয়েছেন নিজের বাড়ি, চিঠির শেষে নিজের নামের জায়গায় লিখেছেন ‘তোমার প্রিয় পাপা’, প্রতিটা প্রিয় মানুষকে নিজের জন্য ডাকনাম রাখতে বলতেন তিনি। এমনকি আত্মহত্যার সময় বেছে নেওয়া বন্দুকটিকেও নিজের বন্ধু বলতেন আর্নেস্ট। নিজের শেষের বছরগুলিতে তাঁর আচরণ ছিল তাঁর বাবার মতো। জানা যায়, তাঁর এক বোন এবং এক ভাইও আত্মহত্যা করেছিলেন। হেমিংওয়ের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ব্যাখ্যা করার জন্য বেশ কিছু তত্ত্বের উদ্ভব হয়েছিল, যার মধ্যে রয়েছে যে,  তাঁর জীবনের একাধিক দুর্ঘটনা তাঁকে দীর্ঘস্থায়ী বিষাদের পরিস্থিতির মধ্যে নিয়ে গিয়েছিল, যা পরবর্তীকালে তাঁকে আত্মহত্যার দিকে পরিচালিত করে।

More Articles

error: Content is protected !!