রোগীর ছুটি, নার্সের নয়! দিবারাত্র সেবার বদলে পুজোয় মেলে সামান্যতম নিরাপত্তা?

Durgapujo of Nurse: পুজোর রোস্টার আসতেই শুরু হয়ে যায় ছুটির দরখাস্তের পালা। কিন্তু যতই নিখুঁত করে চিঠি লেখা হোক না কেন হাসপাতালে বাতিল হয়ে আসে সেসব।

Piya Saha
৫ মিনিট
রোগীর ছুটি, নার্সের নয়! দিবারাত্র সেবার বদলে পুজোয় মেলে সামান্যতম নিরাপত্তা?

‘তোমাদের পুজো আমাদের নয়’। সত্যিই তো পুজো বলে তো আর পাঁচটা দিনের থেকে আলাদা নয় নার্সদের জীবন। বরং উৎসবের সন্ধ্যায় ঝকঝকে পাটভাঙা নতুন জামার বদলে গায়ে গলিয়ে নিতে হয় অনুজ্জ্বল পুরনো সাদা পোশাক। উৎসবের আমেজেও দুই হাত শুশ্রুষা দেয় মুমূর্ষু কোনও রোগীকে। পুজো আসে পুজো যায় কিন্তু এই ছবি বদলাতে দেখা যায় না। টেবিলে বসে বসে ছোটবেলার একগুচ্ছ স্মৃতি ভেসে আসে তখন। মনে পড়ে স্কুলছুটি, পুজোর ভিড়ে শহরের এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে প্রতিমা দর্শনের স্মৃতি, কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে দেদার আড্ডা, খাওয়া দাওয়া। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে হাত ওঠে স্যালাইনের বোতল বদলে দিতে। এভাবেই কাটে নার্সদের দুর্গাপুজোর রাতগুলো।

করোনা অতিমারির চোখরাঙানি কমতেই বাঙালি পুরনো ছন্দে ফের একবার গা ভাসিয়েছে দুর্গাপুজোর আনন্দে। উৎসবের আনন্দ দ্বিগুণ করেছে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি। অন্যদিকে হাওয়া অফিসের পূর্বাভাস বলছে পুজোর দিনগুলিতে বৃষ্টিতে ভাসবে কলকাতা। তাই আর ঘরে বসে অপেক্ষা করেনি বাঙালি। মহালয়ার দিন থেকেই বেরিয়ে পড়েছে প্রতিমা দর্শনে। তবে করোনা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ছুটি নেই নার্সদের। দিন রাত ডিউটি করে মানুষের সেবায় নিয়োজিত তাঁরা। পুজোর দিনগুলিতে যখন দেশ বিদেশের মানুষ ঘরে ফিরে আসে, পরিবার পরিজনদের সঙ্গে সময় কাটান তখন তাঁদের কাজে যোগ দিতে হয়। চিকিৎসা পরিষেবা স্বাভাবিক রাখতে ও মানুষকে যথাযোগ্য সেবা দিতে প্রস্তুত হন তাঁরা। কিন্তু পুজোর আনন্দ? পুজোর রোস্টার আসতেই শুরু হয়ে যায় ছুটির দরখাস্তের পালা। কিন্তু যতই নিখুঁত করে চিঠি লেখা হোক না কেন হাসপাতালে বাতিল হয়ে আসে সেসব। সুবিধামতো সহকর্মীদের সঙ্গে চলে ডিউটি ভাগ করে নেওয়ার কাজ। মান অভিমান, দিনরাতের খাটুনি এভাবেই চলতে থাকে দুর্গাপুজোর দিনগুলি। এ প্রসঙ্গে অশোকনগর স্টেট জেনারেল হাসপাতালের নার্স শ্বেতা কর জানালেন, “৬ ঘণ্টা, ৬ঘণ্টা মোট ১২ ঘণ্টার শিফটিং ডিউটি করতেই হয়। তবে আমাদের হাসপাতালে একটা ভালো ব্যাপার হল অন্য ধর্মের মানুষরা এক্ষেত্রে আমাদের সাহায্য করে। সহকর্মীদের অনেকে মুসলিম, খ্রিস্টান হওয়ায় তাঁরা নাইট ডিউটিগুলি করে দেন।” সকলেই দুর্গাপুজোয় নিজেদের মতো করে এগিয়ে আসেন সহকর্মীকে সাহায্য করতে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আফ্রিকায় বোধন দেবী দুর্গার! কীভাবে সম্ভব হলো?

