খোলা জানলা, চারদিক খোলা ঘর! 'কোনার্ক' যেন ঠিক রবির মনের আয়নাটি

Konark, A House Of Tagore: কোনার্ক বাড়ির বিশেষ আকর্ষণ ছিল বেশ নিচু ছাদ আর সমতলের থেকে কিছুটা উঁচুতে থাকা বসার ঘর। আটটা ঘর নিয়ে তৈরি এই বাড়ির ছাদ ছিল বাকি সবক'টি বাড়ির থেকে অনেকটাই নিচু।

Saikat Gupta
৩ মিনিট
খোলা জানলা, চারদিক খোলা ঘর! 'কোনার্ক' যেন ঠিক রবির মনের আয়নাটি

শান্তিনিকেতন, বোলপুরে রবিঠাকুরের স্মৃতিধন্য 'উত্তরায়ণ'। এখন যাকে উত্তরায়ণ কমপ্লেক্স বলা হয়। কোনার্ক, শ্যামলী, পুনশ্চ, উদয়ন এবং উদিচী— এই পাঁচটি বাড়ি মিলিয়েই উত্তরায়ণ। প্রথমে কিন্তু এই উত্তরায়ণ একটিই বাড়ির নাম রাখা হয়েছিল। ১৯২৯ সালে সেটা। শিলং থেকে শান্তিনিকেতনে এসে বসবাস করতে শুরু করলেন রবীন্দ্রনাথ। যদিও মনে করা হয়, উত্তরায়ণ চত্বরের প্রথম নির্মিত বাড়ি কোনার্কের ভিত্তিপ্রস্থ স্থাপিত হয়ে গিয়েছিল ১৯১৮ সালের দিকেই। তখনও অবশ্য কোনার্ক নামটি রাখেননি রবীন্দ্রনাথ। পরে যখন গুরুদেব মনস্থ করলেন যে শান্তিনিকেতনে ‘উত্তরায়ণ’ কোনো একটা বাড়ি হবে না, অনেকগুলো বাড়ি নিয়ে হবে তখন এই বাড়ির নাম রাখা হলো কোনার্ক। প্রথম দিকে সম্পূর্ণ বাড়ি বলতে যা বোঝায় তা আদপেই ছিল না এই কোনার্ক। গুরুদেব আসলে চেয়েছিলেন চার দিক খোলা একটি ঘর, যেখান থেকে বসে তিনি শান্তিনিকেতন দিগন্ত ছোঁয়া মাঠ, খোলা প্রকৃতির পরশ পেতে পারেন। ফলে শান্তিনিকেতনের বাকি বাড়িগুলির চেয়ে এই কোনার্ক ছিল আলাদা। প্রায় সারাবছরই রবীন্দ্রনাথের পরশ লেগে থাকতো এই বাড়ির উঠোনে।

রবীন্দ্রনাথের অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল একটা খোলা বারান্দা। যেখানে তিনি তার কবিতা আর নাটক পাঠ করতে পারবেন, তার নৃত্যনাট্যগুলো মঞ্চস্থ হবে একদম প্রকৃতির মাঝে। সেই পরিকল্পনারই ফসল আসলে এই কোনার্ক ভবন। সূর্যোদয়ের আগেই ভোররাতে রবীন্দ্রনাথ এসে বসতেন এই বাড়িটির বিশাল বারান্দায়। ১৯১৯ সালে শুরু হয়ে ১৯২২ সালে শেষ হওয়া তিনদিক খোলা পুবের লাল বারান্দা ছিল কোনার্ক মাটির বাড়ির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। যদিও প্রথমে এই বাড়ির মেঝে ছিল মাটি, কাঁকর আর পাথর পিটিয়ে তৈরি আর মাথার উপরে ছিল খড়ের চাল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আজও রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বহন করে কুয়াশামাখা এই পাহাড়ি বাংলো

