বর্ধমান রাজপরিবার কাহিনি

Arunima Mukherjee
৩ মিনিট
বর্ধমান রাজপরিবার কাহিনি

মোঘল মসনদে তখন সম্রাট ঔরঙ্গজেব বিরাজমান । ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে বাংলার নানান স্থানে তাঁর বিরুদ্ধে প্রায়ই প্রজারা বিদ্রোহ ঘোষণা করতেন। বলা হয়, তিনি নাকি জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় এই বিদ্রোহ দমনেই অতিবাহিত করেছিলেন। আর সম্ভবত, এই বিদ্রোহ দমনের মূল অস্ত্র হিসাবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন বাংলার জমিদারদের। ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে তাই বাংলায় নতুন করে বহু জমিদারগোষ্ঠী জন্ম নেয়, পরবর্তীতে এদের মধ্যে অনেকেই স্বাধীন রাজাধিরাজরূপে আত্মপ্রকাশ করেন। বর্ধমান রাজপরিবারের জন্মও তার বিপরীত ঘটনা নয়।

ভারতের শাসন ক্ষমতায় তখন মোঘল সম্রাট আকবর বিরাজমান। সেই সময় পাঞ্জাব থেকে পুরীতে তীর্থ ভ্রমনে আসেন ব্যবসায়ী সঙ্গম রাই। সঙ্গম রাই ছিলেন লাহোরের কোটলিমহল্লার বাসিন্দা। ঘুরতে ঘুরতে তিনি পৌঁছে যান বাংলার বর্ধমান জেলায়। বর্ধমান জেলার নিকটে বৈকুণ্ঠপুরে তিনি বসতি স্থাপন করেন। সম্ভবত, সেইসময় পাঞ্জাবের রাজনৈতিক অবস্থা ভালো না থাকার কারণে তাঁর ব্যবসার বিশেষ ক্ষতি হচ্ছিল, তাই তিনি আর ফিরে যেতে চাননি। প্রথমে তিনি ক্যারাভানে করে ঘুরে ঘুরে মাল বিক্রি করতেন , অবশেষে একদিন এই যাযাবর জীবনের অবসান ঘটিয়ে তিনি বৈকুন্ঠপুরে স্থায়ী হাট বসান।

সঙ্গম রাইয়ের ছেলে ছিলেন বঙ্কুবিহারী এবং তাঁর ছেলে ছিলেন আবু রাই। বর্ধমান রাজবাড়ির ইতিহাসে এই আবু রাই নামটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। বাংলার শাসনে ইতিমধ্যেই বসেছেন সম্রাট ঔরঙ্গজেব। পূর্বেই বলা হয়েছে, তাঁর শাসনকালে মুঘল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে অগুনতি প্রজা বিদ্রোহ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। তেমনই বাংলায় বারো ভূঁইঞা-র নেতৃত্বে বিদ্রোহ শুরু হয়। বাংলার এই বিদ্রোহ দমনের জন্য সম্রাট বিশাল এক সেনাবাহিনী পাঠান। কিন্তু ফিরতি পথে হঠাৎই মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বাংলায় প্রবল বর্ষণ শুরু হয়ে যায়। মুঘলসেনারা বর্ধমানে আটকে গেলে তাঁদের রসদ জোগায় এই আবু রাইয়ের হাট। ঔরঙ্গজেব কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের পথ হিসাবে আবু রাইকে বর্ধমান পরগণার কোতোয়াল–'চৌধুরী'র পদ দেন। ১৬৫৭ সালে তিনি এই সনদ দিয়েছিলেন। এরপর ১৬৮৯ সালে তিনি এই আবু রাইয়ের নাতি, কৃষ্ণরাম রাইকে পুরোদস্তুর জমিদার করে দেন। কৃষ্ণরামের আমলে চন্দ্রকোণা ঘাটালের জমিদার শোভা সিংহ মুঘলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলে, শোভা সিংহ কর্তৃক কৃষ্ণরাম নিহত হন, নিহত হন পরিবারের আরো পঁচিশজন সদস্য। কৃষ্ণরামের নাবালক পুত্র জগৎরাম কোন ক্রমে প্রাণে বেঁচে যান এবং ঢাকায় গিয়ে নবাবের কাছে আশ্রয় নেন। শোভা সিংহের মৃত্যুর পর তিনি আবার বর্ধমানে ফিরে যান এবং শোভা সিংহের আত্মীয়দের সেখান থেকে বিতাড়িত করেন। বর্ধমানের জমিদারি ফিরে পেয়ে তিনি মাত্র পাঁচ বছর জীবিত ছিলেন। ১৭০২ সালে তিনি মারা যান এবং ১৭০৭ সালে মারা যান সম্রাট ঔরঙ্গজেব। ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর বাংলার শাসনভার নামে মাত্র মুঘলদের অধীনে ছিল বললেই চলে, বাংলায় তখন স্বাধীনভাবে নবাব হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ। বাংলার শাসন কেন্দ্র ঢাকা থেকে স্থানান্তর হয় মুর্শিদাবাদে। মুর্শিদাবাদ হয় বাংলার নতুন রাজধানী। তাই স্বাভাবিকভাবেই তখন দিল্লী অপেক্ষা মুর্শিদাবাদের উপর নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, তৎকালীন সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশেষ উন্নত না হওয়ায় মুর্শিদকুলি খাঁ’এর পক্ষেও দিল্লীর উপর নির্ভর করা সম্ভব ছিল না। বাংলার জমিদাররাই ক্রমে তাঁর শক্তির মূল উৎস হয়ে ওঠে।

ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল শাসনব্যবস্থা ক্রমশ ভেঙে পরতে থাকে। বাংলায় শুরু হয় মারাঠা আক্রমণ। জগৎরামের মৃত্যুর পর তাঁর দুই ছেলে কীর্তিচাঁদ ও মিত্রসেন। তাঁদের আমলে শুরু হয় মারাঠা আক্রমণ। মারাঠারা মূলত আক্রমণ চালাত উড়িষ্যা, মেদিনীপুর এবং বর্ধমানের পথে। বর্ধমান পড়ে যায় সমূহ বিপদের মুখে। বাংলাকে মারাঠা আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করতে বর্ধমানের জমিদারদের যে ভূমিকা থাকবে তা বলার অবকাশ থাকে না। এই সুযোগ নিয়েই বর্ধমানের জমিদাররা চন্দ্রকোণা, ঘাটাল, বিষ্ণুপুর এবং বীরভূমের ছোট ছোট জমিদারিগুলি নিয়ে এক বিশাল জমিদারি স্থাপন করেন। ফলে তাঁরা এক বিপুল প্রতিপত্তির মালিকানা লাভ করেন। এই সময়ে কীর্তিচাঁদ মুঘলদের অনুমতি নিয়ে তাঁর পুত্র চিত্রসেনকে রাজা বানিয়ে দেন। এক সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে বর্ধমান পায় তাঁর প্রথম রাজা। চিত্রসেন সিংহাসনে বসেন ১৭৩৬ সালে। অপুত্রক অবস্থায় তিনি মারা যান। এই ছিল বর্ধমান রাজপরিবারের কাহিনী। চিত্রসেনের পরেও বহুকাল যাবৎ এই রাজকার্যে অব্যাহত ছিল।

বর্ধমানের এই রাজপরিবার নিয়ে এক কাহিনী প্রচলিত আছে। পলাশির যুদ্ধের পর যখন বাংলায় কোম্পানির দৌরাত্ম্য চলছে, তখন রাজা তেজচন্দ্রের বিরুদ্ধে ব্রিটিশরা অপশাসনের অজুহাত দিয়ে তাঁকে গৃহবন্দি করেছিলেন। প্রথম থেকেই কোম্পানির সাথে এই পরিবারের সম্পর্ক তেমন ভালো ছিল না। তেজচন্দ্রের ছেলে প্রতাপচন্দ্র, তেজচন্দ্রের জীবদ্দশাতেই মারা যান। তাঁর মৃত্যুর ১৪ বছর পরে একজন নিজেকে প্রতাপচন্দ্র বলে দাবি করেন। ভাওয়াল রাজার প্রত্যাবর্তনের কাহিনী বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করলেও এই কাহিনী অনেকেরই অজানা। এই কাহিনী ‘জাল প্রতাপ মামলা’ নামে খ্যাতি লাভ করেছিল।

বর্তমানে বর্ধমানে যে রাজপ্রাসাদটি দেখা যায়, তা আসলে মূল প্রাসাদের অনেক পরে স্থাপন করা হয়। প্রথম প্রাসাদ নির্মিত হয়েছিল বর্ধমানের নিকট কাঞ্চননগরে। পরে মোট সাতটি প্রাসাদ নিয়ে এক কমপ্লেক্স তৈরি করা হয়, যা বর্তমান প্রাসাদ।

তথ্য সূত্র - দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘বনেদি কলকাতার ঘরবাড়ি’।

চিত্রঋণ - আনন্দবাজার পত্রিকা।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।