Durgapuja in Masaimara: হঠাৎ সুদূর আফ্রিকায় মাসাইদের হাতে পুজো শুরুর কারণ কী?

কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত হাসপাতাল নীল রতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। হাসপাতালের অন্যতম ব্যস্ত ডিপার্টমেন্ট পুরুষদের সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে কর্মরত নার্স তিয়াষা কুণ্ডুর অবশ্য সে সুযোগ নেই। যখন গোটা কলকাতার মানুষ সারা রাত প্রতিমা দর্শনের আনন্দে মজে উঠবে তখন ষষ্ঠী, সপ্তমী ও অষ্টমীর রাত কাটবে হাসপাতালে। ছুটি বলতে নবমী আর দশমী। তাতেই মন ভরে যথাসম্ভব আনন্দ করবেন তিনি। কলকাতা কর্পোরেশনের ১০৪ নম্বর ওয়ার্ডের হেলথ সেন্টারে কর্মরত লিপিকা দে-র গলাতেও শোনা একই কথা। তাঁর কথায়, “পুজোর দিনগুলিতেও আউটডোর, আরটিপিসিআর সবই খোলা থাকে মানুষের জন্য। সকাল আটটা থেকে চারটে কাজ করে তারপর ঠাকুর দেখতে বেরোই পরিবারের সঙ্গে।” পার্ক সার্কাসের জেফার হাসপাতালে এক কর্মরত নার্সের কথায়, “পুজোতে কেউ কোনও ছুটি পায় না। নিজেদের মধ্যে ঠিক করে কাজ করতেই হবে। এবছর নবমীতে ২৪ ঘণ্টা ডিউটি রয়েছে।” তবে সাগরদিঘি হাসপাতালের ইনচার্জ নার্স মধুরিমা রায়চৌধুরীর জন্য এ বছর পুজো খানিকটা আলাদা। পুজোর ছুটি পেয়েছেন পুরোটা। তাই প্রথম থেকে শেষ দিন অবধি কাটাবেন পরিবারের সঙ্গে। তাঁর কথায়, “কোনও বছর এমন টানা ছুটি পাই না। এবার পুজোর আলাদা করে কোনও প্ল্যান নেই, যতটা সম্ভব বাড়িতে সময় কাটাব। ছেলে এবং স্বামীর সঙ্গে অবশ্যই সন্ধ্যেবেলা ঠাকুর দেখতে বেরোব।”

পুজো বলে তো আর হাসপাতাল বন্ধ দেওয়া যায় না বরং কাজের চাপ দ্বিগুণ হয়ে যায়। পুজোর দিনগুলিতে বেশিরভাগ হাসপাতালেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক থাকেন না। জুনিয়র ডাক্তার দিয়েই বেশিরভাগ কাজ সামলে নিতে নয়। এমনকি প্রাইভেট নার্সিংহোম এবং হাসপাতালের আউটডোর পরিষেবা বন্ধ থাকে ফলে সরকারি হাসপাতালগুলিতে রোগীর চাপ অনেক বেড়ে যায়। তাই পরিবার পরিজন অপেক্ষা করে থাকলেও নার্সদের হাত পা এক প্রকার বাঁধা। অশোকনগর হাসপাতালের নার্স শ্বেতার কথায়, “এই সময় রাতের দিক করে রোগী আসতেই থাকে। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সময় দুর্ঘটনা ঘটে। তাই নাইট ডিউটিই বেশি করে দেওয়া হয়। পুজোর দিনগুলি আলাদা কিছু নয়। নতুন জামা পরে কাজে যাই। গিয়ে সাদা পোশাক পরে নিই। ব্যাস! এভাবেই মানিয়ে নিয়েছি। এবছর শহরে যে হারে ডেঙ্গু বাড়ছে তাতে আলাদা করে পুজোর যে আনন্দ সেটা খুব অনুভব করছি না।” এনআরএস হাসপাতালের তিয়াষা কুণ্ডুর কথায়, “রাতের দিক করে প্রচুর অ্যাক্সিডেন্ট কেস। তাঁদের অনেকরই অবস্থা বেশ ক্রিটিক্যাল। অনেকে ক্ষেত্রে রোগীকে আনতেও দেরী হয়ে যায়। তবু এসময় চেষ্টা করি রোগীকে আনার সঙ্গে সঙ্গেই প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাঁচানোর। বাকি চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের অপেক্ষা করতেই হয়।”

