সরষের মধ্যেই ভূত! কেন মানুষের আস্থা হারাচ্ছে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা?

সংগঠনের মাথায় কে থাকবেন, কোন তদন্ত কোন পথে এগোবে, নেতা-মন্ত্রীরাই সব ঠিক করে দেন বলে অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। বেছে বেছে নির্বাচনের সময় আচমকা শীতঘুম থেকে জেগে ওঠা, পাঁচিল টপকে বিরোধী নেতার বাড়িতে লম্ফঝম্ফ, শাসকের অঙ্গুলিহেলনেই তাদের যাবতীয় নড়নচড়ন বলেও দাবি করেন নিন্দুকেরা। সেই অভিযোগ বরাবর অস্বীকার করে এলেও, এবার কার্যত নিজের ঘরের লোকই নাম ডোবাল কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (CBI) দল বেঁধে চণ্ডীগড়ে এক ব্যবসায়ীর দফতরে ভুয়া তল্লাশি চালানো থেকে তোলাবাবদ ২৫ লক্ষ টাকা দাবি করার অভিযোগ সামনে এসেছে সংস্থার চার আধিকারিকের বিরুদ্ধে। চাকরি থেকে চার জনকে বহিষ্কার করে কোনওরকমে যদিও মুখরক্ষা করেছে সিবিআই, কিন্তু প্রশাসনের অন্দরেই অনেকে বলতে শুরু করেছে যে, নতুন করে নাম ডোবানোর কিছু নেই। এই একটি ঘটনা হয়তো সামনে এল। খবরের শিরোনামে হয়তো জায়গা পায় না এমন কতশত ঘটনা।

 

 

ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভুয়া তল্লাশি চালানো এবং দুর্নীতির অভিযোগে ওই চার অফিসার, সুমিত গুপ্ত, প্রদীপ রানা, অঙ্কুর কুমার এবং আকাশ আলাওয়াতকে গ্রেফতার করেছে সিবিআই। চাকরি থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে সকলকে। সংস্থার তরফে বলা হয়েছে, যত বড় আধিকারিকই হোন না কেন, দুর্নীতি-সহ কোনও অপরাধ কাউকে ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। যদিও বছর তিনেক আগে সিবিআই-এর এই নিরপেক্ষতা চোখে পড়েনি। সেই সময় সিবিআই-এর তদানীন্তন সিবিআই ডিরেক্টর অলোক ভার্মা নিজের অধস্তন হিসেবে, সিবিআই-এর স্পেশ্যাল ডিরেক্টর পদে রাকেশ আস্থানার নিযুক্তিতে আপত্তি তোলেন। স্টার্লিং বায়োটেক নামের একটি সংস্থার বিরুদ্ধে তছরুপের তদন্তে রাকেশ আস্থানার নাম উঠে আসে। তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষবাবদ ৩ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা নেওয়ার অভিযোগ ছিল।

 

 

কিন্তু অলোক ভার্মার আপত্তি খাটেনি। শাসক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে দিব্যি পদে আসীন হয়ে যান তিনি। শুধু তাই নয়, সেকেন্ড ইন কম্যান্ড হওয়া সত্ত্বেও অলোক ভার্মার অনুমতির তোয়াক্কা না করে রাকেশ আস্থানা নিজের মতো করে বৈঠক ডাকা থেকে শুরু করে ডিরেক্টরের কাজকর্মও নিজের হাতে তুলে নেন বলে অভিযোগ সামনে আসে। সেই নিয়ে টানাপোড়েন বেশিদিন চাপা থাকেনি। রাকেশে আস্থানার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রকাশ্যেই সরব হন অলোক ভার্মা। পাল্টা তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন রাকেশ আস্থানাও। সেই নিয়ে সিবিআই-এরঅন্দরেই অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।

 

