পাঁচ মাসে ১৭ হাজার মৃতদেহ দাফন! গাজার মৃত্যুমিছিল ঘুমোতে দেয় না বৃদ্ধ জাফরকে

Israel War on Gaza: গত সাতাশ বছরে যে পরিমাণ শবদেহকে সমাধিস্থ করেছেন জাফর, গত পাঁচ মাসে তার দশগুণ দেহ সৎকার করতে হয়েছে তাকে। গাজা এখন গণকবর।

Sohini Das
৪ মিনিট
পাঁচ মাসে ১৭ হাজার মৃতদেহ দাফন! গাজার মৃত্যুমিছিল ঘুমোতে দেয় না বৃদ্ধ জাফরকে

মৃত্যুর পর মৃত্যু, ধ্বংসস্তূপের পর ধ্বংসস্তূপ দেখাটাই এখন অভ্যাস। যুদ্ধের পেরিয়ে গিয়েছে ১৭৫ দিন। গাজায় মৃত্যুর সংখ্যা ছুঁয়ে ফেলেছে প্রায় ৩০ হাজার। জখম কয়েক লক্ষ সম্ভবত। গত বছরের সেই ৭ অক্টোবর থেকে একই রকম পরিস্থিতি রয়েছে প্যালেস্টাইনের বিস্তৃত এলাকায়। আগ্রাসন কমাতে নারাজ ইজরায়েল। বরং প্রতিনিয়ত হামলার পরিধি বাড়িয়েই চলেছে নেতানিয়াহু সেনা। একদিন আগেই রাতভর ইজরায়েলি বোমায় মৃত্যু হয়েছে শতাধিক জনের। আমেরিকা সওয়াল করেছে রমজানের সময় প্যালেস্টাইনে যুদ্ধশান্তির পক্ষে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ চায় থামুক যুদ্ধ। ইজরায়েল কী চায়, তা বোধহয় তারাও জানে না। যে কোনও রকমে গাজা, প্যালেস্টাইনকে সম্পূর্ণ ধ্বংস না করে বোধহয় থামবে না এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। মৃত্যুমিছিল, দুর্ভীক্ষ, ওষুধের অভাবে মুমূর্ষুর শেষ হয়ে যাওয়া, কোনও কিছুই বোধহয় দাগ কাটছে না ইজরায়েল সরকারের মস্তিষ্কে, হৃদয়ে।

শান্তি যেন সেখানে এক দূরতর দ্বীপ। যে কোনও মুহূর্তে ইজরায়েলি গুলি ভেদ করে যাবে শরীর, বোমার টুকরো এসে ছিন্নভিন্ন করে দেবে হাত-পা-মাথা, তার জন্যই যেন দিন গুনছে গাজার মানুষ। ক্রমশ পিছু হঠতে হঠতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে গাজাবাসীর। আপাতত বোধহয় গোটা প্যালেস্টাইনে এমন কোনও জায়গা বেঁচে নেই, যেখানে গিয়ে মাথা লুকোতে পারে গাজাবাসী। গোটা দেশটাই যেন একটা বধ্যভূমি। যেখানে প্রতিদিন মারা যান হাজার হাজার মানুষ। মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ, ইজরায়েলের হামলার মুখ থেকে বাঁচে না কেউ-ই সেখানে। ইতিমধ্যেই গাজায় গণহত্যার প্রতিবাদে পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শাতায়েহ। তাতে পরিস্থিতি বদলায়নি। এখনও প্রতিদিন শত সহস্র মানুষের মৃতদেহ জমছে এদিকে ওদিকে। গণকবর রচিত হচ্ছে প্রতিদিন সমগ্র গাজা জুড়ে।

