মুঠোফোনেই দুনিয়া, প্রযুক্তির গ্রাসে কতটা ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ

Digitisation and Environment: পরিবেশের ওপর ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাব বেশ উদ্বেগজনক।

Tithi Roy
৩ মিনিট
মুঠোফোনেই দুনিয়া, প্রযুক্তির গ্রাসে কতটা ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ

আমাদের মুঠোফোন বা কম্পিউটার এখন ‘সব পেয়েছির দেশ’। ডিজিটাল যুগের এটাই হকিকত্। কাজকর্ম, পড়াশোনা, ঘুরতে যাওয়া, খাওয়া-দাওয়া, কেনাকাটা, সিনেমা দেখা- সবেতেই আমরা ইন্টারনেটের মুখাপেক্ষী। এছাড়াও আছে রকমারি সোশ্যাল মিডিয়ার হাতছানি। এ তো নয় গেল আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহার। তা বাদ দিলেও, পৃথিবীজোড়া ইন্ডাস্ট্রি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারি-বেসরকারি পরিষেবা, সবেতেই ডিজিটাল প্রযুক্তি অনিবার্য। আর ডিজিটাইজেশন মানেই গাদা গাদা তথ্য, তথ্যের মহাসমুদ্র। এই যে সোশ্যাল মিডিয়ায়, ইন্টারনেটে এত তথ্য- সেগুলো যায় কোথায়? সবটাই কি ভার্চুয়াল, অর্থাৎ পৃথিবীতে তাদের কোনও অস্তিত্ব নেই?

ব্যাপারখানা আমরা যতই ভার্চুয়াল বা অপার্থিব জগৎ হিসেবে ভাবি, বাস্তবে ছবিটা একেবারেই আলাদা। যে-কোনও ধরনের ডিজিটাল মিডিয়া, সার্চ ইঞ্জিন অথবা ইন্টারনেটে আমরা যে সমস্ত তথ্য আদান-প্রদান করি, সেই কাজ সম্পন্ন হয় ডেটা সেন্টার বা তথ্যভান্ডারের মধ্য দিয়ে। ইন্টারনেটের যাবতীয় তথ্য জমাও থাকে ওই ডেটা সেন্টার-এ। এই ডেটা সেন্টারগুলিতে কয়েক লক্ষ কম্পিউটার প্রসেসর অর্থাৎ কম্পিউটার চালনাকারী মূল যন্ত্রাংশ থরে থরে সাজানো থাকে। এই প্রসেসরগুলি সাধারণ কম্পিউটার বা ল্যাপটপের থেকে কয়েক লক্ষ গুণ উচ্চশক্তিসম্পন্ন এবং তারা অহর্নিশ কাজ করে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মহাকাশ থেকে ধেয়ে আসা বিপদ এড়াল নাসা-র অস্ত্র! যেভাবে বিলুপ্তি থেকে বাঁচল মানুষ

DART mission of NASA: নাসা মানবজাতির হতে তুলে দিয়েছে এমন এক অস্ত্র, যা ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে ডাইনোসরদের হাতে ছিল না।

এই কাজের জন্য বহুল পরিমাণে বৈদ্যুতিক শক্তির দরকার হয়। এছাড়াও, এই ক্ষমতাশালী যন্ত্রগুলিতে কাজের ফলে প্রচুর পরিমাণে তাপ উৎপন্ন হয়। সেই কারণে তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত বিদ্যুতের জোগান প্রয়োজন। বর্তমানে পৃথিবীর সবথেকে বড় ডেটা হলো সেন্টার চায়না টেলিকম-ইনার মঙ্গোলিয়া ইনফরমেশন পার্ক যার আয়তন ১০,৭৬৩,৯১০ স্কোয়ারফিট। অর্থাৎ, মধ্যবিত্ত একটি ফ্ল্যাট বা বাড়ির হাজার গুণ জায়গা নিয়ে রয়েছে এই ডেটা সেন্টার। এই ডেটা সেন্টারটির বৈদ্যুতিক ক্ষমতা ১৫০ মেগাওয়াট, যা আমাদের ব্যবহারিক ১০ ওয়াটের একটি বাল্বের লক্ষ গুণ বেশি। এই তথ্যগুলো থেকে আমরা আন্দাজ করতে পারি যে, একটি ডেটা সেন্টারের আয়তন এবং সেখানে ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমাণ কতটা বিপুল হতে পারে।

