কলকাতার রাস্তায় ধুন্ধুমার ডুয়েল! হেস্টিংস-ফ্রান্সিসের টক্কর হার মানাবে সিনেমাকে

rudranjan
৩ মিনিট
কলকাতার রাস্তায় ধুন্ধুমার ডুয়েল! হেস্টিংস-ফ্রান্সিসের টক্কর হার মানাবে সিনেমাকে

আজ থেকে প্রায় আড়াশো বছর আগেকার কথা। ইংরেজ হুকুমতের মানদণ্ড তখন সবে সবে পরিণত হয়েছে রাজদণ্ডে। বাংলার গভর্নর জেনারেল পদে বেশ জাঁকিয়ে বসলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। সে সময়কার ইতিহাস বিষয়ে অবগতজন বিলক্ষণ জানেন, বজ্রকঠিন প্রশাসক হওয়ার পাশাপাশি হেস্টিংস সাহেবের গুণের অন্ত ছিল না। যেমন ধরা যাক ধ্রুপদী ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগ। ইংরেজ শাসনে সংস্কৃতের মূল্যায়ন যতটুকু হয়েছে, হেস্টিংসরই সৌজন্যে। বিলিতি পড়ুয়াদের তিনি সংস্কৃত পাঠে ভরপুর উৎসাহ দেন, এবং তাঁর সূত্র ধরেই ১৭৮৯ সালে উইলিয়াম জোন্স 'শকুন্তলা' অনুবাদ করেন ইংরেজিতে। ঠিক তার দু বছর পর, অর্থাৎ, ১৭৯১ সালে জর্জ ফস্টারের হাত ধরে কালিদাসের কাব্যখানা পৌঁছে যায় সুদূর জার্মানিতে, এবং গ্যেঠে তার সুধারস পান করে ভূয়সী প্রশংসা করেন। সংস্কৃতের মাধুর্যে এমনই মুগ্ধ হয়েছিলেন সাহেবরা যে ১৭৮৬ সালে এশিয়াটিক সোসাইটিতে একটি বক্তৃতা দিতে গিয়ে উইলিয়াম জোনস কবুল করেন, এ ভাষাকে তিনি গ্রিক এবং লাতিনেরও ঊর্দ্ধে রাখতে চান। তা যাই হোক, যে বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বের দৌলতে ভারতের এই ধ্রুপদী ভাষা পরম আদরে পৌঁছে গিয়েছিল ইংরেজদের দরবারে, তিনি কিন্তু চৌরাস্তার মোড়ে বন্দুকও ধরেছেন বীরবিক্রমে। সিনেমাও হার মানবে কলকাতার বুকে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনার কাছে।

বাংলায় তখন হেস্টিংসের প্রখর প্রতাপ। তিনি খান-দান, বাঁশি বাজান। মধ্যে মধ্যে সস্ত্রীক ইংরেজ খিদমতগারদের নিমন্ত্রণসভা আলো করে বসে থাকেন। কিন্তু, রাতের সব তারা যেমন থাকে দিনের আলোর গভীরে, তেমনই তাঁকে টেক্কা দিতে এক 'দুর্ধর্ষ দুশমন' নিঃশব্দে বেড়ে উঠছিলেন গোকুলে। নাম তাঁর ফিলিপ ফ্রান্সিস। অনেকেই জানেন, ইংরেজ সরকারের এই দুই অনুগত একে অন্যকে দু চক্ষে দেখতে পারতেন না। থেকে থেকেই কাজিয়া-কোন্দল লাগত। এর প্রধান কারণ ছিল, হেস্টিংসের কাজে ফিলিপ ফ্রান্সিসের নিয়ত হস্তক্ষেপ। যে চার সদস্যের কাউন্সিল থেকে থেকেই হেস্টিংসকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য করত, তার অন্যতম নেতা ছিলেন ফিলিপ ফ্রান্সিস। এর ফলে ফ্রান্সিস সাহেবের প্রতি অনেকদিন ধরেই হেস্টিংস মনে মনে রাগ পুষে রেখেছিলেন। অবশেষে গরমাগরম বাক্যবিনিময়ের পর ১৭৮০ সালের ১৫ অগাস্ট তিনি মোক্ষম চালখানা চেলে দিলেন।

