ঝিমিয়ে পড়া বামেদের চাঙ্গা করছেন মহম্মদ সেলিম?

Gautam Roy
৪ মিনিট
ঝিমিয়ে পড়া বামেদের চাঙ্গা করছেন মহম্মদ সেলিম?

২০১১ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে বিরোধী রাজনীতির শীর্ষবিন্দুতে থাকার জায়গাটাও যেন ক্রমশ নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছিল বামপন্থীদের কাছে। প্রথাগত বিরোধিতার ঘূর্ণিপাকেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছিল পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রাজনীতি।

দীর্ঘ ৩৪ বছর শাসনক্ষমতায় থাকার পর, হঠাৎ করে শাসন ক্ষমতার বাইরে বেরিয়ে এসে, শাসকের গঠনতান্ত্রিক বিরোধিতা করে, কীভাবে বিরোধী রাজনীতিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হয়– তা বামপন্থীরা নির্ধারণ করে উঠতে পারছিল না। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় উঠে এল বিজেপির সঙ্গে বামেদের পরোক্ষ অাঁতাঁতের তত্ত্ব। বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের অত্যাচারে বাম কর্মীরা সাম্প্রদায়িক শিবিরের দিকে ছুটতে শুরু করেছিল। অন্যদিকে, নিজেদের দলের সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের শাসকের রোষানল থেকে বাঁচানোর ক্ষেত্রে যে সদা-সতর্ক সাংগঠনিক ভূমিকা বাম নেতাদের নেওয়া দরকার ছিল, তা তাঁরা নিতে পারেননি।

আর এর মাঝে বিরোধী দলের শূন্যস্থান দখল করতে বিজেপি উঠে-পড়ে লাগে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রধান বিরোধী হিসেবে উঠে আসার জন্য বিজেপির আপ্রাণ চেষ্টা এবং সংবাদমাধ্যমের একাংশের সেই প্রচেষ্টার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন, এ-রাজ্যের বিরোধী রাজনীতির পরিসরকে বিভ্রান্ত করে দেয়। যার ফলে শাসকের আচরণও বেলাগাম হয়ে উঠতে শুরু করেছে। এইরকম একটা সময়ে বামপন্থী রাজনীতির নেতৃত্বে অতি-সম্প্রতি যে অদল-বদল ঘটেছে, তা প্রাসঙ্গিক। সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মহম্মদ সেলিম। তার অব্যবহিত পরেই, তাঁর প্রথম সাংবাদিক সম্মেলন হোক বা বগটুই বা অন্যত্র বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড– তা সমগ্র বামপন্থী-প্রগতিশীল পরিসরেই এক ভিন্ন মাত্রা তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে।

মহম্মদ সেলিম সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর একাংশের সাংবাদিকরা তাঁকে ঘিরে যে-ধরনের সাম্প্রদায়িক কৌণিক বিন্দু রচনা চেষ্টা করেছিলেন, তার মোকাবিলায় যে-রকম সোজাসাপটা উত্তর প্রথম দিনেই সেলিম দিয়েছেন সাংবাদিক সম্মেলনে, তাতেই বুঝতে পারা গিয়েছিল, বিরুদ্ধ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া নয়, যুক্তি দিয়ে, তর্কের মাধ্যমে প্রশ্নের মোকাবিলার মাধ্যমেই এই সময়ের রাজনীতিতে মহম্মদ সেলিম একজন ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব হিসেবে আরও সুস্পষ্টভাবে নিজের অবস্থানকে চিহ্নিত করবেন। রাজ্য সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন– ‘যারা আমাদের ঘুম কেড়েছে, আমরা তাদের নিশ্চিন্তে ঘুমোতে দেব না।’ তাঁর এই প্রকাশ্য ঘোষণা নিঃসন্দেহে ঝিমিয়ে পড়া বামপন্থী রাজনীতির ক্ষেত্রে একটা বড় রকমের মহৌষধ হিসেবে কাজ করতে শুরু করেছে।

বস্তুত, ২০১১ সালে ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে, আমরা দেখতে পাচ্ছি, অনেকটা বুর্জোয়া রাজনীতির আদলে বামপন্থীদের ভেতরে কখনও প্রকাশ্যে, কখনও আড়ালে, পরস্পরকে দোষারোপের বিষয়টা খুব বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। আর সেক্ষেত্রে গোষ্ঠীগত সংকীর্ণতা বামপন্থী রাজনীতির বৃহত্তর পরিসর ক্রমশ সংকুচিত করছে। ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছিল, যেনতেন প্রকারে ক্ষমতা বামপন্থীদের চাই। এটা প্রমাণ করতেই বামপন্থী নেতৃত্ব যেভাবে পরপর দু’টি বিধানসভা নির্বাচনে (২০১৬, ২০২১) কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে নির্বাচনী সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তা কোনও সাফল্য এনে দিতে তো পারেইনি, বরং বৃহত্তর বাম ঐক্যের পরিসর থেকে বামফ্রন্টকে বিচ্ছিন্ন করেছে।

