বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতেও কালো চামড়ার সঙ্গে বৈষম্য! দায় আসলে কার?

Racism in Science: অ্যালগোদিম কেবল সাদা চামড়ার মানুষদের চিনতে শেখায়, কালো চামড়ার মানুষদের যন্ত্র হয় চিনতে পারে না, নয়তো ‘গোরিলা’ বা ‘শিম্পাজি’ হিসেবে চিহ্নিত করে

Madhurima Pattanayak
৪ মিনিট
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতেও কালো চামড়ার সঙ্গে বৈষম্য! দায় আসলে কার?

ছোটোবেলায় যখন মানুষের মুখ বা ছবি আঁকতেন, রঙ করার সময় হাতটা ঠিক কোন রঙে পৌঁছত? আপনি কি কোনও দিনও হলদেটে রঙ বাদ দিয়ে বাদামী বা কালো রঙে হাত দিয়েছেন? দেননি, তাই তো? দোষ যদিও আপনার নয় পুরোপুরি। বেশ কিছু ক্ষেত্রেই কেউ শিখিয়ে দিয়েছে ওই রঙটাই স্বাভাবিক, ওই রঙটাই সাধারণত মানুষের গায়ের রঙ। কোথাও বা আপনার অজান্তেই বৈষম্য আপনার মনের গভীরে গেঁথে গেছে। সমস্যার সূত্রপাত কিন্তু সেই তখন থেকে। সেই থেকে সাদা বা ফর্সাকেই গ্রহণযোগ্য এবং স্বাভাবিক রঙ বলে চিনে আসতে আমাদের শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই বৈষম্যমূলক আচরণের শিকড় এতটাই গভীরে পৌঁছে গেছে যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত জিনিসও বানানো হয় সাদা চামড়া বা তুলনামূলক ভাবে ফর্সা চামড়া যাঁদের, তাঁদের কথা মাথায় রেখে। সে রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতিই হোক বা মেডিক্যাল ডিভাইস কিংবা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স।

যেমন ধরা যাক, পালস অক্সিমিটারের কথা। কোভিড মহামারি শুরুর পর থেকে হু হু করে বিকিয়েছে যন্ত্রটি। পালস অক্সিমিটার অক্সিজেন স্যাচুরেশন মাপতে ব্যবহার করা হয়। অক্সিজেন স্যাচুরেশনের অর্থ, কোনও একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে রক্তে অক্সিজেনের সঙ্গে আবদ্ধ না থাকা হিমোগ্লোবিনের তুলনায় কী পরিমাণ হিমোগ্লোবিন অক্সিজেনের সঙ্গে আবদ্ধ রয়েছে তার হিসেব। আপনি কি জানেন, পালস অক্সিমিটারে অক্সিজেন স্যাচুরেশনের যে রিডিংটি দেখায়, সেটা সাদা চামড়ার মানুষদের ক্ষেত্রে প্রায় নির্ভুল, কিন্তু কালো চামড়ার মানুষদের ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণ?

দেখা যাচ্ছে, কালো চামড়ার মানুষদের ক্ষেত্রে রক্তে আসলে যত শতাংশ অক্সিজেন স্যাচুরেশন, বাজারচলতি পালস অক্সিমিটারে তার থেকে বেশ কয়েক শতাংশ বেশি অক্সিজেন স্যাচুরেশন দেখায়। সুস্থ, স্বাভাবিক এবং সজাগ অবস্থায় রোগীর শরীরে ৯২ শতাংশের বেশি অক্সিজেন স্যাচুরেশন থাকে। অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৮৮ শতাংশের নীচে নেমে গেলেই তাকে হাইপোক্সেমিয়া বলে অর্থাৎ যে অবস্থায় অক্সিজেন স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকে। কালো চামড়ার মানুষদের ক্ষেত্রে ৮৮ শতাংশের নীচে অক্সিজেন স্যাচুরেশন নেমে গেলেও পালস অক্সিমিটারের রিডিং বলে তার অক্সিজেন স্যাচুরেশন বিরানব্বইয়ের উপরেই রয়েছে। অথচ সাদা চামড়ার মানুষদের ক্ষেত্রে প্রায় নির্ভুল দেখায় সেই ফলাফল।

