বিপ্লব আর প্রেম রূপকথা নয়! রূপ-যৌনতার ঊর্ধ্বে 'রক্তকরবী'-র ভালবাসা

Red Oleandars: রঞ্জন আর নন্দিনী তো পরস্পর পরস্পরের রূপতরাসী যৌনশ্রমিক নয়।

Biswajit Ray
৪ মিনিট
বিপ্লব আর প্রেম রূপকথা নয়! রূপ-যৌনতার ঊর্ধ্বে 'রক্তকরবী'-র ভালবাসা

গ্রামের ধারে বন। বনের লাগোয়া নদী। নদীতে নৌকো বাওয়ার প্রতিযোগিতা হয়। ছেলেরা একটি মেয়েকে জয় করার জন্য সেই নৌকা বাওয়ার প্রতিযোগিতায় দেখায় তাদের কৃৎকৌশল। যে মেয়েটিকে ঘিরে তাদের এই স্বাভাবিক উৎসাহ, সেই মেয়েটির নাম নন্দিনী। ছেলেরা তো অনেকে, তাদের মধ্যে দু'জনের নাম আমরা জানি– একজন রঞ্জন, অন্যজন বিশু। শেষ অবধি নন্দিনীর পাল্লা রঞ্জনের দিকেই ঝুঁকল।

তখন বিশু কী করল?

প্রেমে প্রাপ্য বস্তুর অপ্রাপ্তিতে পুরুষ বা নারীরা সচরাচর কী করে?

দু'টি বিকল্প প্রকট হয়। হতাশায় ডুবে যাওয়া কিংবা অপর কাউকে বিয়ে করে প্রত্যাখ্যানের বেদনা ভোলার চেষ্টা- এই তো পরিচিত দু'টি উপায়। এই দুই আসলে প্রত্যাশার অপ্রাপ্তিতে এবং প্রত্যাশিত বস্তুকে কেবল 'আমার, আমার, আমার' ভাবার ফলে ঘটে। বিশু দেবদাসের মতো হতাশায় ডুবে মাতাল হয়ে পড়ল না, তবে বিয়ে করল। যাকে বিয়ে করল, তার বস্তুপ্রপঞ্চর ওপর বড় লোভ– বিয়ে তার কাছে প্রেম-ভালবাসার ফল নয়, বিয়ে তার কাছে ‘চাই-চাই-এর’ সামাজিক, স্বীকৃত উপায়। বিশু চাকরি নিল খনি-শহরের প্রশাসনে। সেই চাকরি আড়ি পাতার, নজরদারির। রাজনীতির ভাষায় বললে, সে খোচড়। আর রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ভাষায় বললে গুপ্তচর। এতে টাকা আছে, কিন্তু আত্মসম্মান নেই, নৈতিকতাও নেই। তাই আত্মগ্লানিতে ভুগে বিশু চাকরি দিল ছেড়ে। তার বউয়ের বস্তুপ্রাপ্তিতে টান পড়ল। বর রোজগেরে নয় তেমন, বউটি বিদায় নিল। তখন বিশু একা, চাকরি নেই– খনি শহরে নিরুপায় থেকে যাওয়া আছে।

সেই খনিশহরে এল নন্দিনী, আলাদাভাবে ঢুকল রঞ্জন। খনি শহরের অর্থনীতিকে তারা বিপর্যস্ত করে দিতে বদ্ধপরিকর। তাদের মধ্যে রয়েছে ভালবাসার টান– সেই টান রূপ-যৌনতার মাত্র নয়, সেই টান কর্মনীতির রূপায়ণের জন্য হাতে-হাত কাঁধে-কাঁধ রেখে লড়াইয়ের মানসিকতা থেকে জেগে ওঠে। প্রেম ও বিবাহ যেখানে কেবল রূপ-যৌনতার খেলা, সেখানে একসময় দম বন্ধ হয়ে যায়, অধিকারের, অধিকারের, অধিকারের প্রমত্ততা গ্রাস করে। তখন একই চাকায় পাক খাচ্ছে দু'জন– কিছুতেই চাইলেও বাইরে আসতে পারে না। ঠিক যেমন বাইরে আসতে পারে না সোনালোভী ওভারটাইম খাটা শ্রমিকরা, ঠিক তেমন বাইরে আসতে পারে না রূপলোভী প্রেমে কিংবা দাম্পত্যে আবদ্ধ যৌনশ্রমিকেরা।

রঞ্জন আর নন্দিনী তো পরস্পর পরস্পরের রূপতরাসী যৌনশ্রমিক নয়।

তারা তাই বাইরে আসে– ছড়িয়ে দেয় পারস্পরিক ভালবাসা, বৃহৎ কর্মপথে। রঞ্জন আর নন্দিনী একসঙ্গে হলেই বিপদ। তাদের মিলতে দিলে মনের আনন্দে পরস্পর-পরস্পরকে পেয়ে বিপ্লবাত্মক চিন্তা ছড়িয়ে দেবে খনি-শ্রমিকদের মধ্যে। তখন শ্রমিকরা আর কলুর বলদের মতো ওভারটাইমের চাকায় ঘুরবে না। তারা বলবে, টাকার জন্য বাঁচা নয়, বাঁচার জন্য টাকা। টাকা কত আর লাগে?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'প্রেম অতি হাস‍্যকর বস্তু', কেন এমনটা মনে করতেন রাজশেখর বসু

Rajsekhar Basu: রাজশেখর বসুর প্রেমের গল্পে নানা-কৌশলে পুরনো ভারতের প্রসঙ্গ উঠে আসে।

