ভারতে হু হু করে বাড়ছে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা, কেন এই পরিস্থিতি দেশের শৈশবের?

লক্ষ লক্ষ শিশু শ্রমিকের জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গনাইজেশন এবং ইউনিসেফ-এর তরফে এই সম্পর্কে দু'টি পৃথক রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে।

Arnab Dutta
৪ মিনিট
ভারতে হু হু করে বাড়ছে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা, কেন এই পরিস্থিতি দেশের শৈশবের?

বেআইনিভাবে ভারতে ১ কোটি শিশুকে শিশুশ্রমিক হিসেবে কাজ করানো হচ্ছে, এফআইদায়ের হয়েছে নগণ্য সংখ্যক।

শৈশবের হাসিখুশির সময়ে লক্ষ লক্ষ শিশু শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে অসহনীয় দারিদ্রের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতারা সেই ২০১৫ সালে অঙ্গীকার করেছিলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে গোটা পৃথিবীকে শিশুশ্রমিক-মুক্ত করা হবে। কিন্তু সেই লক্ষ্য এখনও বহু দূরের পথ।

করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে হামলা চালানোর পর লক্ষ লক্ষ মানুষ জীবিকা খুইয়েছেন। লক্ষ লক্ষ শিশু শ্রমিকের জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গনাইজেশন এবং ইউনিসেফ-এর তরফে এই সম্পর্কে দু'টি পৃথক রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে।

রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, করোনাকালে দুনিয়ার ১৬ কোটি নিষ্পাপ শিশু বনে গিয়েছে শিশুশ্রমিক। এদের মধ্যে ৯ কোটি ৭০ লক্ষ বালক এবং ৬ কোটি ৩০ লক্ষ বালিকা। শিশুশ্রম দূরীকরণ তো দূরের কথা, পরিস্থিতি আরও সঙ্গিন হয়েছে কোটি কোটি শিশুর জীবনে। দুনিয়ার প্রতি ১০ জন শিশুর ভেতর একজনই শিশুশ্রমিক।

এই মুহূর্তে ভারতে কত শিশুশ্রমিক রয়েছে, সেই সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনও তথ্য কেন্দ্রীয় সরকার কিংবা রাজ্য সরকারগুলির হাতে নেই। তবে জনগণনার সর্বশেষ রিপোর্ট অনুসারে, ভারতে এক কোটিরও বেশি শিশুশ্রমিক রয়েছে। এই সংখ্যাটা ফের হু হু করে বেড়েছে দু'বছরে করোনাকালে।

ভারতে শিশুশ্রম সম্পূর্ণ বেআইনি। যদিও শিশুশ্রম আটকাতে তেমন কোনও উদ্যোগ নেই সরকারের। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো-র রিপোর্ট অনুসারে, শিশুশ্রমিক হিসেবে বেআইনিভাবে কাজ করানোর দায়ে 'চাইল্ড লেবার প্রোহিবিশন অ্যান্ড রেগুলেশন অ্যাক্ট'-এ দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা নামমাত্র।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'ডিজিটাল' ভারতেও কোটি কোটি মহিলা বঞ্চিত মোবাইল ব্যবহারে, নয়া সমীক্ষায় বৈষম্য স্পষ্ট

ভারতের মোবাইল ব্যবহারকারীর জাতীয় গড় ৯৩ শতাংশ। কিন্তু এর মধ্যে মোটে ৫৪ শতাংশ মহিলা একটি মোবাইল ফোনের মালিক।

কেবল ভারতই নয়, পৃথিবীজুড়েই এই পরিস্থিতি। দুনিয়ায় যত শিশুশ্রমিক দু্র্ভাগ্যের কবলে, তাদের মধ্যে অর্ধেকেরই বসবাস আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলিতে মোট যত শিশুর বসবাস, আফ্রিকায় শিশুশ্রমিক হিসেবে কাজ করছে এর চেয়ে বেশি সংখ্যার শিশু।

তবে এই চাকচিক্যময় আধুনিক দুনিয়া কি আজও শিশুর বাসযোগ্যর উপযোগী নয়? আন্তর্জাতিক স্তরের বিভিন্ন সমীক্ষার তথ্যে এমনই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। এও দেখা যাচ্ছে, আবিশ্বে ৭৪ শতাংশ শিশু কোনও ধরনের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পেরই সুবিধা পাচ্ছে না। এদের মধ্যে ৯০ শতাংশ শিশু নিম্ন আয়ের নানা দেশের বাসিন্দা। অভিশপ্ত জীবন কাটাতে বাধ্য করা হয়েছে যে শিশুদের, তাদের বয়স ৫ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে।

অথচ সুন্দর ও সুস্থ শৈশব কাটানো প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে। শিশুশ্রমিকরা কলকারখানা, ইটভাটা, শহরাঞ্চলের চায়ের দোকান, ছোট ও মাঝারি হোটেলগুলিতে কাজ করছে নামমাত্র পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। দু'বেলা দু'মুঠো ভাতের তাগিদে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গৃহ-পরিচারিকা হিসেবে কাজ করছে বালিকারা।

কেন শিশুরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হয়? আর কীভাবে এই সমস্যা নির্মূল করা যেতে পারে? এ-ব্যাপারে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির মত, শিশুদের জন্য সর্বাগ্রে পুষ্টিকর খাদ্য এবং শিক্ষালাভের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

জনগণনার সর্বশেষ রিপোর্ট অনুসারে, ভারতে ৫ থেকে ১৮ বছর বয়সের যে শিশুশ্রমিকরা শৈশবকে উপভোগ করার পরিবর্তে শিশুশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে, ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই দেশের গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দা ওরা। শিশুশ্রমিকদের নিয়ে কাজ করছে এমন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির দাবি, পঞ্চায়েতগুলির এব্যাপারে সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়াটা জরুরি। স্কুলছুট হয়ে শিশুরা যেন শ্রমিক না বনে যায় পঞ্চায়েতগুলির সে-বিষয়েও লক্ষ রাখা উচিত।

ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের অনুসন্ধানে ধরা পড়েছে, শিশুশ্রমিকদের শারীরিক এবং মানসিক বিকাশও ব্যাহত হচ্ছে। অভিযোগ উঠছে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে। 'সবকা সাথ, সব কা বিকাশ' কি তাহলে মামুলি কথা? স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও স্বাধীন দেশের শিশুদের কপালে ঘাম ঝরছে আর দিনের শেষে ঝরছে চোখের জল। অথচ এই শিশুরাই দেশের ভবিষ্যতের নাগরিক।

২০০২ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে 'বিশ্ব শিশুশ্রমবিরোধী দিবস'। চলতি বছরের ১২ জুন এই দিনটি পেরিয়েছে। তাতে শিশুশ্রমিকদের দিন পাল্টায়নি গত ২০ বছরে। ভারতে শিশুরা মৌলিক অধিকারগুলি থেকে আজও বঞ্চিত। যদিও দেশের সংবিধানের ২৩ নম্বর ধারা এবং ২৪ নম্বর ধারায় শিশুশ্রম বেআইনি। এছাড়া ১৯৮৬ সালে প্রণয়ন করা চাইল্ড লেবার অ্যাক্ট প্রোহিবিশান অ্যান্ড রেগুলেশন অনুসারে ১৪ বছরের কমবয়সি কোনও শিশুকে শ্রমিক হিসেবে কাজ করানোটা বেআইনি।

শুধু ভারতই নয়, দুনিয়াজুড়েই বহু শিশুর জীবন কাটছে মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের রিপোর্ট অনুসারে, গত চার বছরে আবিশ্ব শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ৮০ লক্ষ-রও বেশি বেড়েছে। 'বিশ্ব শিশুশ্রমবিরোধী দিবস' আজও আবিশ্ব কোটি কোটি শিশুশ্রমিকের জীবনের আর পাঁচটা সংগ্রামী দিনের মতো একটি দিন।

ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে শিশুশ্রমিকদের সংখ্যা-সংক্রান্ত যে খতিয়ান পেশ করেছে, সেই রিপোর্ট অনুসারে, দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশগুলির মধ্যে শিশুশ্রমিকের সংখ্যার নিরিখে ভারত সর্বোচ্চ স্থানাধিকারী। বর্তমানে ভারতে ৫০ লক্ষ-র বেশি শিশুশ্রমিক রয়েছে। এদিকে গত জনগণনার পরিসংখ্যান অনুসারে ভারতে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ছিল এর দ্বিগুণ।

অন্যদিকে, কৈলাস সত্যার্থী ফাউন্ডেশনের রিপোর্টে দেখানো হয়েছে, গত চার দশকে ভারতে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১ লক্ষ-র বেশি। এদের বয়স ৫ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। ফলে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা বিভিন্ন সংস্থার সমীক্ষা রিপোর্টে নানা রকম।

তাও আশার আলো, আন্তর্জাতিক লেবার অর্গানাইজেশন শিশুশ্রম বন্ধর জন্য আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন করেছে। ভারতেও শিশুদের শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগানোটা সম্পূর্ণভাবে বেআইনি। যদিও ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য হতাশাজনক। চাইল্ড লেবার প্রোহিবিশন অ্যান্ড রেগুলেশন অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্টে মোটে ১,৭১২টি এফআইআর দায়ের হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর পরিসংখ্যানে।

শিশুশ্রমিকদের মধ্যে অনেকেই নানা ধরনের পেশাগত রোগের শিকার। বিশেষত চর্মরোগের সমস্যা, দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে যাওয়া, যক্ষ্মা, ফুসফুসের অসুখে আক্রান্ত বহু শিশু। এছাড়া শিশুশ্রমিকদের যৌন হেনস্থার ঘটনা উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবীরা।

লিখেছেন
Arnab Dutta
Arnab Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।