একটু বিশদে বলা যাক। কিন্তু তার আগেও সংক্ষেপে বলা যাক পালস অক্সিমিটার কীভাবে কাজ করে। পালস অক্সিমিটার থেকে লাল এবং ইনফ্রারেড রশ্মি বিচ্ছুরিত হয়। এই দুই রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য আলাদা। অক্সিজেনের সঙ্গে আবদ্ধ হিমোগ্লোবিন যতটা কার্যকারিতার সঙ্গে ইনফ্রারেড রশ্মি শোষণ করে, ততটা সে লাল রশ্মির ক্ষেত্রে করে না। আর ঠিক উল্টোটা দেখা যায় অক্সিজেনের সঙ্গে আবদ্ধ না থাকা হিমোগ্লোবিনের ক্ষেত্রে। তারা আবার লাল রশ্মিকে তুলনামূলকভাবে বেশি ভালো করে শোষণ করতে পারে।

বাজারচলতি পালস অক্সিমিটারে দু’টি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের লাইট এমিটিং ডায়োড (বা এলইডি) থাকে- যাদের একটি লাল এবং অপরটি ইনফ্রারেড। এদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য যথাক্রমে ৬৬০ ন্যানোমিটার এবং ৯৪০ ন্যানোমিটার। হিমোগ্লোবিন কী পরিমাণে কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রশ্মি শোষণ করছে, তার একটি আনুপাতিক হিসেব এখান থেকে পাওয়া যায়। এই আনুপাতিক হিসেব থেকে রক্তে অক্সিজেন স্যাচুরেশনের মাত্রা আগে থেকেই ক্রমাঙ্কিত বা ক্যালিব্রেটেড রয়েছে। আর সেই ক্যালিব্রেশন অ্যালগোরিদম পালস অক্সিমিটারের মাইক্রোপ্রসেসারে সংরক্ষিত থাকে।

কালো চামড়ার মানুষদের ত্বকে মেলানিন থাকে বেশি, যা তৈরি হয় মেলানোসাইট থেকে। আর এই মেলানোসাইটের প্রভাবে লাল বা ইনফ্রারেড রশ্মির শোষণ এবং বিচ্ছুরণ প্রভাবিত হয়। সাদা চামড়ার মানুষদের তুলনায় কালো চামড়ার মানুষদের ত্বকে মেলানোসাইট কেবল বেশিই থাকে না, মেলানোসাইটের আকারও বড় হয়। শরীরে থাকা বিভিন্ন জৈব অণুর (যেমন মেলাটোনিন) প্রভাবে যে লাল ও ইনফ্রারেড রশ্মির শোষণ ও বিচ্ছুরণ বিঘ্নিত হতে পারে- এই বিষয়টিকে কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে মেনে আসা অক্সিমেট্রিক থিওরি হিসেবের মধ্যে ফেলে না। আর বিপত্তি হচ্ছে সেখানেই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সবুজ রঙের বাজি মানেই কি পরিবেশবান্ধব? জানুন গ্রিন ক্র্যাকারের আসল সত্য

Green Crackers: সাধারণত, পথের ধারে যারা বাজির স্টল দিয়ে থাকেন তাঁদের কাছে এই ধরনের গ্রিন ক্র্যাকার থাকে না। তাই তাঁদের কাছ থেকে সবুজ বাজির আশা না করাই ভালো।

