নীল-সবুজে মোড়া পাহাড়ের কোলে ছোট্ট শহর কুন্নুর

By: Anasuya Sen

August 4, 2021

Share

ছবি সৌজন্যে : লেখক | কুন্নুর উপত্যকার দৃশ্য

সালটা ২০১৯, নভেম্বর মাস, তখনও আমাদের দেশে এসে পৌঁছয়নি করোনা মহামারী | সেই সময় সকলে নিশ্চিন্তে, মনের আনন্দে পরিবারকে নিয়ে ঘুরতে যেতেন | ঘোরার পিছনে কোনও ভয় থাকতো না, ছিল না এত ধরণের নিয়ম শৃঙ্খলা, মাস্ক পড়া | ২০১৯ সালটা পেরোনোর পরে পরেই ২০২০ সালের শুরুর দিক থেকেই মানুষের জীবন-যাপন পাল্টে গেল | বাঁধা পড়ল সমস্ত জায়গায় যাওয়া আসা | তবে ২০২১ সালের মাঝা মাঝি থেকে আবার মানুষ আগের ছন্দে ফিরছে ঠিকই, কিন্তু পিছনে থাকছে প্রচুর নিয়ম যা মেনে চলতে হচ্ছে সকলকে | এমনকি অনেকে এখনও অবধি ভয় পাচ্ছেন বেড়োতে | তাই সব মিলিয়ে বলা যায়, আগে যেই ভাবে মানুষ চলা-ফেরা করতেন সেখানে অনেকটাই বদল এসেছে | যাই হোক এবার আসা যাক আজ যে বিষয় নিয়ে আমি লিখতে বসেছি |

 

২০১৯-এর দুর্গাপুজোর সময় হটাৎ আমার দাদাকে বললাম পাহাড়ি জায়গায় আমাকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার জন্য | তবে যেখানে বেশি ভিড় হয় সেই সব জায়গায় যাবো না, কারণ আমার একটু ফাঁকা জায়গাই পছন্দ | ভিড়ের মধ্যে ঘুরে সেই আনন্দ পাওয়া যায়না যা বেশ ফাঁকা নিরিবিলি জায়গায় পাওয়া যায় | দাদা আমার কথা রাখলো এবং বলল যে পুজোর পর একটা খুব সুন্দর পাহাড়ি জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যাবে | সেই মতোই পুজো শেষ হতে ভাইফোঁটার সময় আমি ও মা রওনা হলাম চেন্নাইয়ের উদ্দেশ্যে | কারণ চেন্নাইয়ে থাকে আমার দাদা | চেন্নাইয়ে পৌঁছে সেখানে একদিন থেকে পরের দিন আমি,দাদা ও মা রওনা হলাম সেই সুন্দর পাহাড়ি জায়গাটির উদ্দেশ্যে | আর সেই জায়গাটি হলো “কুন্নুর” | তামিল নাড়ুর নীলগিরি জেলায় |

ছবি সৌজন্যে : লেখক | কুন্নুর উপত্যকার দৃশ্য

রাতের ট্রেনে চেন্নাই থেকে রওনা দিলাম সকলে | পরের দিন ভোরে পৌঁছলাম মেট্টুপালায়াম স্টেশনে | চেন্নাই থেকে মেট্টুপালায়াম ট্রেনে খুব বেশি হলে ৯-১০ ঘন্টার দূরত্ব | মেট্টুপালায়াম স্টেশনে নেমে গাড়ি নিয়ে রওনা হলাম কুন্নুরের দিকে | প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘন্টা সময় লাগলো কুন্নুর যেতে | কারণ বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তা বদল করে আমাদের যেতে হয়েছিল | কথা ছিল ‘টয় ট্রেনে’ করে কুন্নুর যাব কিন্তু বৃষ্টি হওয়ার কারণে ‘টয় ট্রেন’ বন্ধ করে দেওয়া হয় | অগত্যা গাড়ি করেই আমাদের পৌঁছতে হয় কুন্নুরে | কুন্নুর যাওয়ার পথটা ছিল অসাধারণ, চারিদিকে গাছ-পালা, পাহাড়ি রাস্তা, কুয়াশাতে ভরে গেছে, তার উপর বৃষ্টি হচ্ছে | আনন্দ হচ্ছিলো খুবই তবে পাশাপাশি ভয়ও করছিল একটু | পাহাড়ি রাস্তায় বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি করে যাওয়া খুবই রিস্ক | যাই হোক পাহাড়ি দৃশ্য, মেঘ, সাথে বৃষ্টি সবকিছুকে একসঙ্গে নিয়েই পৌঁছে গেলাম কুন্নুরে |

ছবি সৌজন্যে : লেখক | কুন্নুর উপত্যকার দৃশ্য

কুন্নুরে নেমেই আমার চোখটা তৃপ্তিতে ভরে গেল | চারিদিকে মেঘ ভেসে যাচ্ছে, সে যেন এক অপরূপ স্বর্গীয় দৃশ্য | কুন্নুরে আমরা যে রিসোর্টটায় ছিলাম সেটা ছিল একদম পাহাড়ের কোলে | নাম ‘বেল্লা ভিস্তা’ | ভীষণ সুন্দর একটি রিসোর্ট | রিসোর্টটার উল্টো দিকেই পাহাড় | চারিদিকে মেঘ ভেসে যাচ্ছে | নীল আকাশের মধ্যে সাদা মেঘ ও চারিদিকে সুবুজ গাছ-পালা, মন ভরে যাওয়ার মতো একটি জায়গা | দুপুর ১টা নাগাদ ফ্রেশ হয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম ঐ ছোট্ট শহরটির আনাচে-কানাচে ঘুরতে | প্রথমে গেলাম কুন্নুরের ‘সিমস পার্কে’ | 

