বানজারাদের প্রান্তিক স্বরকেই কণ্ঠ দিতে চান সাহিত্য আকাদেমি-জয়ী রমেশ

Sahitya Akademi Yuva Puraskar for Telugu: তেলঙ্গানার নিজামাবাদের বাসিন্দা রমেশ কার্তিক নায়ক জিতে নিয়েছেন ২০২৪ সালের সাহিত্য আকাদেমি যুব পুরস্কার। রমেশ নিজের সাহিত্যভুবন রচনা করেন তেলগু ভাষায়।

Sohini Das
৩ মিনিট
বানজারাদের প্রান্তিক স্বরকেই কণ্ঠ দিতে চান সাহিত্য আকাদেমি-জয়ী রমেশ

"আমাদের এই গ্রাম পাখির বাসা, আমাদের কুঁড়েঘরগুলি ভাঙা ডিম আর আমাদের এই জীবন যেন ভেসে থাকা পালক।"— বানজারাদের জীবন আসলে যেন তাই। জীবনকে সে ভাবেই দেখেছেন তিনি। আর যা দেখেছেন, তাকেই শব্দবায়ু জুগিয়ে গিয়েছেন অবিরত। সেই চেষ্টাই তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে একের পর এক বই। তার মধ্যে ধাভলো (সং অব ল্যামেন্ট) নামে একটি ছোটগল্পের সংকলন সম্প্রতি তাঁকে এনে দিয়েছে অনন্য সম্মান। তেলঙ্গানার নিজামাবাদের বাসিন্দা রমেশ কার্তিক নায়ক জিতে নিয়েছেন ২০২৪ সালের সাহিত্য আকাদেমি যুব পুরস্কার। রমেশ নিজের সাহিত্যভুবন রচনা করেন তেলুগুভাষায়। তিনিই প্রথম আদিবাসী লেখক, যিনি এই সম্মান জিতে নিলেন। একই সঙ্গে তেলুগুভাষার সাহিত্যিকদের মধ্যেও তিনি কনিষ্ঠতম, যিনি এই পুরস্কার পেলেন।

নিজামপুরের ছোট্ট গ্রাম জাকরানপল্লী থান্ডা। ঘন বন আর পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে থমকে দাঁড়াতে হয় যেখানে, সেখানেই জন্ম রমেশের। আসল নাম নুন্নাভথ কার্তিক নায়ক। বয়স মাত্র ছাব্বিশ। বাবা নুনাভথ সেবান্তাবাই চাষবাস করেন। সেই কাজে হাত লাগান মা মোজিরামও। বাবা-মা ভোর হতেই ক্ষেতের কাজে বেরিয়ে যেতেন। ছোট্ট রমেশের সময় কাটত কবিতা আর সাহিত্যের সহচার্যে। সেই বোধহয় শুরু। গ্রোগ্রাসে বই পড়তেন রমেশ। রমেশরা স্থানীয় লাম্বাদি বা বানজারা সম্প্রদায়ের মানুষ। জীবনের প্রতিপদে পদে যে সংগ্রাম, লড়াই তাঁদের ললাট লিখন, তা বোধহয় জন্ম থেকেই জানতেন রমেশরা। অল্প বড় হতে না হতেই বোধন শহরের একটি আবাসিক স্কুলে তাঁকে পাঠিয়ে দিলেন মা-বাবা। ফলে থান্ডা থেকে দূরেই কেটে গেল বেশিরভাগ ছোটবেলাটা। তার মধ্যেই তাঁর জীবনে একটা বড় জায়গা করে নিল সাহিত্য।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অপরের জন্য লিখে সাহিত্যে নোবেল, কে এই জন ফসে?

Nobel Prize in Literature 2023: ফসে তাঁর ভাষার জনপ্রিয়তম সাহিত্যিক। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখাতে তাঁর অবাধ যাতায়াত। উপন্যাস, কবিতা থেকে নাটক, প্রায় সব শাখাতেই তুখোড় তাঁর কলম।

