একই ঘরে একসঙ্গে বসবাস করেন শিব-বুদ্ধ, দার্জিলিংয়ের এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে যে ইতিহাস

Mahakal Temple Darjeeling : আলাদা প্রাঙ্গণে নয়, একই মন্দির, একই ঘরের ভেতর একসঙ্গে সহাবস্থান শিব ও বুদ্ধের! একইসঙ্গে দুই দেবতারই আরাধনা সম্পন্ন হয়।

Aritra Som
৪ মিনিট
একই ঘরে একসঙ্গে বসবাস করেন শিব-বুদ্ধ, দার্জিলিংয়ের এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে যে ইতিহাস

একটু দূর থেকে হাতছানি দিচ্ছে পাহাড়। যতদূর চোখ যায় কেবল আকাশ, পাহাড় আর ঠাণ্ডা কুয়াশায় মাখা কিছু মানুষ। দোকানপাটে মনপসন্দ জামা, পাহাড়ি খাবার; মোমো-থুকপার সঙ্গেই রয়েছে রঙবেরঙের টুপি, ঝাল ডাল্লে লঙ্কার আচার। সেইসঙ্গেই রয়েছে গরম চা, কফি এবং একরাশ শীত। দার্জিলিং শহর তার সমস্ত ডালি নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকে পর্যটকদের জন্য। দাঁড়িয়ে থাকেন সেখানকার বাসিন্দারা। দার্জিলিং কেবল কেভেন্টার্স, গ্লেনারিজ কিংবা টাইগার হিলের সমারোহ নয়। পাহাড়ের রানি তার নিজস্ব ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সগৌরবে। সেখানে কেবল সূর্যোদয়ের ক্যামেরাবন্দি মুহূর্ত নয়, রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্যের গন্ধও…

সেই ইতিহাসের একটা অংশই লেগে আছে অবজারভেটরি হিলে। দার্জিলিং চৌরাস্তা থেকে সামান্য কয়েক মিনিট হাঁটাপথ। তারপরই স্বাগত জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশাল বড় একটি গেট। দুটি তোরণের নিচে সিংহ, ওপরে স্বস্তিক চিহ্ন পেরোনোর পর সার দেওয়া লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, সাদা পতাকা। পতাকার গায়ে কিছু লেখা, সেই ভাষা বাঙালিদের চেনা হলেও পড়তে পারবেন না সবাই। দার্জিলিং, কালিম্পং ও সিকিম জুড়ে এমন বৌদ্ধ মন্ত্র সম্বলিত পতাকাই যে উড়ে বেড়াচ্ছে। কেবল বৌদ্ধ মঠ নয়, রাস্তাঘাটেও দেখা মেলে সেই পতাকার। এত বৌদ্ধ মন্ত্র সম্বলিত পতাকা যখন, নিশ্চয়ই কোনও মঠই হবে!

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিষাক্ত হ্রদ, ভুতুড়ে বাংলো, উন্মুক্ত কাঞ্চনজঙ্ঘা! দার্জিলিং নয়, এবার শীতে পাড়ি দিন এই পাহাড়ে

Rinchenpong Travel Guide: রিনচেনপং মনেস্ট্রি থেকে একটু হেঁটে এগিয়ে গেলে দেখতে পাবেন একটি পুরনো ব্রিটিশ আমলের বাংলো। বাংলোর সামনে অল্প নীচে দেখতে পাবেন একটি প্রায় শুকিয়ে যাওয়া জলাশয়।

কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই খানিক ধাঁধাঁ লেগে যেতে বাধ্য। যারা আগেও এসেছেন, তাঁরা বিলক্ষণ চেনেন এই মন্দিরটিকে। হ্যাঁ, মন্দিরই বটে; মঠ নয়। কিংবা বলা যায়, মন্দির ও মঠ দুটোই! দার্জিলিংয়ের মহাকাল মন্দির এমনই অভূতপূর্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রথার এক সৌধ। দার্জিলিংয়ের বুকে থাকা জীবন্ত ইতিহাসের একটা প্রস্তর খণ্ড। মন্দির প্রাঙ্গনের ভেতর কালীর মন্দির; তারপর মূল মন্দিরের ভেতর শিবের মূর্তি। মহাকাল মন্দিরকে আদতে ‘শিব মন্দির’ বললে ভুল হয় না। কিন্তু কেবল শিব নন, ত্রিশূল নয়, তার পাশেই উপস্থিত বৌদ্ধ স্তূপ। রয়েছেন স্বয়ং বুদ্ধ! আলাদা প্রাঙ্গণে নয়, একই মন্দির, একই ঘরের ভেতর একসঙ্গে সহাবস্থান শিব ও বুদ্ধের! একইসঙ্গে দুই দেবতারই আরাধনা সম্পন্ন হয়। শিবের পুরোহিতের সঙ্গেই আসনে বসেন বৌদ্ধ সাধু।

মহাকাল মন্দির আসলে এমনই। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য – এমন একটি কথা পাঠ্যবইয়ে পড়েছি সবাই। বাস্তব পৃথিবীতে তার খুব কম উদাহরণই দেখা যায়। মহাকাল মন্দির সেই উদাহরণেরই অন্যতম। দার্জিলিং মানে কেবল বৌদ্ধ ভিক্ষু নন, সেখানে রয়েছে অসংখ্য হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। সবাই একসঙ্গে বসবাস করেন। সেই ছবিটারই একটা খণ্ডিত অংশ ধরা পড়ে মহাকাল মন্দির চত্বরে। অবশ্য হওয়ারই তো কথা! ইতিহাস ও কিংবদন্তি বলে, মহাকাল মন্দিরের এই অঞ্চল থেকেই শুরু হয়েছিল দার্জিলিংয়ের বিস্তার। আজও এই চত্বরকে এই শহরের সবচেয়ে পুরনো ও পবিত্র অংশ বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গ্লেনারিজ: যে চুম্বক লাখো মানুষকে ফিরিয়ে আনে দার্জিলিংয়ে

গ্লেনারিস বেকারি, ক্যাফে এবং কেক শপ সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা অবধি খোলা থাকে। বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য এই রেস্তোরাঁটিতে রয়েছে ফ্রি ইন্টারনেটের সুবিধাও।

মহাকাল মন্দির দার্জিলিংয়ের ইতিহাসের সঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছে

দার্জিলিং ও মহাকাল মন্দির – উভয়েরই গল্প শুরু হয় আজ থেকে প্রায় ২৫৭ বছর আগে। সালটা ১৭৬৫। সদ্য শেষ হয়েছে পলাশির যুদ্ধ। সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের রেশ কয়েকশো কিলোমিটার দূরের পাহাড়ি এলাকায় স্বাভাবিকভাবেই ছড়িয়ে পড়েনি। সেই ১৭৬৫ সালে বাংলার উত্তরের এই অংশে এসে উপস্থিত হন এক তিব্বতি লামা, নাম দোরজে রিনজিং। আজকে যেটি অবজারভেটরি হিল নামে পরিচিত, সেটি তখন ছিল স্থানীয় লেপচাদের অত্যন্ত পবিত্র স্থান। সেই স্থানেই লামা দোরজে রিনজিং তৈরি করেন একটি বৌদ্ধ মঠ। একটু একটু করে লেপচা ও স্থানীয় ভুটানিরা এই মঠে আরাধনা শুরু করেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সিকিম, সিটং অনেক হল! এই শীতে হাতের নাগালেই রয়েছে 'ভারতের স্কটল্যান্ড'

সন্ধ্যার পরে হোমস্টের বারান্দায় ফায়ারপ্লেসের পাশে জড়ো হয়ে বসে থাকার সময়ে বাইরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে একটানা চলা ঝিঁঝির কোরাস আপনাকে জীবনের রোজনামচা ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

