মুদির দোকানি থেকে বীরভূমের বেতাজ বাদশা, অনুব্রতর উত্থান হার মানাবে বলিউডকে

ভাগ্যের উত্থানপতন কাকে বলে, অনুব্রতকে না দেখলে টের পাওয়া যায় না। এই অনুব্রত মন্ডল, যাঁর নির্দেশে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খায়, সেই বেতাজ বাদশা আজ সিবিআইয়ের জালে।

tiasa gupta
৩ মিনিট
মুদির দোকানি থেকে বীরভূমের বেতাজ বাদশা, অনুব্রতর উত্থান হার মানাবে বলিউডকে

এ যেন চোর-পুলিশ খেলা। অনেকবার লুকোচুরি খেলেও আর রেহাই পেলেন না অনুব্রত মন্ডল। রাখিপূর্ণিমার দিনেই গ্রেফতার দিদির প্রিয় কেষ্ট। ১০ বার তলবে হাজিরায় একবার সাড়া বীরভূমের তৃণমূল সভাপতি অনুব্রত মন্ডলের। ১০ অগাস্টও হাজিরা এড়ান। অগত্যা লক্ষ্মীবারে কেষ্টর দুয়ারে সিবিআই। বাড়ি থেকে সোজা কেন্দ্রীয় সংস্থার জালে 'বাহুবলী’। ভাগ্যের উত্থানপতন কাকে বলে, অনুব্রতকে না দেখলে টের পাওয়া যায় না। এই অনুব্রত মন্ডল, যাঁর নির্দেশে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খায়, সেই বেতাজ বাদশা আজ সিবিআইয়ের জালে। তবে অনুব্রত রাতারাতি এভাবে বাদশা হয়ে ওঠেননি। ছিলেন সামান্য মুদি দোকানের মালিক। মাছও বিক্রি করেছেন একসময়। তাঁর উত্থানের বাঁকে বাঁকে রয়েছে চমক।

অনুব্রতর উত্থান

পশ্চিমবঙ্গের বুকে তৃণমূল নেতাদের মধ্যে সর্বদা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন বীরভূমের তৃণমূলের জেলা সভাপতি অনুব্রত মন্ডল। কখনও 'খেলা হবে', আবার কখনও 'ভয়ংকর খেলা হবে’- ইত্যাদি হুঙ্কার দিয়ে সর্বদা থেকেছেন খবরের শিরোনামে। এমনকী, বীরভূম জেলার অনেকের মতে, তিনি এতটাই প্রভাবশালী যে, তাঁর কথায় বাঘে-গরুতে একঘাটে জল খায়। রাজনীতিতে বিতর্কিত ব্যক্তি অনুব্রতর উত্থান যেন এক সিনেমার চিত্রনাট্য।

প্রচারমঞ্চ থেকে সংবাদমাধ্যমে সামনে থাকা দোর্দণ্ডপ্রতাপ এই নেতার কাহিনি শুনলে যে-কোনও সাধারণ মানুষের চোখ কপালে উঠবে। জানা যায়, রাজনীতিতে প্রবেশের আগে বাবার মুদির দোকানে কাজ করতেন। ফলে প্রশ্ন উঠতে পারে, এই অবস্থা থেকে কী করে উত্থান? বীরভূমবাসীর কথায়, অষ্টম শ্রেণি পাস করে তিনি তাঁর বাবার মুদির দোকানে কাজ শুরু করেন। তবে রাজনৈতিক প্রতিভা থাকার জন্য তাঁর উঠতে বেশি সময় লাগেনি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অসুস্থতাকে হাতিয়ার করে আর কতদিন? সুতোয় ঝুলছে মমতার প্রিয় কেষ্টর ভবিষ্যৎ

তাহলে অসুস্থতাকে কি হাতিয়ার করছেন অনুব্রত মন্ডল? শারীরিক সমস্যা যতটা রয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি দেখিয়ে বারবার হাজিরা এড়িয়ে যাচ্ছেন কেষ্ট?

প্রথম জীবনে অনুব্রত কংগ্রেস করলেও পরবর্তীকালে এই এলাকায় সদ্যপ্রয়াত চিকিৎসক সুশোভন বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল ছেড়ে চলে গেলে, আসেন কেষ্ট। এরপরই বীরভূমের জেলা সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। জেলা সভাপতি হিসেবে কাজ করতে করতে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহের পাত্র হয়ে ওঠেন। ফলে এরপর তাঁকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। রাজনৈতিক প্রাঙ্গণে প্রবেশ করার পর কখনও 'খেলা হবে’, আবার কখনও 'চড়াম চড়াম ঢাক বাজবে’ ইত্যাদি বলে শিরোনামে থেকেছেন। এই নেতার নিজের শরীরের অবস্থাও ভালো নয়। বিভিন্ন রোগের পাশাপাশি অক্সিজেন নিতে অসুবিধে হয়। কিন্তু এরপরেও রাজ্যের বুকে নিজের প্রভাব খাটিয়ে চলেছেন।

নিচুপট্টিতে ছোট ঘর থেকে নীল প্রসাদোপম বাড়ি। ২০১১-র পর বাংলার রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য নাম অনুব্রত। বলা যেতে পারে, লালমাটির ভোট ফ্যাক্টর তিনি। তাই অল্পদিনেই হয়ে উঠেছেন দিদির প্রিয় ভাই। 'চড়াম চড়াম ঢাকের বোল’ থেকে `গুড়-বাতাসা’- অনুব্রতর বোলবচন বারবার এসেছে নির্বাচনের শিরোনামে।