ছবি সৌজন্যে : লেখক | কুন্নুর উপত্যকার দৃশ্য

নানা ধরণের গাছ ও ফুলে মোড়া ওই পার্কটি | এত ধরণের ফুলের গাছ ডিজাইন করে সাজানো, তা আগে কোনদিন আমি দেখিনি | বিশাল জায়গা নিয়ে তৈরী করা হয়েছে ওই পার্কটি | জায়গাটি একটু ঢালু তাই ধীরে ধীরে নামতে হয় | সুন্দর ভাবে রাস্তা তৈরী করা আছে | একদম নিচে নামলে সেখানে বোটিং করারও জায়গা আছে | অনেকেই বোটিং করছিলেন তবে আমরা আর করিনি | প্রায় ২ঘন্টার কাছা-কাছি লেগে যাবে পুরো পার্কটি ভাল করে ঘুরে দেখতে |

ছবি সৌজন্যে : লেখক | কুন্নুর উপত্যকার দৃশ্য

সিমস পার্ক থেকে আমরা গেলাম কুন্নুরের ডলফিন নোসে | সেখানে গিয়ে আপনার চোখ অবশই মুগ্ধ হয়ে যাবে | মনে হবে যেন স্বর্গে পৌঁছে গেছি | ভীষণ সুন্দর একটি জায়গা | মুখের সামনে দিয়ে ভেসে যাচ্ছে সাদা মেঘ | এক অদ্ভুত দৃশ্য | তবে হ্যাঁ এই জায়গায় গিয়ে একটু সাবধান, প্রচুর ছোট ছোট বাঁদর রয়েছে, মানুষের হাতে কিছু দেখেলেই কেড়ে নিয়ে পালায় | যারা ছবি তুলতে ভালবাসেন তাদের জন্য একদম পারফেক্ট জায়গা | অসাধারণ বেশ কিচু মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করা যাবে | ডলফিন নোসের উল্টো দিকেই একটি ভীষণ সুন্দর ঝর্ণা আছে, যা মুগ্ধ করবে সকলের চোখ | পাশাপাশি ওই জায়গা থেকেই দেখা মেলে  কোদাইকানালের | মেট্টুপালায়াম থেকে কুন্নুর যাওয়ার টয় ট্রেনটিকে বলা হয় কুন্নুরের হেরিটেজ ট্রেন | সেটি হ’ল লাইট ব্যাকড্রপস এবং সেতুগুলির মধ্য দিয়ে একটি স্লো-মোশন টয় ট্রেন যা উচ্চ উচ্চতায় রোলার-কোস্টার রাইডকে চিত্রিত করে |

ছবি সৌজন্যে : লেখক | কুন্নুর উপত্যকার দৃশ্য

উনিশ শতকের যুগে চা এবং কফি পরিবহনের মাধ্যম এই হেরিটেজ ট্রেনটির পরিষেবা শুরু হয় | এই টয় ট্রেনের যাত্রাটা অনেকটা শামুকের গতির মতো, ঘন্টায় ৬০কিলোমিটার বেগে এই ট্রেন চলে | বিস্তীর্ণ এলাকা জোড়া চা-বাগান এবং মেঘ ও কুয়াশার রহস্যে মোড়া পাহাড়ি পথের উপর দিয়ে এই ট্রেন যাত্রা করে | জায়গাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বলিউডের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ভীষণ ভাবে আকর্ষণ করে | শাহরুখ খান ও মালাইকা অরোরা খান অভিনীত ‘দিল সে’ ছবির মধ্যে ‘চল ছাইয়া ছাইয়া’ গানের সিকোয়েন্সটির শুটিং এই খানেই হয়েছিল |

এছাড়াও কুন্নুরে দেখার মতো রয়েছে, সেন্ট জর্জ চার্চ, লস ফলস, রাল্লীয়া দাম, লাদি ক্যানিন সিট্, রয়েছে, কেটটি ভ্যালি, ল্যাম্বস রক, ওয়েলিংটন স্টেশন, হিডেন ভ্যালি সহ আরও কিছু জায়গা |

কুন্নুরে বেড়াতে যাওয়ার আনন্দ এতটাই গভীর, যে সেখানে যিনিই যাবেন তাকে কুন্নুর বারবার আকর্ষণ করবে |

 

কীভাবে যাবেন?

হাওড়া বা শিয়ালদাহ স্টেশন থেকে থেকে চেন্নাই বা দমদম বিমানবন্দর থেকেও চেন্নাই যেতে পারেন | তারপর চেন্নাইয়ের সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে রাতের ট্রেনে মেট্টুপালায়াম | মেট্টুপালায়াম-এ নেমে গাড়ি বা টয় ট্রেনে করে সোজা কুন্নুর |

ছবি সৌজন্যে : লেখক | কুন্নুর উপত্যকার দৃশ্য

পঞ্চাশ বছরেরও পুরোনো কুন্নুরের এই হাইফিল্ড চা কারখানাটি | এই চা কারখানাটিতে নীলগিরির  পর্বতমালার সংলগ্ন চা বাগানের নতুন এবং সুন্দর চা পাতা ব্যবহার করে | চা ছাড়াও, সেখানে বিখ্যাত ইউক্যালিপটাস তেল | পাশাপাশি ওই কারখানার কর্মীরা বিভিন্ন ধরণের চকোলেটও বানিয়ে থাকেন | অনেকেই সেখান থেকে কেনাকাটি করে থাকেন | এখানে লাল এবং সবুজ চা-এর বৈচিত্রও খুঁজে পাবেন | তবে বর্ষার সময় এই জায়গাটি দেখার পরামর্শ দেওয়া হয় না |

More Articles

error: Content is protected !!