গর্তেশ্বরী থেকে লোটাদেবীর মন্দির, যে ইতিহাস ছড়িয়ে তরাইয়ের আনাচে কানাচে

Temples of Jalpaiguri: তরাইয়ের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন লোকায়ত মন্দির। এইসব মন্দির গুলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিচিত্র সব ইতিহাস।

Sindhu Som
২ মিনিট
গর্তেশ্বরী থেকে লোটাদেবীর মন্দির, যে ইতিহাস ছড়িয়ে তরাইয়ের আনাচে কানাচে

জলপাইগুড়ি জেলার এক দীর্ঘ অংশ বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন। এই অঞ্চলে দেশভাগ নিয়ে যেমন গভীর ক্ষত রয়েছে, আবার তেমনই তরাইয়ের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন লোকায়ত মন্দির। এইসব মন্দির গুলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিচিত্র সব ইতিহাস। আসুন, এক ঝলক নজর রাখি তেমন পাঁচটি মন্দিরে─

ধাপচণ্ডী

জলপাইগুড়ি শহর থেকে হলদিবাড়ি যাওয়ার রাস্তায় পড়ে ধাপগঞ্জ। রাস্তার দু'পাশে বাজার। এ'খানকার মিষ্টি বেশ বিখ্যাত। এই অঞ্চলেই বিরাজমান ধাপচণ্ডী। রাস্তা থেকে ধাপে ধাপে উঁচু ঢিপির উপরে উঠতে হয় বলেই হয়তো এই নামকরণ। এই দেবী চণ্ডীর প্রতীক একটি কষ্টিপাথর। শিবমন্দির ও কালীমন্দিরও রয়েছে পাশে। রথযাত্রাও পালিত হয় এ'খানে। চারুচন্দ্র সান্যাল লিখেছেন, “শোনা যায়, হুসেন শাহ যখন বৈকুণ্ঠপুর আক্রমণ করেন ধাপচণ্ডীর মন্দিরটি তখন মুসলমান সেনাদের হাতে ধ্বংস হয়েছিল।"

গর্তেশ্বরী পীঠ

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বোদাগঞ্জ থেকে মেটেলি, ডুয়ার্স ভ্রমণে যে ঐতিহাসিক মন্দিরগুলি দেখতেই হবে

Historical Temples of Dooars: বিগ্রহের নাম পেটকাটি মাতা। বিগ্রহটি একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর। কালো পাথরে তৈরি মূর্তিটি আসলে বজ্রযানী বৌদ্ধ দেবী 'চচিকা'।

জলপাইগুড়ি-হলদিবাড়ি-মানিকগঞ্জ-সাতকুরা হয়ে পৌঁছবেন গর্তেশ্বরী মন্দিরে। জলপাইগুড়ি শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৪০ কিমি। সবথেকে অদ্ভুত ব্যাপার, মন্দির সংলগ্ন জমির ১৬.৫ বর্গমাইল বাংলাদেশ। যাকে বলে অ্যাডভার্স ল্যান্ড। কিন্তু মন্দিরটি ভারতেই। র‍্যাডক্লিফের রেখা তাকে ছুঁতে পারেনি। অনেকের বিশ্বাস মায়ের মন্দিরের জন্যেই দক্ষিণ বেরুবাড়ির অধিবাসীরা আজও সুরক্ষিত। এর তিনদিকে বাংলাদেশ। কিন্তু কে এই গর্ভেশ্বরী বা গর্তেশ্বরী দেবী? বৈকুণ্ঠপুর রাজ এস্টেটের নথিপত্র ঘেঁটে গবেষক উমেশ শর্মা দেখিয়েছেন, যে সেখানে এই দেবীর নাম গর্ভেশ্বরী। আবার দীর্ঘদিন মাটিচাপা অবস্থায় ছিল বিগ্রহটি। তাই এঁর আরেক নাম গর্তেশ্বরী। বলা হয়, দেবীর বামপদ এখানে পতিত হয়েছিল। তাই এ'টি সিদ্ধপীঠ। কষ্টিপাথরের চতুর্ভূজা দেবী বিগ্রহ। লম্বোদর গজাননের বাঁ কাঁধে দেবী বাম পা রেখেছেন। গনেশ একটি পদ্মের উপর দাঁড়িয়ে। হাতে গদাদি আয়ুধ। গনেশের পায়ের কাছে কালী ও যক্ষিণী মূর্তি।

জুড়াবান্ধা ঠাকুর

মোহিতনগর রেল ঘুমটি থেকে মন্থনীগামী রাস্তায় পড়ে চেচাপাড়া। এ'খানেই রয়েছে জুড়াবান্ধা ঠাকুরের মন্দির। মন্দিরের বিগ্রহটি মহাদেবের। একটি হাত বরাভয়ের মুদ্রায় উত্তলিত। সংলগ্ন বটগাছে অনেকেই মনস্কামনা পূর্ণ করার জন্য ঢেলা বেঁধে রাখেন। স্থানীয় ভাষায় এই ঢেলাকেই জুড়া বলা হয়। তাই ঠাকুরের নাম জুড়াবান্ধা ঠাকুর। এই মূর্তিটির সঙ্গে দীর্ঘ ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। পাশের নদীটির নাম মুখে মুখে জুড়াপানি। একটু এগোলেই জুড়াবান্ধা হাট। আলিপুরদুয়ারের এবং কোচবিহারের মাসান ঠাকুরের ছাপ বিগ্রহটিতে লক্ষ করা যায়।

গৌরীহাটের মদনমোহন ঠাকুর

গোড়ীহাটের পুবদিকে বিরাট এলাকা জুড়ে রয়েছে মদনমোহন মন্দিরটি। কোচবিহার ঘরানায় শঙ্করদেবের বৈষ্ণবধর্ম মতে বৈকুণ্ঠপুরেও রাধাহীন কৃষ্ণভজনা শুরু হয়েছিল। এই বিগ্রহটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বৈকুণ্ঠপুর এস্টেটের প্রসন্নদেব রায়কত। রাজবাড়ির নঠি বলছে, গৌরীহাটের প্রাচীন নাম রানিগঞ্জের হাট। পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে করলা। করলা এখানে উত্তরস্রোতা। এই জল গঙ্গাজল হিসেবেও সমাদৃত। ১৯০০ সালে রানিগঞ্জ হাটের উত্তরাস্রোত থেকে তীর্থবারি সংগ্রহ করা হয়েছিল। জলপালিয়া গোষ্ঠী সেই কাজে নিযুক্ত হয়েছিলেন। এই জলপালিয়া গোষ্ঠী থেকেই অঞ্চলটির নাম হয় জলপাইগুড়ি।

লোটাদেবীর মন্দির

আসাম মোড় ও মোহিতনগরের উপকণ্ঠে করলাপারে লোটাদেবীর মন্দির। মুখে মুখে প্রচলিত, দেশভাগের আগে কোনও ভক্ত যদি লোটাদেবীর মন্দিরে পুজো দিয়ে বিবাহাদি অনুষ্ঠানের বাসনকোসনের জন্য মায়ের কাছে মানত করতেন, তবে প্রদিন নাকি লোটাদিঘির পাড়ে সত্যি বাসন কোসন পাওয়া যেত। কাজের শেষে সে সব বাসন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সন্ধেবেলা মায়ের থানে রেখে দিলে তা আবার দিঘির তলায় তলিয়ে যেত। এখনও ফাল্গুন মাসে লোটাদেবীর মন্দিরে পুজো হয়, মানত চলে। মেলায় প্রচণ্ড ভিড় হয় এইসময়।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।