মংপুর এই বাসভূমি গুরুদেবের শেষ জীবনের আশ্রয়স্থল, যার সান্নিধ্যে এসে জোড়াসাঁকোর চৌহদ্দির আড়ালে লুকিয়ে রাখা যাবতীয় বিস্ময়কে তিনি দু' হাত ভরে আস্বাদন করতে করতে, পাড়ি দিয়েছিলেন অমৃতলোকের দিকে।

কোনার্ক বাড়ির বিশেষ আকর্ষণ ছিল বেশ নিচু ছাদ আর সমতলের থেকে কিছুটা উঁচুতে থাকা বসার ঘর। আটটা ঘর নিয়ে তৈরি এই বাড়ির ছাদ ছিল বাকি সবক'টি বাড়ির থেকে অনেকটাই নিচু। সবদিক থেকে কোনার্কের গঠনশৈলী চোখে পড়ার মতোই। ঘর আর মেঝের উচ্চতার তারতম্য ইচ্ছে করেই তৈরি করা হয়েছিল যাতে এই বাড়ির এক আলাদা রকমের বিশেষত্ব তৈরি করা যায়। পরবর্তীতে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ নিজের হাতে উদয়ন বানাবার সময়ে ঠিক যেমনটা ভেবেছিলেন, প্রথম দিকের কোনার্ক ছিল অনেকটাই সেইরকম।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জমিদার রবীন্দ্রনাথ || হিন্দু আর মুসলমান প্রজাদের সেদিন এক আসনে বসিয়েছিলেন কবিগুরু

রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যেন কোনও বিভাজন না থাকে তাঁর জমিদারিতে।

ব্যতিক্রমী রবীন্দ্রনাথ খোলা জানলা চেয়েছিলেন এই বাড়িতে, তাই কোনও গরাদ ছিল না এখানে। ঠিক তেমনই, কোনার্কের ঘরে কংক্রিটের আসবাবপত্র তৈরি করা হয়েছিল। যদিও পরে সেগুলো ভেঙে ফেলা হয়। শান্তিনিকেতনে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষানিরিক্ষা সম্ভবত করা হয়েছে এই বাড়িটির উপরেই। কখনও বাড়ির উঁচু বারান্দাটা কাচ দিয়ে বাঁধিয়ে দেওয়া হল। যাতে চারপাশের সবকিছু ভালোভাবে দেখা যায়। আবার কখনো ঘরের সব আসবাব পাল্টে গেল রাতারাতি।

রবীন্দ্রনাথ থাকতেন উঁচু বসার বারান্দার বাঁদিকে একটি সরু মতন ঘরে আর বারান্দায় ইজিচেয়ারে অথবা সিঁড়ির ধাপে বসে পড়ে শোনাতেন মিলটন, বায়রন এর মতো কবিদের কবিতা। মন ও স্বাস্থ্য ভালো থাকলে আশ্রমিকরা শুনতে পেতেন জাপানি বা জার্মানি কবিতার বাংলা অনুবাদ। 'নটীর পূজা' নাটকটি প্রথম উপস্থাপিত হয় এখানেই। এই বাড়িতেই থেকে গেছেন জওহরলাল নেহরু, কমলা নেহরু, উইলিয়াম পিয়ারসন, চার্লস অ্যান্ড্রুজের মতো দিক্পালরা।

কোনার্ক বাড়ির সামনে রবীন্দ্রনাথ নিজের হাতে একটি শিমুল গাছ পুঁতেছিলেন, নিজের হাতে পরিচর্যাও করতেন সেই গাছে নিয়মিত। পরে তার সঙ্গে যোগ হল একটি মাধবীলতা। আজও দু'টো গাছ হাত ধরাধরি করে উঠে চলেছে ওপরের দিকে। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর তার পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী এই বাড়িতে দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন। শান্তিনিকেতনে গেলে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য এই উত্তরায়ণ চত্বরে পা দেন না এমন পর্যটক বোধহয় পাওয়া কঠিন। রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর শান্তিনিকেতন যাপনের চিহ্ন বুকে নিয়ে আজও ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই উত্তরায়ণ।

লিখেছেন
Saikat Gupta
Saikat Gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।