পথের কাঁটা চিনেই সিঙ্গুর অস্ত্রে শান মমতার

Mamata Banerjee: মমতা জানেন সিপিএম, বিজেপি কেউই নয়, তার পথের কাঁটা হলেও হতে পারে জনরোষ। যে জনরোষ একদা তিনি তৈরি করতে পেরেছিলেন জমিকে সামনে রেখে।

Arka Deb
৪ মিনিট
পথের কাঁটা চিনেই সিঙ্গুর অস্ত্রে শান মমতার

জনস্মৃতি অতি-ক্ষীণ। দেড় দশক আগের কথা কে আর মনে রাখবে! অতএব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, টাটাকে তিনি নন, সিপিএম তাড়িয়েছিল।

সেদিন যে ছিল উদ্ধত যুবা, ঝড়ঝাপটা সয়ে আজ সে মধ্যবয়স্ক, তরীটা তীরের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে স্রেফ, রাগ তার পড়ে গেছে, জীবনটাকে সে মেনে নিয়েছে একপ্রকার, মানিয়ে নিয়েছে। আর সে ফোঁস করবে না। তাছাড়া প্রশ্ন করলেই তুমি হয়ে উঠতে পারো নগর-নকশাল। কে চায় ঝামেলা বাড়াতে, তার চেয়ে কনকলঙ্কা ডুবছে ডুবুক। নেতার যা ইচ্ছে বলুক। আপনি বাঁচলে পরের নাম! এই সুযোগেই নেতানেত্রীরা গল্পের গরু গাছে তোলেন। যেমন খুশি তেমন বলেন। ইতিহাস বিকৃত হয়, মানুষ বিভ্রান্ত হয় আকছার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের মধ্যে অন্যতম। রাজনীতিতে আসতে, মন্ত্রী হতে, জয়েন্ট এন্ট্রান্স দিতে হয় না, আসতে পারেন যে কেউ। আর বলতে পারেন যা খুশি তাই। এই স্বেচ্ছাচারের কোনও ঊর্ধ্বমাত্রা নেই। এই যে মিথ্যে কথা, আগলখোলা আজগুবি কথার পৃথিবী, একেই পোস্ট ট্রুথ বা উত্তর-সত্যর বিশ্ব বলে। এই বিশ্বের লাগাম রাজনৈতিক নেতাদের হাতেই। ডোনাল্ড ট্রাম্প, নরেন্দ্র মোদি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়- সবাই একই পথের পথিক।

উত্তর-সত্য সত্যর চেয়ে বেশি দামি। অনেকটা ফেক নিউজের মতোই তার গতি। দীপাবলির রাতের রকেটের মতো ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় আকাশে। ফলে মমতার এই টাটা উবাচ নিয়ে বাজার গরম। কে সি নাগের অঙ্কের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে বিষয়টা। এ ১৬ বছর আগে বন্ধু বি-এর সাহায্যে একটি কাজ করতে চেয়েছিল। সি সেই কাজে বাধা দেয়, লোক খ‍্যাপায়। এ কাজ বন্ধ করে জানিয়ে দেয় সি-এর জন্য কাজ হলো না। বি-ও বলতে থাকে সি-এর জন্য কাজ হলো না। ১৬ বছর পর সি বলছে কাজ হল না বি-এর জন্য। আসলে কাজ হলো না কার জন্য? এই ধাঁধার উত্তর লুকিয়ে আছে সময়ের গর্ভে, মানে এই ১৬ বছরে। অঙ্ক কষতে হবে এই সংখ্যাটাকে সামনে রেখেই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আসল সুভাষকে ভুলিয়ে দিতেই স্ট্যাচু নির্মাণ, কর্তব্যপথ খুঁজে নিন নেতাজিপ্রেমীরাই

Netaji Subhash Chandra Bose: গুজরাত হিংসার দিনে অন্তঃসত্ত্বা বিলকিস বানুকে যারা ধর্ষণ করেছিল স্বাধীনতার ৭৫ তম বর্ষে তারাই আজাদ! নেতাজি কি এই শৌর্য মানতেন, না কি গুঁড়িয়ে দিতেন?