কিন্তু ১৯৮৪ ব্যাচের গুজরাত ক্যাডারের আইপিএস অফিসার রাকেশ আস্থানা, যিনি অতীতে লালুপ্রসাদ যাদবের বিরুদ্ধে পশুখাদ্য মামলার তদন্ত থেকে ২০০২ সালের গোধরা কাণ্ড, ২০০৮ সালের আমেদাবাদ বিস্ফোরণ কাণ্ড, কংগ্রেস বিশেষ করে অগুস্তা ওয়েস্টল্যান্ড কাণ্ডে গান্ধী পরিবারের ভূমিকার মতো হাই প্রোফাইল মামলার তদন্তভার সামলেছেন, সহজেই অলোক ভার্মার বিরুদ্ধে বাজিমাত করেন। উল্টোদিকে, রাফাল দুর্নীতি নিয়ে তদন্তের দাবি খারিজ না করায় অলোক ভার্মা আগেই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরাগভাজন হয়েছিলেন বলে শোনা যায়। ফলে কোপে পড়তে হয় তাঁকেই। মধ্যরাতে তাঁকে ছুটিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় প্রথমে। আইনি লড়াইয়ে যাহবা জবরদস্তি মাথায় চাপিয়ে দেওয়া সেই ছুটি কাটিয়ে কাজে ফেরেন অলোক বর্মা, দিনেরদিনই তাঁকে বদলি করা হয় দমকলের ডিজি পদে।

 

 

উপায়ান্তর না দেখে তাই আগাম অবসর নেন তিনি। পরে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সরব হন। এমনকী, পেগাসাস স্পাইওয়্যার বসিয়ে তাঁর পাশাপাশি গোটা পরিবারের ফোনে আড়ি পাতার অভিযোগও আনেন। তাতে কাজ হয়নি যদিও। বরং অবসর নেওয়ার পরই তাঁর বিরুদ্ধে রাকেশ আস্থানার তোলা একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে তদম্ত শুরু হয়। শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। অন্য দিকে, অলোক বর্মার নির্দেশে শুরু হওয়া সমস্ত তদন্ত থেকেই নিস্তার পেয়ে যান রাকেশ আস্থানা। বর্তমানে দিল্লি পুলিশের কমিশনার পদে নিযুক্ত তিনি। সংস্থার দুই শীর্ষ আধিকারিকের মধ্যেকার সংঘাত নিরসনেই যেখানে স্বাতন্ত্র্য দেখাতে পারেনি সিবিআই, অন্যত্র তাদের নিরপেক্ষতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

 

শুধুমাত্র অন্তর্দ্বন্দ্ব বা অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি নয়, তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে সিবিআই-এর নিরপেক্ষতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সংশয় বিস্তর। এর মূল কারণ হল প্রশাসন তথা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত শাসকের পক্ষপাতমূলক আচরণ এবং তদন্তকে প্রভাবিত করতে ক্ষমতার অপব্যবহার। বেশ কয়েকটি হাই প্রোফাইল মামলার দিকে দৃষ্টিপাত করলেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সাল থেকে তদন্ত করছে সিবিআই। কিন্তু মূল অভিযুক্ত চিত্রা রামকৃষ্ণেরপরামর্শদাতাসাধু শিরোমণির পরিচয় জানতেই চার বছর কাটিয়ে দেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। ২০২২-এর ফেব্রুয়ারিতে জানা যায়, ওইসাধু' আর কেউ নন, ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জেরই প্রাক্তন মুখ্য কার্যনির্বাহী আনন্দ সুব্রহ্মণ্যম। তদন্তের এই শ্লথ গতি নিয়ে আদালতে তিরস্কৃতও হয় সিবিআই। অভিযুক্তদের অপরাধস্থলে নিয়ে গিয়ে তদন্তে ঝাঁপিয়ে পড়ার বদলে দফতরে বসে গোয়েন্দারা 'হাওয়া খাচ্ছিলেন' বলে কটাক্ষ করে আদালত। কিন্তু বিশেষজ্ঞ মহলের দাবি, সব জেনেও এই নিয়ে এতদিন নীরব ছিল কেন্দ্রীয় সরকার। নর্থ ব্লক থেকে তদন্তের গতি বাড়ানোর ইঙ্গিত না পেয়েই সিবিআই গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু বছরের শুরু থেকে যেভাবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতের বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নিতে শুরু করেছে, তাতে উদ্বিগ্ন হয়েই কেন্দ্রের তরফে তৎপরতা শুরু হয়, আর তাতেই সিবিআই নড়েচড়ে বসে।