এদিন বিলেতের উপরমহলে ফ্রান্সিসের বিরুদ্ধে একটি নোট পাঠান হেস্টিংস। অকথ্য কুৎসায় ভরা ছিল সেই অভিযোগপত্র। দিন কয়েক আগেই ম্যাডাম গ্রান্ডের সঙ্গে পরকীয়া করতে গিয়ে ধরা পড়ে তাঁর স্বামীর কাছে ফ্রান্সিসকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে যে হেস্টিংস আগাগোড়া 'আপন মনের মাধুরী মিশায়ে' কুৎসাকাব্য রচনা করেছিলেন, তা মনে করার কোনও কারণ নেই।

হেস্টিংসের চিঠির খবর চাপা থাকল না। অচিরেই তা ফ্রান্সিসের কানে গিয়ে পৌঁছল এবং ব্যাঘ্রগর্জনে তিনি হেস্টিংসকে জানালেন, 'অলরাইট কামেন ফাইট! কামেন ফাইট!' ঠিক হল দু'জনের মধ্যে ডুয়েল হবে। কলকাতার রাস্তায় সে সময় ডুয়েল খুব অস্বাভাবিক কোনও বিষয় নয়। বউ পরপুরুষের সঙ্গে ভেগেছে? লাগাও বন্দুকের খেল। হিকিসাহেবের কাগজ ঘাঁটলে এমন ঘটনার বেশ কিছু উদাহরণ পাওয়া যাবে। কিন্তু, হেস্টিংস ফ্রান্সিসের এই ডুয়েল উপাখ্যান ইংরেজ মহলের আনাচেকানাচে বর্ণিল তামাশার বিষয় হয়ে উঠেছিল।

বর্তমানে যেখানে আলিপুর ব্রিজ, তার পাশেই দু'জনের রণক্ষেত্র বাছা হল। ঠিক হল, এখানেই পরদিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় রানী ভিক্টরিয়ার দুই তাবড় কর্মচারীর জীবন মরণের ফয়সালা হবে। পরের দিন সময় মতো দুজনে পৌঁছলেন নির্ধারিত জায়গায়। ইলাইজা ইম্পের বাড়ির সামনের একটা বটগাছকে কেন্দ্র করে চোদ্দ পা তফাতে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর, 'ফায়ার'। দুটি বন্দুক থেকে গুলি ছুটল একই সময়, কিন্তু ফ্রান্সিস এক উইকেটও পেলেন না। বরং ওয়াইড বল করে বসলেন। গুলি বেরিয়ে গেল হেস্টিংসের শরীরের অনেকটা দূর দিয়ে। হেস্টিংস কিন্তু লক্ষভ্রষ্ট হননি। আগ্নেয় অস্ত্রবিদ্যায় আনাড়ি ফ্রান্সিসের শরীর তাঁর গুলির আঘাতে সেদিন মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন।

আঘাত যদিও গুরুতর ছিল না। তবু, আলপিন নয়, কাঠ পিঁপড়ে নয়, জলজ্যন্ত একটা গুলি তো। ফ্রান্সিসকে সাহায্য করতে ছুটে গেলেন হেস্টিংস। অনুশোচনায় মাথা নামিয়ে বললেন ফ্রান্সিস যদি কোনও ভাবে মারা যান, তবে তিনি সোজা শেরিফের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করবেন। ফ্রান্সিস সাহেব মুখে কিছু বলেননি ঠিকই, কিন্তু মনে মনে বলেছিলেন, 'এত আস্পর্ধা?' এরপর শুরু হল খেলার দ্বিতীয়ার্ধ। বিলেতে ফিরে হেস্টিংসের নামে মনের সুখে কুৎসা রটাতে লাগলেন ফিলিপ ফ্রান্সিস। অল্পদিনের মাথাতেই অনুষ্ঠিত হয় 'ইমপিচমেন্ট অফ ওয়ারেন হেস্টিংস'। যাঁর নামে নাকি এককালে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেত, তাঁর তখন 'শ্যাম রাখি না কূল রাখি' অবস্থা।

কলকাতার ডুয়েলবাজদের বাঙালি মনে রাখেনি। আজকের দিনেও আলিপুরের একপাশ দিয়ে 'ডুয়েল এভিনিউ' নামক একটা রাস্তা গেছে বটে, তবে তা দেখে কারুর বোঝার উপায় নেই যে এখানেই একসময় ঝলসে উঠেছিল দুটি সাহেবি ধাঁচের রিভলভার। শিহরণের স্মৃতি বিজড়িত সেই রাস্তার উপর আজ মল মাল্টিপ্লেক্সের কোলাহল। গল্পকথারা তবু থেকে যায়। ইতিহাসের দেওয়ালে দেওয়ালে 'ধূসর শূন্যের আজান গানের' মতো জমে তাদের জলছাপ।

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।