মহম্মদ সেলিম সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করার অল্প কিছুদিন আগেই এনআরসি-র বিরুদ্ধে আন্দোলনরত, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র আনিস খান নিহত হয়েছিলেন। এই ঘটনাকে ঘিরে ক্রমশ বাংলা উত্তাল হতে শুরু করে। আনিস খান কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক– তাই নিয়ে শাসক-বিরোধীদের মধ্যে চাপানউতোর শুরু হয়ে যায়। এসএফআই এবং আইএসএফ দাবি করেছিল, আনিস তাদের সংগঠনের লোক। আবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি বলেন, আনিস তৃণমূল কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ ছিল। এইরকম একটি পরিস্থিতিতে সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণের অল্প কয়েকদিনের ভেতরেই সেলিম আনিসের বাড়িতে ছুটে যান। সেখানে তিনি খুব স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আনিস কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক ছিলেন, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল, আনিস এনআরসি-র বিরুদ্ধে আন্দোলনরত এক নাগরিক। মহম্মদ সেলিমের কাছে জরুরি হয়ে ওঠে, ভারতের নাগরিকদের একটা বড় অংশকে বে-নাগরিক করে দেওয়ার চক্রান্তের বিরুদ্ধে যে-লড়াই, সেই লড়াইয়ের একজন সংগ্রামী যোদ্ধা ছিলেন আনিস। কীভাবে তার সঙ্গেও আন্দোলনের বিষয়ে পরামর্শ করত আনিস, সেকথাও বলেছিলেন তিনি। ‘আমাদের লড়াইটা কিন্তু আনিস হত্যার বিচারের জন্য,’– একথা বলে আনিসের সমাধি-ভূমিতে গিয়ে পুষ্পার্ঘ অর্পণের পর, কবরের মাটি তুলে তিনি প্রতিজ্ঞা করেন; আনিস হত্যার বিচার আদায় করে ছাড়ব।

এই ঘটনাক্রম যখন চলছে, ঠিক তার আগের রাতেই ঘটে গেছে বীরভূমের রামপুরহাটের বগটুই গণহত্যা। আনিসের বাড়ি থেকে সেলিম ছুটে গেলেন বীরভূমে, একদম গেরিলা কায়দায় পুলিশ-প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে তিনি পৌঁছে গেলেন বগটুই গ্রামে। শাসক দলের উপপ্রধান যে ভাদু শেখের হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে কার্যত প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এই গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে, সেই ভাদুর প্রাসাদোপম বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে, যেভাবে, যে শারীরিক ভঙ্গিমায় মহম্মদ সেলিম শাসকের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আঙুল তুললেন– তা নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের বাম রাজনীতির ক্ষেত্রে এক মৃতসঞ্জীবনী সুধা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করল। ইদানীন্তনে যে জঙ্গিপনা একটিবারের জন্য বামপন্থীরা দেখাতে পারেনি, যে জঙ্গিপনা আমরা একদিন বামপন্থীদের ভেতরে দেখেছিলাম, বিরোধী নেতা হিসেবে জ্যোতিবাবু বা গীতা মুখোপাধ্যায় প্রমুখের ভূমিকার ভেতর দিয়ে– তা-ই যেন আমরা আবার দেখতে পেলাম সেলিমের ভূমিকার মধ্য দিয়ে।

এমনটাই যেন রাজ্যের বামপন্থী কর্মী-সমর্থক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ চাইছিল। ঝিমিয়ে পড়া নেতৃত্ব নয়। আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা নিয়ে চলা শাসক বা বিরোধী দল নয়। ঘটনাক্রমের তাৎক্ষণিক অথচ রাজনৈতিকভাবে বুদ্ধিদীপ্ত একটা প্রতিক্রিয়া, প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের সংকল্প। সেলিম প্রাথমিক প্রত্যাশাটা সাধারণ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করতে পেরেছেন রাজ্য সম্পাদকের দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র পনেরো-কুড়ি দিনেই। সেলিমকে এখনও অনেক বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে হবে। বাইরের শত্রুতার সঙ্গে সঙ্গে ‌ঘরের শত্রুতার অনেক পথও তাঁকে পাড়ি দিতে হবে। সে-পথ আদৌ মসৃণ নয়। কিন্তু তিনি যেভাবে ব্যাটিং শুরু করেছেন, আশা করা যায়, খারাপ পিচে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়ে সেঞ্চুরি হাঁকানোর দিকেই তিনি এগিয়ে যাবেন।

লিখেছেন
Gautam Roy
Gautam Roy
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? সরকার বদলায়, কেন বদলায় না মন?

Rabindranath Tagore Targeted in Bangladesh: বাংলাদেশে বারবার কেন নিশানা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? হাসিনা থেকে ইউনূস, সরকার বদলালেও কেন থামছে না তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার চেষ্টা? জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টাকেই কেন বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হচ্ছে?

যন্তর মন্তরে ঢুকে বিক্ষোভ, পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে সিজেপি-র দুই নেতা

Jantar Mantar protest: যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের জেরে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠাল আদালত। নির্বাচন কমিশন, এসআইআর এবং প্রতিবাদের অধিকার ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক।