ফেসবুক অ্যাকাউন্টই বলে দেয় কেমন মানুষ ছিলেন অভিষেক

পরিবার নিয়ে ঘুরতে ভালোবাসতেন। মেয়ের সঙ্গে খেলছেন, ক্রিসমাস কাটাচ্ছেন হৈ হৈ করে। দেখে চেনার উপায় নেই তিনি এককালীন স্টার অভিষেক চট্টোপাধ্যায়

Sindhu Som
৪ মিনিট
ফেসবুক অ্যাকাউন্টই বলে দেয় কেমন মানুষ ছিলেন অভিষেক

পিছনে পাহাড়। একটা ডাকবাংলোর সামনে এক চিলতে বারান্দা। টি-টেবিল, চেয়ার এলোমেলো। স্ত্রীকে কোমরে জড়িয়ে হালকা ভর দিয়ে রয়েছেন অভিষেক। গায়ে সাদা গেঞ্জির ওপর কালো জ্যাকেট, জিন্স। হাতে ব্যাগ। তখন দুজনেরই অল্প বয়স। রঙিন দিন। পাহাড়ি ব্যালকনির সেই দাম্পত্য মনে করছিলেন অভিষেক। খুব বেশিদিন না। এই তো, গত ১৪ ফেব্রুয়ারি। স্ত্রীকে ভ্যালেনটাইনস্‌ ডের শুভেচ্ছা জানাচ্ছিলেন। তাতে ষোল হাজার রিয়্যাকশন। সোশ্যাল মিডিয়ার জমানায় নিজের পেজে অভিষেকের অনুগামীর সংখ্যাটা নেহাত কম না। প্রায় ৫ লক্ষ ৭৫ হাজার। এই ছবিতে নস্টালজিক হয়ে পড়া যাবতীয় ভক্তদের কেউই তখনও জানেন না, মাত্র মাস দেড়েকের মাথায় এ ছবি কেবল স্মারক হয়ে থেকে যাবে। সমস্ত ছবিই স্মারক, তবে ছবির মানুষটি বেঁচে থাকতে তা জীবন্ত স্মৃতিও। কিন্তু সেই স্মৃতির যোগসূত্র ছিন্ন হলে, ছবির মানুষটি ‘নেই’ হয়ে গেলে স্মারক একাকীত্বে ভোগে। গত বুধবার রাতে মারা গিয়েছেন অভিষেক চট্টোপাধ্যায়। ফেসবুক পেজটি তাঁর অমলিন রয়ে গিয়েছে।

ভার্চুয়াল জগত আবিষ্কারের ঠিক বেঠিকের হিসেব না হয় অন্য দিনের জন্য তোলা থাক। তবে সেখানে জীবন বাস্তব জীবনের চেয়ে দীর্ঘতর, অন্তত কয়েকটি দিনের জন্য হলেও, এ কথা সবাই স্বীকার করবেন। আমাদের বাস্তবটা ঠিক যতটা পোড়া মাজা, বঞ্চনায় একঘেয়ে, সেখান থেকে ক্ষণিক হলেও রঙিন একটা প্রতিশ্রুতি দিতে ভার্চুয়াল জগত সক্ষম। স্বপ্নপূরণের ব্যাপার স্যাপার। তাই ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামে ছবি, ভিডিওর মাধ্যমে পোস্ট করা নানা বাস্তব জীবনের মুহূর্ত বাস্তব বিচ্ছিন্ন ভাবে এক স্বতন্ত্র ভার্চুয়াল জীবন স্রোত তৈরি করে। তা থেকে মানুষটা সম্বন্ধে খানিকটা যেমন ধারণা করা যায়, আবার খানিকটা নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলাও যায়, উপস্থাপন করা যায়। ঠিক গান নয়, যেন গানের একটা রেশ। মিউজিক থেকে ফিল্টার, এফেক্ট–নানা সিনেমাটিক উপায়ে সাজানো এক যাপন। কেমন ছিলেন সেই ভার্চুয়ালের অভিষেক? আসুন, দেখে নিই এক ঝলক।

অভিষেকের শেষ আপলোড করা ছবিটি পিকনিকের। দিন পাঁচেক আগে ছবিটি পোস্ট করেন অভিনেতা। পরনে ট্রাউজার্স। প্যান্ডেলের মধ্যে টেবিল সাজানো। তারই একটির সামনে বসে ‘সুপ্রভাত’ জানাচ্ছেন সবাইকে। এছাড়া রয়েছে দোলের ছবি। মেয়ে পিচকারি হাতে প্রচুর রঙ মেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে–এমনটাই দেখা যাচ্ছে। কোনও পোস্টে মেয়ের চুল সযত্নে আঁচড়িয়ে দিচ্ছেন এক পিতা। আবার কোনও পোস্টে স্বামী স্ত্রী সাঁইবাবার মূর্তি ছুঁইয়ে প্রণাম করছেন। এ ধরনের ছোটবড় নানা পারিবারিক, ব্যক্তিগত হাসিকান্নার মুহূর্ত উঠে আসছে টাইমলাইনে। মেয়ের প্রতি স্নেহ উপচে পড়ছে সমস্ত পেজ জুড়েই। পারিবারিক প্রশান্তি ফুটছে। প্রায়শই শিবপূজা, সাঁই প্রণাম, সরস্বতীপূজা ইত্যাদি নানা ধর্মীয় পরিমণ্ডলে দেখা যাচ্ছে তাঁকে। এবং আধ্যাত্মিক পথে হাঁটতে ভালোবাসতেন বোঝাই যায়। কখনও নিজে সিন্নিভোগ তৈরি করে দিচ্ছেন ঠাকুরের। আবার কোথাও স্ত্রী মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাহুবন্ধনে ছবি তুলছেন। পরিবারকে তাঁর জীবনে আশীর্বাদ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

