বাংলায় ব‍্যান্ড সংস্কৃতির অপমৃত্যু? ফসিলস-ভক্তদের নিয়ে নয়া বিতর্ক যে প্রশ্ন উসকে দিচ্ছে

Fossils vs Arnob: কোক স্টুডিওর অনুষ্ঠানে যে ঘটনাটি ঘটেছে, তা প্রমাণ করে দেয় অনুরাগীদের মধ্যে বিদ্বেষ কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে!

Arunava Nag Roy
৩ মিনিট
বাংলায় ব‍্যান্ড সংস্কৃতির অপমৃত্যু? ফসিলস-ভক্তদের নিয়ে নয়া বিতর্ক যে প্রশ্ন উসকে দিচ্ছে

পুজোর আগে শহরে ছিল জমজমাট গানের কনসার্ট। ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর কোক স্টুডিও কলকাতায় তাদের শো অরগানাইজ করে। সেই শোয়ের লাইন আপে ছিলেন শ্রেয়া ঘোষাল, অনুপম রায়, শংকর-এহসান-লয়, ফসিলস এবং অর্ণব। সপ্তাহান্তে ইকো পার্কের এই অনুষ্ঠান ঘিরে উৎসাহ ছিল তুঙ্গে। রীতিমতো চাঁদের হাট ইকো পার্কে! তবে সেই অনুষ্ঠানই এখন বিতর্কের শিরোনামে। ফসিলস ফোর্স বনাম কোক স্টুডিও বাংলা ফ্যান- তর্কাতর্কিতে ছয়লাপ সোশ্যাল মিডিয়া। অভিযোগ, অর্ণবের পারফরম্যান্স চলাকালীন বিশৃঙ্খলা তৈরি করেন ফসিলস তথা রূপম ইসলামের অনুরাগীরা। যা নিয়ে নেটিজেনদের কটাক্ষের মুখে পড়েন রূপম এবং তাঁর স্ত্রী রূপসা।

২৫ সেপ্টেম্বর, রবিবার ইকো পার্কে আয়োজিত কনসার্টে বাংলাদেশি শিল্পী অর্ণব এবং কোক স্টুডিও বাংলা-র পারফরম্যান্সের পরই ছিল ফসিলসের অনুষ্ঠান। পারফরম্যান্সের একেবারে শেষভাগে কিছুটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই থেকেই দুই পক্ষের অনুরাগীদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ক্রমেই যা ব্যক্তিগত আক্রমণে পৌঁছে গিয়েছে। এদিন ফসিলসের প্রোগ্রামের পর মঞ্চে পারফর্ম করতে ওঠেন অর্ণব। স্বনামধন্য গায়ক হওয়ার পাশাপাশি অর্ণব রুপমের খুব ভালো বন্ধুও। যথারীতি বন্ধুর পারফরম্যান্স একটু কাছ থেকে দেখার জন্য স্টেজে উঠে এসেছিলেন রুপম ইসলাম। রূপম ইসলামকে দেখে দর্শকদের মধ্যে কয়েকজন তখন রূপম ও ফসিলসের নাম করে চিৎকার শুরু করেন। রূপম তা বুঝতে পেরেই তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে সরে যান।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
খবরের কাগজ বলেছিল বাঁদরের নৃত্য, গান নয়, ইতিহাস হয়ে থেকে গেল মনিদার কাজ

'আবার বছর কুড়ি পরে'-র সময় যাঁদের দিয়ে গান গাওয়ালেন মনিদা, তাঁদের স্বতন্ত্র গানের পরিসর তৈরি হল পরে। একে একে তৈরি হল চন্দ্রবিন্দু, লক্ষ্মীছাড়া। শিলাজিৎ মনিদার খুব প্রিয় ছিল। 'মহীনের ঘোড়াগুলি' এদের সকলকে সাহস জুগিয়েছে, মনিদা সাহস দিয়েছে।

কিন্তু বিষয়টা নিয়ে জল অনেক দূর গড়ায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় অর্ণব এবং রুপম ইসলাম দু'জনেই জানিয়েছেন ঘটনাটি নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ঝামেলা থামার কোনও লক্ষণ নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় নেটিজেনদের একাংশ ব্যক্তিগত স্তরে গিয়ে আক্রমণ করছে রুপম ইসলাম এবং অর্ণব উভয়কেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় নেটিজেনদের একাংশ ফসিলসের অনুরাগীদের গাঁজাখোর তকমা দিচ্ছেন। অপর পক্ষে এক দলের দাবি, টিকিট বিক্রি হয়েছে ফসিলসের নাম দিয়েই! তাই সেই ব‍্যান্ডের ভক্তদের অত‍্যাচার সইতেই হবে। কাদা ছোড়াছুড়ি হচ্ছে দুই পক্ষেই। কিন্তু আসলে যা হচ্ছে, তা নির্ভেজাল নিখাদ অসভ‍্যতা। বাংলা ব‍্যান্ড সংস্কৃতির ইতিহাসের অধঃপতন বলেই কি ধরে নিতে হবে একে?