এরই মধ্যে বামেদের শূন্য করে দিয়ে তিনবার ভোটে জিতেছেন মমতা। কেউ বলতেই পারেন, তিন মরশুম ক্ষমতার ভার বইতে পারা সহজ নয়। গদির সঙ্গে মমতার বোঝাপড়া ১৬ বছরে এতই অটুট হয়েছে যে, তিনি ভেবেছেন সত্যর থেকেও বড় তিনি, তাঁর উত্তর-সত্য। ফলে তিনি নিজের মতো করে একটি মনগড়া কথা বললেন। ঠিক যেমনটা বলেন নরেন্দ্র মোদি, একদা তাঁর একটি বক্তব্যে শুনেছিলাম, স্বামী বিবেকানন্দ জামশেদজি টাটাকে অনুরোধ করছেন, ভারতে মেক ইন ইন্ডিয়া করার জন্য। অথচ স্বামীজির জন্মের কয়েক বছরের মধ্যেই টাটার হাতে এই ব্যবসার গোড়াপত্তন। আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বিকৃত তথ্য পেশ করা কঠিন কাজ, মমতা-মোদিরা পারেন। নিরঙ্কুশ ক্ষমতা, স্তাবক-পারিষদদের সৌজন্যবাচক মৌনতার সুযোগে গান্ধীর অনশন ভঙ্গ করেন মৃত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু মমতা কি স্রেফ বলার জন্যই একথাটা বললেন?

মমতা জানেন সিপিএম, বিজেপি কেউই নয়, তার পথের কাঁটা হলেও হতে পারে জনরোষ। যে জনরোষ একদা তিনি তৈরি করতে পেরেছিলেন জমিকে সামনে রেখে। পাড়ায় পাড়ায় দেওয়াল লেখা হয়েছিল, বুদ্ধ আসছে জমি কাড়তে। আজ সেই রোষের আগুনের উত্তাপ সামান্য হলেও টের পাওয়া যাচ্ছে কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে। সারদা-নারদাও যে ভোটব্যাঙ্ককে ছুঁতে পারেনি, তাতে সর্পছিদ্র- কাজের অভাব, চাকরিপ্রার্থীদের অনশন, প্রশাসনিক দুর্নীতি। ঠিক এইখানেই, শান্ত হয়ে যাওয়া লোকগুলো বাসে-ট্রামে বলছে, বুদ্ধবাবু কিন্তু কাজের কথা বলেছিলেন, বলেছিলেন আমাদের রাজ্যের ছেলেদের বাইরে কাজ করতে যেতে হবে না। কিন্তু কাজ কই? 'শ্রী' দিয়ে আর কতকাল চলবে! একথা যেমন শহরাঞ্চলে হচ্ছে, তেমনই হচ্ছে গাঁ-গঞ্জে। অতএব একটি লাগসই কথা মমতাকে খুঁজতেই হতো। তাই তিনি টাটা বিদায় প্রসঙ্গে সিপিএম-এর ওপর দোষ চাপিয়ে দিলেন। তাঁর কথার নির্যাস এমনটাও হতে পারে যে, ভুল জমি বেছে এই নিয়তি ডেকে এনেছিল সিপিএম। কিন্তু সেক্ষেত্রেও মমতা হাত ধুয়ে ফেলতে পারবেন না। কারণ সিঙ্গুরের আজ পর্যন্ত কোনও সদগতিই করতে পারেননি তিনি। বালি, স্টোনচিপে ভরা জমিতে চাষ সম্ভব না। জমি পুনর্বন্টনও কার্যত অলীক স্বপ্ন। কোমর বরাবর উচ্চতার ঘাসজমিতে ভরা ব্যবহারের অযোগ্য জায়গা হয়ে পড়ে আছে একফালি স্বপ্নাঞ্চল।