কখনও পাহাড়ে, কখনও সমুদ্রে, কখনও সুন্দর রিসর্টে বেড়াতে যাওয়ার ছবি পেজে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থান। পরিবার নিয়ে ঘুরতে ভালোবাসতেন। মেয়ের সঙ্গে খেলছেন, ক্রিসমাস কাটাচ্ছেন হৈ হৈ করে। দেখে চেনার উপায় নেই তিনি এককালীন স্টার অভিষেক চট্টোপাধ্যায়। খুবই অনাড়ম্বর জীবন ছিল তাঁর। তবে একঘেয়ে নয়। সবার সঙ্গে ফূর্তি করে জীবন কাটাতে পছন্দ করতেন। আর ভালোবাসতেন অনুগামীদের কাছে অতীত তুলে ধরতে। কিছু মুহূর্ত, ফটো–সেই কম বয়সের। সেই ক্ষণিক স্টারডমের। সব মিলিয়ে সম্পূর্ণ পারিবারিক একজন মানুষ।

তবে সেটুকুই নয়। এর পাশাপাশি পেজে নিজের কাজের প্রোমোশনও করতেন তিনি। তবে কচ্চিৎ কদাচিৎ। মূলত তাঁকে দেখা যেত শ্যুটের বিভিন্ন মুহূর্তে।

স্ক্রিপ্ট দেখছেন। কখনও খড়-কুটোর সেট। কখনও মোহরের সেট। সিরিয়ালের বাকি লোকজনও রয়েছেন আশেপাশে। কখনও পোজ দিচ্ছেন, কখনও ক্যান্ডিড। কখনও ‘স্লিপারসেল’ বলে একটি ওয়েব সিরিজের প্রোমো ভিডিও করতে দেখা যাচ্ছে তাঁকে। তবে একদম ঘরোয়া সজ্জায়। কোনও বিশেষ ‘বিজ্ঞাপিত বিজ্ঞাপিত’ গন্ধ নেই। একজন সাধারণ মানুষ যেন তাঁর কাজ সম্বন্ধে আর পাঁচটা মানুষকে জানাচ্ছেন। শেষের কয়েকটি ভিডিও পোস্টে তাঁকে দেখা যাচ্ছে মোহরের ক্রিউয়ের সঙ্গে নাচ করতে, তুমুল আনন্দ করে পিকনিক করতে।

কখনও মাইক হাতে নিয়ে গাইছেন সেই জনপ্রিয় গান–”দরজা খুইল্যা”। তাতে হাততালি পড়ছে মুহুর্মুহু। ‘গীত সঙ্গীত’ অভিষেকের কেরিয়ারের অন্যতম হিট ছবি। সেই ছবিরই আরেকটি গান অন্যদের অনুরোধে গাইতে দেখা যাচ্ছে তাঁকে, “যখন রাত্রি নিঝুম’। বোঝা যাচ্ছে সহ-অভিনেতারাও তাঁর পরিবারেরই অংশ। তাই নিজের অতীত যাপন আবার। নিজের খ্যাতি অকালে হারানোর যে দগদগে ঘা অভিষেকের মনে ছিল, তা যে মৃত্যুর দিন কতক আগেও তাজা বোঝা যায় এই অতীতচারণের প্রবণতায়। সেই সোনালি দিন বারবার সংজ্ঞানে নির্জ্ঞানে যেন ফিরে ফিরে আসছে তাঁর সমস্ত পেজ জুড়ে। আর সমস্ত পেজটাই পারিবারিক পোস্টে ভরা। কোথাও ব্যক্তিজীবন আর কর্মজীবন একাকার হয়ে যায় তাঁর এই ভার্চুয়াল নির্মাণে। আমাদের চোখ নেই। আমরা দেখতে শিখিনি। কত মানুষ কত রকম ভাবে নিজের জীবনকে নির্মাণ করছেন ফেসবুকে। তার রঙিন, রঙচঙে দিকটাই আমাদের চোখ টানে বেশি। খুব বেশি হলে হয়তো বিনয়টুকু। “এত বড় একজন অভিনেতা কত সাধারণভাবে বাঁচছেন দেখ!” হয়তো বলে থাকি অন্যকে। কিন্তু যেমন নির্মাণই হোক, বিষাদ, একাকীত্বের জখম, রক্ত আটকানো যায় না। একটু ভালো করে খেয়াল করলে সমস্ত মানুষেরই একের পর এক পোস্টে এক একটা বিশেষ প্যাটার্ন দেখা। অবধারিত অমোঘ এক ছন্দ। সেই ছন্দের ভাঁজ টুকু দিয়ে একাকীত্ব চুঁইয়ে আসে। রোজ, হরদম। আমরাই পড়তে পারি না।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।