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাগানের মাটিতে শিশুকন্যার অলীক পায়ের ছাপ! যেভাবে শুরু হল শিবপুরের রায়চৌধুরী বাড়ির পুজো

Durgapuja: রাজা রামব্রহ্ম রায়চৌধুরীর কন্যা প্রতিদিন বাড়ি সংলগ্ন বাগানে তাঁর বন্ধু পদ্মাবতীর সঙ্গে খেলত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, জমিদার বাড়ির কেউ পদ্মাবতীকে দেখেননি।

তবে এসময় নার্সদের যথাযোগ্য নিরাপত্তা থাকে না। ফলে অনেকক্ষেত্রেই পান থেকে চুন খসলেই রোগীর পরিবার চড়াও হয় হাসপাতালে। মধুরিমা রায়চৌধুরীর কথায়, “পুজোর দিনগুলিতে কিন্তু নার্সিং স্টাফদের হাসপাতালে থাকতেই হয়। ডাক্তারের সংখ্যা কম থাকায় রোগী এবং রোগীর পরিজনদের আমাদেরকেই সামলাতে হয়। আর এমার্জেন্সি কেসের ক্ষেত্রে পুজোর সময় বাইরে পরিষেবা বন্ধ থাকায় সকলেই সরকারি হাসপাতালগুলিতে ছুটে আসেন। মন মতো পরিষেবা না পেলেই ঝামেলা শুরু করেন। আমরা এতদিন ধরে যে পরিষেবা দিচ্ছি তা তো করবোই কিন্তু এই সময় নিরাপত্তা পাইনা একেবারেই। যে পরিমাণ সিকিউরিটি গার্ড থাকে তা পুরো হাসপাতালকে সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। জেলার হাসপাতালে এই সমস্যা খুব বেশি লক্ষ্য করা যায়। পুজোর সময় রোগীর আত্মীয়রা ঝামেলা করে এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা এখন আমাদের কাছে। পুজোর সময় কাজ করতে গিয়ে এই বড় একটা সমস্যার সম্মুখীন হই আমরা।”

করোনা কালে যখন গোটা দুনিয়া কাঁপছে তখনও পরিবার থেকে দূরে সমানভাবে পরিষেবা দিয়েছেন তাঁরা। কলকাতার কর্পোরেশনের নার্স লিপিকা দে-র কথায়, “ভয় ছিল ঠিকই কিন্তু সেভাবেই কাজ করতে হয়েছে। কাজ সেরে বাড়ি ফিরে ভালো মতো স্নান করে তারপর পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছি। তাই ভয় পেলেও জানতাম কাজটা করতেই হবে। পিছিয়ে আসার জায়গা নেই।” তবে সকলেই মেনে নিয়েছেন, পুজোতে যে দিনগুলি ছুটি থাকবে তাতে চেটেপুটে পুজোর আনন্দ উপভোগ করে নিতেই হবে। অনেকেই সন্তানের মুখ চেয়ে বেরিয়ে পড়েন প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে। আবার তো এক বছরের অপেক্ষা শুরু বাঙালির। তবে পেশার তাগিদে যে পুজোর ছুটিতে অন্যদের মতো ঠাকুর দেখা যাবে না একথা সকলেই নিজেকে বুঝিয়ে নিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে শ্বেতা জানিয়েছেন, “ট্রেনিংয়ের সময় থেকেই নিজেকে বুঝিয়ে নিয়েছি এ কথা যে পুজোর ছুটি পাব না।” সবাই মেনে নিয়েছেন, এই কাজ করতে গেলে তো পুজো দেখলে চলবে না! আগে রোগী তারপর সবকিছু। তবে তিয়াষার কথায়, “আক্ষেপ খানিক লাঘব পায় রোগীদের সুস্থ দেখলে। তাঁদের প্রাণ বাঁচাতে পারলে তখন মনে হয় রাত জাগাগুলো সার্থক।”

এমন নিস্বার্থ ভাবে মানুষের প্রাণ বাঁচানোর কাজ যারা করছেন, হাসপাতাল, পরিবার সামাল দিয়ে ওঠা এই নার্সদের সমাজ দশভুজারই প্রতিরূপ করে তুলেছে। সর্বসম্মতভাবে রোগীদের কল্যাণে নিজেদের উৎসর্গ করা এই দশভুজাদের পুজোনামচায় তাই উৎসব নেই, কেবলই কর্তব্য।

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।