একে সুউচ্চ পাহাড়, শান্ত, ঠাণ্ডা আবহাওয়া। সেইসঙ্গে বর্ষার সময় এটি মেঘেদের রাজ্যে পরিণত হয়ে যায়। মেঘ, বিদ্যুৎ, বৃষ্টির সমাহার সেই সময় দেখা যায়। দার্জিলিংয়ের সঙ্গে মেঘেদের এমন সম্পর্ক আজও অটুট। যাই হোক, এই সমস্ত কারণেই বোধহয় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এই মঠটির নামকরণ করেছিলেন ‘বজ্রপাতের রাজ্য’ হিসেবে। ইংরেজিতে ‘The land of Thunderbolts’… আর স্থানীয় বাসিন্দা ও ভিক্ষুরা ডাকতেন ‘দোরজে লিঙ্গ’ হিসেবে। কিংবদন্তি হল, এখান থেকেই নাকি শহরের নাম হয় দার্জিলিং। সেই প্রবাদ সত্যি কিনা, জানা নেই।

আজকের মহাকাল মন্দির ঠিক যেখানে, একটা সময় তার পাশেই নাকি ছিল ওই ‘দোরজে লিঙ্গ’ বৌদ্ধ মঠ। দোরজে লিঙ্গের পাশেই ১৭৮২ সালে লামা দোরজে রিনজিংই তৈরি করেন মহাকাল মন্দির। ভাবুন, একই ব্যক্তি, যিনি ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে বৌদ্ধ, তিনি একই জায়গায় শিব আর বুদ্ধের মন্দির তৈরি করেন। যা গোটা অঞ্চলের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। তবে বৌদ্ধ মঠটি এখন আর নিজের জায়গায় নেই। ১৭৮৮ ও ১৮১৫ সালে ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধের সময় গোর্খা আক্রমণের ফলে মঠটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে ওই মঠটিকে স্থানান্তরিত করে কাছেই একটি ভুটিয়া বস্তিতে নিয়ে যাওয়া হয়। আজও সেখানেই বিরাজমান দার্জিলিংয়ের প্রাচীন ইতিহাস।

মন্দিরের ঘণ্টার গায়ে খোদাই করা 'ওম মণি পদ্মে হুম'

মহাকাল মন্দির প্রধানত শিবের মন্দির। মন্দিরের স্থাপত্যকলার মধ্যেও সেই ছাপ দেখা যায়। তবে একটু মন দিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে, সেই ছাপের ভেতরে মিশে আছে বুদ্ধের ছোঁয়াও। যেমন বৌদ্ধ মন্ত্র সম্বলিত রঙবেরঙের পতাকা। মন্দিরের ভেতরের ঘণ্টার গায়ে খোদাই করা ‘ওম মণি পদ্মে হুম’। কোথাও সার দিয়ে রাখা জপযন্ত্র… তবে আসল ছবি দেখা যায় মন্দিরের ভেতরে। একই ঘরে কালো পাথরের শিব আর বুদ্ধ মূর্তি বিরাজমান। ত্রিশূলের সঙ্গে সহাবস্থান স্তূপেরও। শিবমূর্তির সামনে বসেন হিন্দু পুরোহিত; তাঁর ঠিক মুখোমুখি হয়ে বসেন বৌদ্ধ সাধুও। সঙ্গে প্রদীপের আলো আর ঘণ্টাধ্বনি… যখন মন্ত্র উচ্চারণ হয় তখন যেন কথা বলে দার্জিলিং। কথা বলে তার বিগতকালীন সময়। কথা বলে প্রতিটা গলি, পাহাড়ের ধাপ। কথা বলে কাঞ্চনজঙ্ঘা। মহাকাল মন্দির সেই শান্ত পাহাড়কে আগলে নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে।

লিখেছেন
Aritra Som
Aritra Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।