 

আইএনএক্স মামলাতেও সিবিআই-এর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতের পুতুল হয়ে কাজ করার অভিযোগ ওঠে। ২০১৭-র ফেব্রুয়ারি মাসে কংগ্রেসের সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বলতে শোনা যায়, ‘জিভ সামলে রাখুন। আপনাদের ঠিকুজি-কুষ্ঠি আমার হাতে রয়েছে।এর একমাস পরই তাঁর উপস্থিতিতে ইজরায়েলে পেগাসাস স্পাইওয়্যার কেনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় বলে অভিযোগ।তার তিন মাস পর ২০১৭-র মে মাসে আইএনএক্স মামলায় দেশের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী তথা বর্ষীযান কংগ্রেস নেতা পি চিদাম্বরমের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে। বিগত কয়েক বছরে এভাবেই সিবিআই, ইডি, এনআইএ, এনসিবি, আয়কর দপ্তরের মতো সংস্থা সরকারের দলদাসে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ। সিবিআই এবং’-র মতো গুপ্তচর সংস্থার প্রধানদের কার কতদিন মেয়াদ হবে, কাকে কখন বরখাস্ত করা হবে, কার মেয়াদ বাড়ানো হবে, রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে বিশেষ অর্ডিন্যান্স পাস করিয়ে সেই ক্ষমতাও নিজের হাতে তুলে নিয়েছে কেন্দ্র।

তাই কেন্দ্রের সরকারের তাঁবেদারি করা ছাডা় সংস্থাগুলিরও উপায় নেই বলে মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে বাংলায় সম্প্রতি একের পর এক মামলা সিবিআই-এর হাতে যাওয়ার পিছনেও সিবিআই-কে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ উঠছে। রাজ্যের তদন্তকারী সংস্থা সিট রিপোর্ট পেশ করার আগেই সিবিআই-এর হাতে কোন যুক্তিতে মামলা তুলে দেওয়া হচ্ছে, সেই নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এক বছরেরও কম সময়ে বাংলার মতো অন্য কোনও রাজ্যে এত মামলা সিবিআই-এর হাতে যায়নি বলে মেনে নিতে শোনা গিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকেও। অথচ বাংলার মাটিতে তাপসী মালিক থেকে সারদা, নারদ, কয়লাকাণ্ড, গরুপাচার কাণ্ডের মতো হেভিওয়েট মামলায় গুটিকয়েক নেতা, তাঁদের শাগরেদকে কিছুদিন জেলবন্দি করে রাখার চেয়ে বেশি কিছু করে দেখাতে পারেনি সিবিআই। স্বাভাবিক গতিতে তদন্ত চলার পরিবর্তে সময়বিশেষে জোয়ার-ভাটার মতো ওঠানামা করেছে। প্রায় দুদশক কাটতে চললেও, আজও বিশ্বভারতী থেকে চুরি যাওয়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল উদ্ধার করতে পারেনি তারা। আবার তদন্তেও ইতি টানেনি।

 

তাই সিবিআই-এর তদন্ত অভিযান আদৌ প্রকৃত অনুসন্ধান নাকি প্রহেলিকামাত্র, এমন প্রশ্নকে একেবারেই অবান্তর বলা যায় না। তাই কোনওরকম রাখঢাক না করে প্রধান বিচারপতি এনভি রমণাও জানিয়ে দেন, শুরুর দিকে সিবিআই-এর ওপর অগাধ আস্থা ছিল মানুষের। নিরপেক্ষতা এবং স্বতন্ত্রতার প্রতিমূর্তি ছিল সিবিআই। তাই সিবিআই তদন্তের অনুরোধে খাতা ভরেছে সুপ্রিম কোর্টের। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্য সংস্থার মতো সিবিআই-ও মানুষের আস্থা হারিয়েছে। সময়বিশেষে এর অতিসক্রিয়তা এবং নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিছু ক্ষেত্রে সিবিআই-এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও যে প্রশ্ন রয়েছে, সেকথাও স্পষ্ট করে দেন প্রধান বিচারপতি।

 

More Articles

;