এ সমস্যা কালো চামড়ার লোকেদের সমস্যা বলে এড়িয়ে যেতেই পারেন, কিন্তু এখানে মনে রাখা দরকার, মেলাটোনিন গড়পড়তা ভারতীয়দের শরীরে কালো চামড়ার মানুষদের মতো না থাকলেও, বেশিই থাকে সাদা চামড়ার মানুষদের তুলনায়। মেলাটোনিন যত বাড়বে পালস অক্সিমিটার রিডিংয়ে ত্রুটির সম্ভাবনাও যে পাল্লা দিয়ে বাড়বে, এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কালো চামড়ার মানুষরা এমনিতেই বৈষম্যের শিকার। উপরন্তু তাঁদের ক্ষেত্রে অ্যানিমিয়া, সিকল সেল ডিজি়জ, সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার মতো গুরুতর সমস্যা রয়েছে। এই রোগগুলির ফলে হিমোগ্লোবিন কম থাকে তো বটেই, হিমোগ্লোবিনের অক্সিজেনবাহী ক্ষমতাও কমে যায়। ফলে ব্লাড স্যাচুরেশন দ্রুত হ্রাস পায়। পরিসংখ্যান বলছে, কোভিড মহামারীর সময় আফ্রিকান-আমেরিকানদের অসুস্থতার হার, হাসপাতালে ভর্তির হার এবং মৃত্যুর হার সাদা চামড়ার আমেরিকানদের তুলনায় অনেক বেশি। একই সমস্যা হিসপ্যানিকদের ক্ষেত্রে, যাদের চামড়ার রঙ বাদামী। ভারতীয়রাও যে এই সমস্যার শিকার হননি, তা আমরা জোর দিয়ে বলতে পারি না। আদতে আমাদের চামড়াও বাদামী বা বাদামীর দিকেই।

পালস অক্সিমিটার ছেড়ে আসা যাক আরেক বহুল ব্যবহৃত প্রযুক্তির আলোচনায়। আর তা হল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, যা ওতোপ্রতোভাবে কম্পিউটার অ্যালগোরিদম নির্ভর। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আদতে মানুষের থেকে ধার করা বুদ্ধির মতো। বলা ভালো, মানুষই এখানে যেচে যন্ত্রকে বুদ্ধি দেয়। মানুষই যন্ত্রকে শেখায় অঙ্ক করতে, অক্ষর-বর্ণ চিনতে, রঙ চিনতে। অথচ মানুষ যা শেখায় না, তা হল মানুষের গায়ের রঙের ভিন্নতা।

বিশ্বজুড়ে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোতে সাদা চামড়াওয়ালা মানুষদের রাজ। তারাই মূলত যন্ত্রদের শিখিয়ে-পড়িয়ে মানুষের মতো মানুষ, থুড়ি মানুষের মতো যন্ত্র বানায়। তারাই ফেশিয়াল রেকগনিশন অ্যালগোদিম বানায়। সেই অ্যালগোদিম কেবল সাদা চামড়ার মানুষদের চিনতে শেখায়, কালো চামড়ার মানুষদের যন্ত্র হয় চিনতে পারে না, নয়তো ‘গোরিলা’ বা ‘শিম্পাজি’ হিসেবে চিহ্নিত করে, জানা যাচ্ছে ২০২১ সালে অ্যালেক রাডফোর্ডের একটি প্রি-প্রিন্ট থেকে।

স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কালো চামড়ার মানুষদের চিনতে পারে না। যার অবশ্যম্ভাবী ফল পথদুর্ঘটনা। অথচ এয়ারপোর্ট বা ট্রেন স্টেশনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কালো চামড়ার মানুষদের আবার মুখ চিনে, রঙ মেপে তাঁদের সন্দেহভাজনের তালিকায় ফেলে দিতে পারে। অক্সিমেট্রির প্রচলিত থিওরি না হয় মেলানিনের মতো বায়োমলিক্যুলের উপস্থিতিকে হিসেবের মধ্যে ফেলে না কিন্তু মানুষ যখন যন্ত্রকে শিখিয়ে-পড়িয়ে স্বয়ংক্রিয় করে তোলে, তখন কালো চামড়ার মানুষকে হিসেব থেকে বাদই দিয়ে ফেলে!

সব ত্রুটি তো আর যান্ত্রিক ত্রুটি বলে দায় এড়ানো যায় না, তাই না?

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।