৬৪ বছরের সাদি হাসান সুলেমান বারাকা। স্থানীয় লোকেরা তাঁকে ডাকেন আবু জাওয়াদ নামে। আবু জাওয়াদ গাজার মানুষের বেহস্তে যাওয়ার দূত। তার হাতেই দাফন হয় এলাকার সমস্ত মৃত মানুষের। গত কয়েক দশক ধরে এটাই তার পেশায়। মৃতদেহ নিয়েই কাজ আবু জাওয়াদের। তবু এই মৃতদেহ যেন সে মৃতদেহ নয়। এ মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের মতবিরুদ্ধ এই মৃত্য়ু, যা লিখে দেয় কোনও ইজরায়েলি সেনা তার নিষ্ঠুর বন্দুক বা বোমা হাতে। এ সব কথাই দিনরাত ভাবতে থাকেন জাওয়াদ। ঘুম আসে না তাঁর। ৭ অক্টোবরের পর থেকে ভালো করে ঘুমোননি জাওয়াদ।

আগে ফজরের নমাজ পড়ে দিন শুরু হত জাওয়াদের। তারপর জলপাই তেল দিয়ে দুক্কা আর জাতার মেখে খেয়ে নিতেন নাস্তায়। তার পর গুটি গুটি পায়ে রওনা হতেন দেইর এল-বালাহের পূব দিকে রওনা হতেন। পেরিয়ে যেতেন খেজুর আর জলপাই গাছের সারি। এই ছিল জাওয়াদের রোজের নিয়ম। কিন্তু গত পাঁচ মাসে সেই নিয়ম একেবারে বদলে গিয়েছে। এখন মাথার উপর বোমারু বিমানের চক্কর। সব সময় যেন উঁকি মারছে মৃত্যুভয়। যে জাফরের হাত ধরে জন্নতপ্রাপ্ত হতেন শত শত গাজাবাসী, সেই জাফর আজ মৃত্যু দেখলে শিউরে ওঠেন। অথচ এমনটা কখনও হয়নি তাঁর।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সন্তানের মৃতদেহও আসবে যে কোনওদিন! রোজ ২০০ লাশকে কাফন পরাচ্ছেন গাজার এই বৃদ্ধ

Gaza Death toll : "আমি বাচ্চাদের টুকরো টুকরো অঙ্গগুলি একটি কাফনে যখন রাখি, হৃদয়-মস্তিষ্ক সব গুঁড়িয়ে যায়। এই বাচ্চাদের কী দোষ?” প্রশ্ন আল-মাঘরির।

মধ্য গাজার শরণার্থী শিবিরের প্রথম বাসিন্দা জাওয়াদ। এর আগে স্ত্রী ও ১০৪ বছর বয়সী বৃদ্ধা মায়ের সঙ্গে থাকতেন দেইর এল-বালাহ এলাকারই একটি একরত্তি বাড়িতে। মৃত্যু নিয়েই তাঁর কাজ। অথচ এলাকায় কী দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন জাওয়াদ। আশপাশের সকলেই ভালোবাসতেন হাসিখুশি সহজসরল এই মানুষটিকে। অথচ আজ আর বেঁচে থাকার মধ্যে কোনও সারল্য খুঁজে পান না জাওয়াদ। বরং মনে হয় বিকট এক জন্তুর মতো তার শিয়রে বসে রয়েছে যুদ্ধ নামক এক দানব। যা গাজা থেকে শুষে নিয়েছে সমস্ত প্রাণশক্তিটুকু। বেঁচে থাকাকেই খুব বড় অভিশাপ মনে হয় আজ তাঁর।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গাজার মৃতদেহ থেকে হৃদপিণ্ড, যকৃত সত্যিই সরিয়ে নিচ্ছে ইজরায়েল? কারণ জানলে শিউরে উঠবেন

Israel-Hamas War: এরই মধ্যে আবার ইজরায়েলের বিরুদ্ধে গুরুতর এক অভিযোগ করেছে ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটর গ্রুপ। তাদের দাবি, গাজায় যুদ্ধে নিহত ফিলিস্তিনি শরীরগুলি থেকে বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চুরি যাচ্ছে অহরহ।