বহু দিন ধরেই আদিবাসী জীবন, বিশেষত বানজারদের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে তাঁর আগ্রহ। তিনি বরাবর এমন কিছু লিখতে চেয়েছেন, যা নিয়ে আগে কখনও লেখা হয়নি। রমেশ বিশ্বাস করেন, ঐতিহাসিক নন-ফিকশন লেখা আসলে কোনও কাজে আসে না। তা শুধু অন্যরা যা বলেন, সেই কথারই পুনরাবৃত্তি করে যায়। তাই তিনি জীবন লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। লাম্বাদিদের কথা, যা আজ অবধি অলিখিত, অনাবিষ্কৃত।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বারবার নিজের স্মৃতির ময়নাতদন্ত, নোবেল জয়ী অ্যানি এরনোঁর সাহিত্য যে কারণে জনপ্রিয়

Annie Ernaux Nobel Prize: ষাট বছরের জীবনে এরনোঁ শুধু নিজের কথাই বলে গিয়েছেন, তা নয়। সেখানে জড়ো হয়েছে তাঁর প্রজন্ম, তাঁর বাবা মায়ের প্রজন্ম এবং নানান শোষিতের কথকতা।

২০১৮ সালে প্রকাশ পায় তাঁর কবিতার বই 'বলদাইর বান্দি'। ২০২১ সালে ছোট গল্পের সংগ্রহ 'ধাভলো (সং অব ল্যামেন্ট)' প্রকাশিত হয়। ২০২২ সালে আরও একটি ছোটগল্পের সংকলন প্রকাশ পায় তাঁর 'কেসুলা' নামে। অধ্যাপক সূর্য ধনঞ্জয় বইটিতে সহ-সম্পাদনা করেছেন। তাঁর সাম্প্রতিকতম বইটি ইংরেজিতে তাঁর প্রথম কবিতা সংকলন, যার নাম 'চাকমাক'। তাঁর দ্বিতীয় বই 'ধভলো'-র জন্যই তিনি ২০২৪ সালের সাহিত্য আকাদেমি যুব পুরস্কারটি জিতে নিয়েছেন রমেশ। ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় প্রকাশনাগুলিতে বেশ কয়েকটি পুরষ্কার জিতে নিয়েছে তাঁর বইগুলি। এখানেই শেষ নয়, এর মধ্যেই তেলঙ্গানা এবং অন্ধ্র প্রদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে জায়গা করে নিয়েছে তাঁর সাহিত্য। যে সাহিত্যের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে যাযাবর জাতি বানজারদের জীবন বাস্তবতা। যাঁরা লাম্বাদি নামেও পরিচিত। মূলত রাজস্থান এদের জন্মভূমি হলেও ক্রমে গোটা দেশে ছড়িয়ে গিয়েছেন বানজাররা।

আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারে বড় হয়ে সাহিত্যচর্চার নেশাকে রসদ জুগিয়ে চলার কাজ সহজ নয়। দশম শ্রেণি পাশ করার পর কী না করেছেন রমেশ। কখনও ক্যাটারিংয়ের দলে ভিড়ে অনুষ্ঠান বাড়িতে খাবার পরিবেশন করেছেন, কখনও বাড়ি বাড়ি গিয়ে এসি মেরামতির কাজ করেছেন। কখনও আবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে বই বিক্রি করেছেন। তবে তা কখনও সাহিত্যচর্চার পথে বাধা হয়নি। প্রথম বই 'বলদাইর বন্দি' প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই বদলায় জীবন। পাঠকমহলে দারুণ ভাবে আদৃত হয় তাঁর সেই বই। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এবার মিলল সাহিত্য আকাদেমি যুব পুরস্কারের মতো স্বীকৃতি। তা-ও মাত্র ২৬ বছর বয়সে। বানজারাদের জীবনে সংকট, তাঁদের খণ্ড হয়ে ঘুরে ঘুরে বেঁচে থাকার ছবি, বাস্তুচ্যুত হওয়ার প্রতিমুহূর্তের যন্ত্রণা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর লেখায় পরতে পরতে। তাঁর বিশ্বাস, তাঁর এই স্বীকৃতি তাঁর লেখার পাশাপাশি বানজারা সম্প্রদায়ের এই ছিন্নমূল মানুষগুলোর জীবনধারার প্রতিও মানুষকে আকৃষ্ট করবে। সেখান থেকেও যে মূল ধারায়, মূল সমাজে কিছু মানুষ উঠে আসতে পারেন নিজেদের যোগ্যতায়, সেই ভাবনায় সিলমোহরটুকু লাগিয়ে দেবে। তাহলেই সার্থক তাঁর এই নিরলস সাহিত্যচর্চা।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।