আমাদের দেশের ছবিটাও আলাদা নয়। ‘Financial Express’-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী ভারতে মোট ডেটা সেন্টারের সংখ্যা ১৩৮টি এবং ২০২৫-এ সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়াবে ১৮৩। একটি বাণিজ্যিক আবাসন সম্পর্কে পরামর্শদাতা কোম্পানি JLL-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২১ সালে ভারতে ডেটা সেন্টারগুলি দ্বারা ব্যবহৃত মোট বৈদ্যুতিক ক্ষমতা ৫৬৫ মেগাওয়াট। ওই রিপোর্টে আরও জানানো হয় যে, ২০২৪ সালে এই বৈদ্যুতিক ক্ষমতা হবে ১,৩৬৯ মেগাওয়াট। এর সঙ্গে যদি আমরা আমাদের ব্যক্তিগত কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ব্যবস্থার পরিকাঠামো-সহ সামগ্রিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার চিত্রটিকে দেখি, তবে দেখা যাবে যে, এই বৈদ্যুতিক চাহিদা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

ডেটা সেন্টার তথা সমগ্র ডিজিটাল প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের জোগান মূলত জীবাশ্ম জ্বালানির (কয়লা বা পেট্রোলিয়াম) ওপর নির্ভরশীল। এর ফলস্বরূপ, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে ব্যাপক হারে কার্বন (কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস) নিঃসৃত হচ্ছে। যা আদতে কার্বন নিঃসরণজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের যে সমস্যা, তাকে ত্বরাণ্বিত করচ্ছে। সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত ‘The Hindu’-র একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে সারা পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব-উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্যাসগুলির নিসঃরণের মোট পরিমাণের ৪% ঘটেছে শুধুমাত্র ডিজিটাইজেশনের কারণে। সাধারণত, বিমান পরিবহণ ব্যবস্থায় জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের দরুন বাতাসে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ সবথেকে বেশি। কিন্তু, উক্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে ডেটা সেন্টার কর্তৃক নিসৃঃত কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের পরিমাণ, সমগ্র বিমান পরিবহণ ব্যবস্থা দ্বারা কার্বন নিঃসরণের পরিমাণকে ছাপিয়ে গেছে। তাই, তাই ডিজিটাইজেশন মানেই ঝকঝকে, পরিষ্কার সবুজ ও দূষণমুক্ত একটি ভবিষ্যতে ধারণা একেবারেই ভ্রান্ত। বরং, প্রথাগত কলকারখানা, পরিবহণ ব্যবস্থার মতোই ডিজিটাল প্রযুক্তি বিশ্ব উষ্ণায়ণের জন্য দায়ী।

যদিও এই সমস্যার সমাধান হিসেবে এখন অনেক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা এবং ডেটা সেন্টারগুলি পুনর্বীকরণযোগ্য শক্তির উৎস থেকে তৈরি বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াচ্ছে, অথবা কার্বন নিঃসরণ প্রশমনে অন্যান্য পদ্ধতির সাহায্য নিচ্ছে। তবে, ক্রমবর্ধমান ‘ডিজিটাইজেশন’-এর সঙ্গে এই ধরনের বিদ্যুতের জোগান এখনও পাল্লা দিতে অক্ষম। এই ব্যর্থতা হয়তো ভবিষ্যতে মানবসভ্যতাকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ তৈরির দিকেই ঠেলে দেবে। ডেটা সেন্টার ও ডিজিটাল প্রযুক্তি-সংক্রান্ত বৈদ্যুতিক পরিকাঠামোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। অন্যদিকে, পরিবেশের ওপর ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাব বেশ উদ্বেগজনক। তাই বিষয়টির মূল্যায়ন অত্যন্ত সময়োচিত। নাহলে, ডিজিটাল প্রযুক্তি পরিবেশ রক্ষার অন্তরায় হয়ে উঠবেই।

লিখেছেন
Tithi Roy
Tithi Roy
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।