মাত্র পাঁচ মাসেই অন্তত ৩০ কেজি ওজন কমে গিয়েছে জাওয়াদের। এই কয়েক মাসে নিজের শীর্ণ হাতে এত এত শরীর কবর দিয়েছেন তিনি, যে গুনে শেষ করতে পারবেন না। তার মধ্যে কেউ তাঁর কাছের মানুষ, কেউ তাঁর পড়শি। যে খুদে শিশুটিকে কালই খেলে বেড়াতে দেখেছেন দাওয়ায়, উচ্ছ্বল, চঞ্চল, তার বোমায় ছিন্নভিন্ন নিথর শরীরখানা মাটির তলায় শুইয়ে দিতে গিয়ে বুক ফেটে যায় জাওয়াদের। সেই যন্ত্রণা গুমরে গুমরে ওঠে বুকের ভিতর সর্বক্ষণ। সমস্তক্ষণ ভয়ের একটা আবহ মাথার মধ্যে ছুটতে থাকে পাগলা ঘোড়ার মতো।

গত সাতাশ বছরে যে পরিমাণ শবদেহকে সমাধিস্থ করেছেন জাফর, গত পাঁচ মাসে তার দশগুণ দেহ সৎকার করতে হয়েছে তাকে। গাজা এখন গণকবর। কোনও একটি বিশেষ জায়গা বা এলাকা নয়, গোটা গাজাই যেন এক সমাধিক্ষেত্র। একসঙ্গে তিরিশটি-চল্লিশটি করে দেহ কবর দিতে হয় জাফরকে। হিসেব বলছে, গত ৭ অক্টোবর থেকে অন্তত ১৭ হাজার মৃতদেহকে কবর দিয়েছেন তিনি। যুদ্ধ নিথর হয়ে যাওয়া হাজার হাজার শরীর। অজস্র শিশু, যারা তাঁর নাতি-নাতনির বয়সী। রোজ, প্রতিদিন।

প্রতিদিন সমাধিক্ষেত্র ভরে ওঠে মৃতদেহের মিছিলে। প্রতিদিন স্বজনবান্ধবকে নিয়ে সেখানে হাজির হন মানুষ। কান্নার কলরোলে ভেসে যায় মাটি। ভোর ৬টা থেকে সন্ধে ৬টা, আবু জাফর কবর খোঁড়েন। কফিন বানান, জানাজা প্রস্তুত করেন। মৃত শরীরগুলোর উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করেন সজল হৃদয়ে। যুদ্ধে ছিন্নভিন্ন মনগুলো অন্তত এমন বেহস্ত পাক, যেখানে যুদ্ধ শব্দটার অস্তিত্ব নেই। মনে মনে সেই ইচ্ছাটা খুব করে বলতে থাকেন জাফর। শোক পালনের উপাচার পেরিয়ে সেই প্রার্থনাটুকু মিশে যায় গাজার বারুদের গন্ধভরা বাতাসে।

জাফরের সারাদিনের কাজে সাহায্য করেন খান ইউনিসের চার যুবক। তাঁরা সকলেই বাস্তুচ্যুত। নিজস্ব মাটি হারিয়ে পথ হারিয়ে ফেলা সহযাত্রীদের মাটি জোগান। একই সঙ্গে যাঁরা রয়ে গেলেন এই যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায়, তাঁদের জন্য একটু খাবার, একটু জল, একটু সাহায্যের ব্যবস্থা করে দেন জাফর আর তাঁর সঙ্গীরা। বিনিময়ে তাঁরা কিছুই চান না, শুধু গাজায় একমুঠো যুদ্ধশান্তি ছাড়া।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নিষিদ্ধ নয়, বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা, কী আছে ফিলিস্তিনপন্থী স্যালি রুনির বইয়ে

Sally Rooney: ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে রয়্যালটি দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশের পর ব্রিটেনে স্যালি রুনির বই সরবরাহ বন্ধ করেছে ফ্যাবার।

সিজেপির কর্মসূচির আগে ৬ হাজার পুলিশ, দুর্ভেদ্য দুর্গ কনট প্লেস

Connaught Place protest: সিজেপির কর্মসূচির আগে কনট প্লেস এবং তার আশপাশের এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে দিল্লি পুলিশ। কনট প্লেসের আশপাশে ৬ হাজারেরও বেশি পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?