আপনি যে কোনও ব্যান্ডের অনুরাগী হতেই পারেন, কিন্তু তাই বলে অন্য কোনও ব্যান্ডকে ছোট করা কি কাম‍্য? কোক স্টুডিওর অনুষ্ঠানে যে ঘটনাটি ঘটেছে, তা প্রমাণ করে দেয় অনুরাগীদের মধ্যে বিদ্বেষ কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে! সোশ‍্যাল মিডিয়াজুড়ে যে 'টক্সিক ফ‍্যান' শব্দটি ঘুরে বেড়াচ্ছে, ব‍্যান্ড-সংস্কৃতির নিম্নগামী অভিমুখ সেখান থেকেই পরিষ্কার হয়। মাথায় রাখতে হবে, এটি কিন্তু কেবলমাত্র ব্যান্ড-সংগীতের মধ্যেই আবদ্ধ নয়, বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে, যে কোনও ক্ষেত্রে এখন প্রতিদ্বন্দ্বী নির্মাণ ও বাইনারি নির্মাণের খেলা। আমরা তো প্রায় সময়ই দেখেছি, মেসির অনুরাগীরা রোনাল্ডোকে গালাগাল দিচ্ছেন, রোনাল্ডোর অনুরাগীরা মেসিকে গালাগাল দিচ্ছেন। মানুষ ভুলে যান, মেসি এবং রোনাল্ডো কিন্তু পরস্পরকে যথেষ্ট সম্মান করেন। আমাদের মাথায় রাখা উচিত, ভালবাসা কেবল ভালবাসা দিয়েই দেখানো যায়, ঘৃণা দিয়ে নয়।

আর 'ব্যান্ড' শব্দের অর্থ কী? 'ব্যান্ড' শব্দটা আমাদের কানে আসলে প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আধুনিক ভাবধারার বিভিন্ন সংগীতজ্ঞদের দলের কথা। এই ‘দল’ শব্দটা মাথায় রাখবেন। একাধিক মিউজিশিয়ান একসঙ্গে এসে গান গাওয়াই তো ব্যান্ডের উদ্দেশ্য? তাই নয় কি? বাংলায় ব্যান্ড কালচারের প্রাণপুরুষ ছিলেন গৌতম চট্টোপাধ্যায়। গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে সাতের দশকে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ যে লড়াই শুরু করেছিল, নয়ের দশকে একগুচ্ছ গায়ক এবং ব্যান্ডের হাত ধরে বাংলা গান সেই পূর্ণতা পায়। একদল তরুণকে নিয়ে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ই প্রথম শুরু করেন 'মহীনের ঘোড়াগুলি'। কয়েক বছরের মধ্যেই আরেকটি প্রবাদপ্রতিম ব্যান্ড গড়ে ওঠে বাংলায়, ‘নগর ফিলোমেল’। সাতের দশকের শেষভাগ থেকে আটের দশক পর্যন্ত সারা বাংলা দাপিয়ে বেড়িয়েছে এই দু'টি ব্যান্ড। সমাজের তথাকথিত উচ্চশ্রেণির মানুষ তখন এদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও পরবর্তী সময়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এদের গান শুনেই বড় হয়েছে। এমন অনেক সময় দেখা গেছে, যখন ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ এবং ‘নগর ফিলোমেল’ একসঙ্গে একই মঞ্চে পারফর্ম করেছে এবং শ্রোতারা সানন্দে সেটিকে গ্রহণ করেছেন। 'চন্দ্রবিন্দু'-র মতো নতুন ব‍্যান্ডও মঞ্চসঙ্গী হয়েছে 'মহীনের ঘোড়াগুলি'-র। পরবর্তী সময়ে চন্দ্রবিন্দু, ভূমি, দোহার, ক্যাকটাস, ফসিলস-ও বহু অনুষ্ঠানে একসঙ্গে পারফর্ম করেছে এবং শ্রোতাদের উপহার দিয়েছে অবিস্মরণীয় কিছু মুহূর্ত।

শুধু বাংলা বা ভারত নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মিউজিশিয়ানরা একসঙ্গে আসেন এবং পারফর্ম করেন। এবং শেষ পর্যন্ত যা তৈরি হয়, তা অনন্য অভিজ্ঞতা শ্রোতাদের কাছে! কিন্তু এই সবকিছুই মাটি হয়ে যেতে পারে যদি শ্রোতাদের মধ্যে ঘৃণার চাষ হয়। মানুষ ক্রমশ একমুখী হয়ে যাচ্ছে এবং নতুন কিছুকে গ্রহণ করতে চাইছে না। যে কোনও শিল্পকেই বুঝতে গেলে সবার আগে উদারমনস্ক হতে হয়। তাহলেই শিল্পের আসল রস আস্বাদন করা যায়। সেই মনন একসময় বাঙালির ছিল, তার কি মৃত্যু ঘটল তবে?

লিখেছেন
Arunava Nag Roy
Arunava Nag Roy
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।