এখানে নতুন প্রজন্মের স্বার্থে, উত্তর-সত্যকে রেয়াত না করার স্বার্থে বলে রাখা জরুরি, ২০০৬ সালের নির্বাচনে সিপিএম লড়াই-ই করেছিল শিল্পায়নে জোয়ারের প্রতিশ্রুতিতে। জয়ের কয়েকদিনের মধ্যেই সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণ শুরু করে সিপিএম। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পমন্ত্রী নিরূপম সেন সেই সময়ে তথ্য দিয়ে তুলে ধরেছিলেন বঙ্গদেশে ভূমিহীন কৃষক পশ্চিমবঙ্গে বাড়ছে, চাষযোগ্য জমি কমছে। শিল্পায়নের বার্তা দেওয়া হয় তখনই৷ ২৫ মে, ২০০৬, রাজ্য শিল্পোন্নয়ন নিগম এবং টাটা মোটরস জরিপের কাজে যান। কৃষিজমি রক্ষা কমিটি তৈরি হয় এই সময়েই। সিঙ্গুরের জমিতে মোটের ওপর সেসময় হেক্টর-প্রতি ধান উৎপাদন রাজ্যের গড় উৎপাদনের সমান ছিল। আলু উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিমাণ ছিল গড়ের চেয়েও বেশি। সিঙ্গুরে শিল্পায়ন প্রক্রিয়ায় ফাঁক ছিল একটাই। সিঙ্গুরের জমির মালিকরা বেশিরভাগই থাকতেন বাইরে। চাষ করতেন সিঙ্গুরের বাসিন্দা ভাগচাষিরা, বর্গাদাররা। এদের পরবর্তী প্রজন্ম অন্য শহরে কাজের খোঁজে গেলেও, আয় ছিল জমিনির্ভর। একদা পাট্টার প্রশ্নে এরা বামেদের ভোটব্যাঙ্ক হয়ে উঠলেও সিঙ্গুরে এরাই অস্তিত্বের সংকটে বামেদের বিরুদ্ধে যায়। মে-জুন থেকে আন্দোলন শুরু হয়। তক্কে তক্কে থাকার পর, অগাস্ট মাস থেকে ন্যাশানাল হাইওয়ে-র দখল নেন মমতা। আত্মপ্রত্যয়ী বুদ্ধদেব প্রথমে এই বিশৃঙ্খলাকে আমলই দেননি, প্রচার করতে থাকেন, মমতা উন্নয়নের গতি স্তব্ধ করছেন। অনেকে বলেন, বুদ্ধদেবের ভুল ছিল, তিনি সংগঠনকে কাজে লাগাননি। স্বয়ং জ্যোতি বসু প্রশ্ন তুলেছিলেন, সিঙ্গুরে কৃষক সভা নেই কেন। এদিকে এই সময়েই বিডিও অফিসে লাইট নিভিয়ে দেওয়ার ঘটনা মমতার পালে হাওয়া দেয়। বিনা বাধায় বিধানসভা ভাঙচুর হয় এই সময়। দেখা যায়, একটা সিপিএম-বিরোধী হাওয়া তৈরি হয়েছে। এই হাওয়াই নন্দীগ্রামে সালেম গোষ্ঠীর প্রকল্প-বিরোধিতায় নতুন ভরবেগ পায়। বিরোধিতার মধ্য দিয়ে উঠে আসেন মমতা।

উঠে তিনি এসেছেন। কিন্তু যাদের হাত ধরে এসেছেন, অনুদান বাদে তাদের কিছুই তিনি দিতে পারেননি। আজ তাই প্রশ্ন করছে গ্রহণে ক্লান্ত দ্বিধান্বিত সেই সমাজ। চাকরি কই? যোগ্য লোক কেন পথে বসে? এহেন অবস্থায় ইতিহাস গুলিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কী বা করার আছে সেদিনের জননেত্রীর?

লিখেছেন
Arka Deb
Arka Deb
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নিষিদ্ধ নয়, বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা, কী আছে ফিলিস্তিনপন্থী স্যালি রুনির বইয়ে

Sally Rooney: ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে রয়্যালটি দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশের পর ব্রিটেনে স্যালি রুনির বই সরবরাহ বন্ধ করেছে ফ্যাবার।

সিজেপির কর্মসূচির আগে ৬ হাজার পুলিশ, দুর্ভেদ্য দুর্গ কনট প্লেস

Connaught Place protest: সিজেপির কর্মসূচির আগে কনট প্লেস এবং তার আশপাশের এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে দিল্লি পুলিশ। কনট প্লেসের আশপাশে ৬ হাজারেরও বেশি পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?