তার থেকে ঢের বেশি ভাল লাগে প্রয়োজনীয় উপার্জনের বাইরে বেঁচে থাকা সময়ে নিজের মতো থাকতে ও ভাবতে। একথা বললে খনি-শহরের লাভ কমে যাবে। তাই এজাতীয় কথা শেখায় যারা, সেই রঞ্জন-নন্দিনীকে আলাদা করে দাও– আঘাত করো। রঞ্জন খুন হলো। নন্দিনীকে বলাৎকারের পরিকল্পনা পাকা। তবে তা রূপায়িত করা গেল না।

নন্দিনীর একজন বিশু ছিল। রঞ্জনের কাছে হেরে যাওয়া, ঘা-খাওয়া বিশুর তখন বদল হয়েছে। সে জানে, নন্দিনী তার জমি-জিরেত নয়, অধিকারের ক্ষেত্র নয়– বস্তুত কারওরই জমি জিরেত নয় নন্দিনী, রঞ্জন বা বিশু। একসময় নন্দিনীকে না পেয়ে, ক্ষিপ্ত পৌরুষের অধিকারবোধ তৃপ্ত করতে চরের চাকরি নিয়েছিল বিশু। দাও-দাও-দাও বিবাহের সমাজ-স্বীকৃত জোয়ালে কলুর বলদের মতো ঢুকে পড়েছিল। এখন সেই অবস্থা ও অবস্থান থেকে দূরে এসেছে সে। বুঝেছে ভালবাসার নানা রূপ। নন্দিনীর সঙ্গে কর্মপথে এগিয়ে যাওয়াও তো ভালবাসাই। সে আর রঞ্জন, সে আর নন্দিনী কর্মপথে পারে মিলে যেতে। ঈর্ষার, অধিকারের, লড়াইয়ের, প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে সম্প্রসারিত হতেই পারে নানারূপী ভালবাসা।

ভালবাসা কি এক? তার যে নানা রূপ।

এক মানুষের জীবনেও কি একরকম থাকে ভালবাসার বোধ? সে বোধেরও তো রূপান্তর হয়।

ভালবাসা অভিযাত্রা, অভিযাত্রা বিপ্লবও।

যখন বিপ্লব পার্টি হয়ে যায় কিংবা বিপ্লব সংজ্ঞায়িত হয় একমাত্রায়, তখন বিপ্লব ভালবাসাকে ভয় পায়। ভালবাসার মধ্যে থাকে দুর্দান্ত এক চলার শক্তি। বিপ্লব যেমন প্রতি মুহূর্তে প্রশ্নশীল, তেমনই ভালবাসাও। একটা রূপে স্থির থাকে না সে। প্রশ্ন করতে করতে এগোয়। বিপ্লবের ঘর হয় না, ভালবাসারও কি হয়?

রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকটিকে রূপক বলে ভাবতে ইচ্ছে করে না, রবীন্দ্রনাথও রূপক বলে ভাবতেন না। তাঁর মতে এ-নাটক সত্যমূলক। সত্য তো গাছের আম নয়। যেমন গাছের আম নয় বিপ্লব, যেমন গাছের আম নয় ভালবাসা। সত্য, ভালবাসা, বিপ্লব গাছের আমের মতো টুপ করে নিশ্চিন্ত কোলের ওপর খসে পড়ে না। তাকে প্রতি মুহূর্তে অর্জন করতে হয়– চলায়, উপলব্ধিতে। তা স্থির নয়। চলমান। আগে যা ভাবছি, তাতেই যে সে আটকে থাকবে- এমন তো নয়।

রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকে তাই নন্দিনী, রঞ্জন, বিশু তিনজনেই চলেছে– ঘরে তো কেউ আটকে থাকেনি, চলার মানে চেয়েছে বুঝতে। রবীন্দ্রনাথ মিলনের নিশ্চিন্ততা তাদের দেননি– ভালবাসার কায়েমি নিশ্চিন্ততার চেয়ে তাঁর কাছে অনেক বড় না-পাওয়ার বেদনা। এই বেদনা গড়ে। যেমন গড়ে বিপ্লবের পথ। বিপ্লবের ঘর হয় না।

যে কবিরা বিপ্লবের, যে কবিরা প্রেমের, তারা কেউ দলের হতে পারে না– যে কবিরা দলের, দলের এবং দলের তারা কি প্রেমের কি‌ংবা বিপ্লবের হতে পারে?

বিশুর কী হলো? নন্দিনীর? এই নাটকের শেষ একটা লড়াইয়ের খবর পাই, ফলাফল জানি না।

ফলাফল সুস্থির নয়, ফলাফল বদলায়। আজ একরকম, কাল আরেকরকম– ফলাফলের জন্য প্রতিনিয়ত সচেতনতা জরুরি। ফলাফলের সুস্থির রূপকথা হয় না, রূপকথায় তারপর চিরকাল তারা সুখে বসবাস করতে পারে– সেই চিরকালীন অধিকরণ স্বর্গের মিথ্যা স্বপ্ন।

বিপ্লব আর প্রেম রূপকথা নয়।

সত্য কি রূপকথা হতে পারে?

রূপকথার দিকে, রূপকথার জন্যই সত্য, প্রেম, বিপ্লবের যাত্রা– যাত্রা কিন্তু থামে না। সত্য চলে– প্রেম ও বিপ্লবও, কেউই রূপকথায় পৌঁছয় না।

লিখেছেন
Biswajit Ray
Biswajit Ray
6 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।