অনুব্রতর পতন

পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে জেরবার তৃণমূল। তাঁকে ঝেড়ে ফেলেও দায় এড়াতে পারছে না দল। এই অবস্থায় দ্বিতীয় উইকেটের পতন। এবার সিবিআইয়ের কোপ অনুব্রতর মতো দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতার ঘাড়ে। তৃণমূলের যে শিরে সংক্রান্তি দশা, তা বলাই বাহুল্য। সেই সঙ্গে এতদিন সযত্নে কেষ্ট যে রাজনৈতিক কেরিয়ার লালন করেছিলেন, সেই গ্রাফ একলাফে নেমে গেল সাপে ভর করে। এর শেষ কোথায় কে জানে?

গরু পাচার মামলায় সিবিআইয়ের হাতে গ্রেফতার অনুব্রত মণ্ডল। অনেক লুকোচুরির পর অবশেষে তিনি গ্রেফতার। আরও এক হেভিওয়েট নেতা এজেন্সির জালে। গরু পাচার মামলায় তৎপর সিবিআই। ১০ অগাস্ট হাজিরা এড়ানোর পর এদিন সকালে আদালতের নির্দেশনামা ও মেডিক্যাল রিপোর্ট নিয়ে বোলপুরের নিচুপট্টিতে বীরভূমের জেলা সভাপতির বাড়িতে পৌঁছে যান সিবিআই অফিসাররা। অনুব্রতর বাড়ি ঘিরে ফেলে কেন্দ্রীয় বাহিনী। বাড়িতে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন সিবিআই আধিকারিকরা। বাড়ির সকলের মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয়।

গরু পাচার মামলায় অনুব্রত মন্ডলের বাড়িতে সিবিআই হানার খবর পেয়ে বীরভূমের তৃণমূল জেলা সভাপতির বাড়ির সামনে ভিড় জমান এলাকাবাসী। প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, আজই কি গ্রেফতার? অবশেষে তাই হলো।

গরু পাচার মামলায় এর আগে বেশ কয়েকবার তাঁকে শমন পাঠায় সিবিআই। যদিও এর মধ্যে বেশিরভাগ সময়ই তিনি অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে হাজিরা এড়িয়েছেন। তবে একবার তিনি কলকাতায় এসে সিবিআইয়ের জেরার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সূত্র মারফত জানা গেছে, গরু পাচার মামলায় এবার দিন কয়েক আগে চালানো তল্লাশিতে মেলা লক্ষ লক্ষ টাকা, হার্ড ডিস্ক, পেনড্রাইভ, ফোন ও নথি খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। সেগুলি খতিয়ে দেখে বেশ কিছু তথ্য হাতে এসেছে তাঁদের। এবার সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৃণমূল জেলা সভাপতিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

এখন প্রশ্ন হলো, অনুব্রতর কেরিয়ার কোন তরীতে গিয়ে ভিড়বে? পার্থর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তাঁর গ্রেফতার এবং তাঁর ঘনিষ্ঠর বাড়ি থেকে পাহাড়প্রমাণ টাকা উদ্ধার হওয়ায়, সেই গলার কাঁটা আর বেশিক্ষণ আটকে থাকতে দেননি অভিষেকরা। পার্থকে উগরে দিয়ে তৃণমূল নিস্তার পাওয়ার চেষ্টা করে। বলাই বাহুল্য, আদতে এই দায় ঝেড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি। তার ওপর আরও এক উইকেটের পতন। যদি পার্থর মতো কেস এক্ষেত্রে না ঘটে, তাহলেও কি দলে তাঁর প্রতাপ একই থাকবে, না কি কেষ্টর দাপট কমবে? সেটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন। সেই সঙ্গে এই প্রশ্নও মাথাচাড়া দিচ্ছে যে, তৃণমূলে একের পর এক দাপুটে নেতাকে ছেঁটে ফেলা হলে, দল কি ডানা-ছাঁটা মৃত পাখিতে পরিণত হবে না? এরপর দলের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? সরকার বদলায়, কেন বদলায় না মন?

Rabindranath Tagore Targeted in Bangladesh: বাংলাদেশে বারবার কেন নিশানা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? হাসিনা থেকে ইউনূস, সরকার বদলালেও কেন থামছে না তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার চেষ্টা? জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টাকেই কেন বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হচ্ছে?

যন্তর মন্তরে ঢুকে বিক্ষোভ, পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে সিজেপি-র দুই নেতা

Jantar Mantar protest: যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের জেরে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠাল আদালত। নির্বাচন কমিশন, এসআইআর এবং প্রতিবাদের অধিকার ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক।

দিল্লিতে মহিলা বিক্ষোভকারীদের হেনস্থার অভিযোগ, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উঠছে যে সব প্রশ্ন

Delhi protest: দিল্লিতে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে মহিলা আন্দোলনকারীদের একাংশ পুলিশের বিরুদ্ধে হেনস্থা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।

২৩ দিনের অনশন থেকে জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন, রাজপথই নেহা বোরার হয়ে ওঠার সাক্ষী

Neha Bora: ২৩ দিন ধরে অনশন করে যেমন তিনি সংবাদমাধ্যমের নজরে এসেছিলেন, তেমনই সম্প্রতি দিল্লির রাজপথে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও তাঁকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।