চার চাকার সাইকেল! বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা এই ইলেকট্রিক যান মন কাড়ছে গাড়িপ্রেমীদের

২০১৯ সালের কেন্দ্রীয় অর্থ বাজেটে ইলেকট্রিক গাড়ির ওপরে জিএসটি ছাড় দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন ভারতের বর্তমান অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। জিএসটি-র হার ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে একেবারে ৫ শতাংশ করা হবে বলে ঘোষণা করেছিলেন তিনি। এই ঘোষণা কার্যকর হওয়ার পর থেকেই ভারতের বাজারে ইলেকট্রিক গাড়ির প্রচলন ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছিল। তার ওপর করোনাভাইরাস অতিমারী আসার ফলে মানুষ অনেকটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল বাইক কিংবা স্কুটি-র ওপর।

তার ওপরে আবার ভারতীয় বাজারে জ্বালানির অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি। এই সবকিছুই যেন একসঙ্গে মিলে পথ প্রশস্ত করেছিল বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের। অন্যদিকে ভারতে ইলেকট্রিক গাড়ি প্রচলনের দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে মোদি সরকার। একের পর এক প্রকল্প ঘোষণা করে জনসাধারণের কাছে ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করছে ইলেকট্রিক গাড়িকে। গাড়ি কিনতে গেলে সাধারণ মানুষ সেই পেট্রোল এবং ডিজেলের দিকেই ঝুঁকলেও, অনেকেই এমন রয়েছেন, যাঁরা ইনোভেটিভ ইলেকট্রিক গাড়ি কিনতে পছন্দ করে থাকেন।

আর এবার ভারতের সেই ইনোভেটিভ ইলেকট্রিক গাড়ির ক্রেতাদের জন্যই নতুন করে সুখবর নিয়ে আসছে সুইজারল্যান্ডের ইলেকট্রিক আরবান মোবিলিটি কোম্পানি মাইক্রো মোবিলিটি। এই গাড়িটি আদতে একটি বাবল কার। পশ্চিম বিশ্বে এই মুহূর্তে বাবল কার কনসেপ্ট অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও ভারতের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি খুব একটা প্রচলিত নয়। আদতে এই ধরনের গাড়ি হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি গাড়ি, যা শুধুমাত্র শহরের রাস্তার মধ্যেই চলতে পারে।

আরও পড়ুন: অ্যাম্বাসাডর ফিরছে ইলেকট্রিক স্কুটার হয়ে! কেমন হতে চলেছে নয়া এই যান?

বিদেশের রাস্তা ভালো হওয়ার দরুন এই ধরনের গাড়ি খুব সহজেই জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। তবে ভারতের ক্ষেত্রে ছবিটা একটু অন্যরকম। পেট্রোল এবং ডিজেলচালিত বাবল কার ভারতে তৈরি হয় না। কিন্তু ইলেকট্রিক গাড়ির পক্ষে অনেককিছুই সম্ভব। তাই সেই অসম্ভবকে সম্ভব করতেই বাবল কার কনসেপ্ট নিয়ে একটি ইলেকট্রিক ভেহিকেল মার্কেটে লঞ্চ হয়ে গেল নতুন মাইক্রো ইলেকট্রিক গাড়ি মাইক্রোলিনো (Microlino)। সুইজারল্যান্ডের কোম্পানির তৈরি এই ছোট্ট ইলেকট্রিক গাড়িটি এই মুহূর্তে ইলেকট্রিক গাড়ির মার্কেটে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এই গাড়িটি আকারে হবে অত্যন্ত ছোট। কিছু কিছু অটোমোবাইল মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, এই গাড়ি নাকি আকারে রতন টাটার তৈরি টাটা ন্যানোর থেকেও ছোট হবে এবং একবার চার্জ দিলে ২৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারবে এই মাইক্রোলিনো।

বাজারে আসার আগেই ৩০,০০০ বুকিং
আকৃতিতে একটি ছোট গাড়ির মতো দেখতে হলেও কোম্পানির তরফ থেকে কখনওই এটিকে গাড়ি বলে দাবি করা হচ্ছে না। কোম্পানি প্রথম থেকেই জানাচ্ছে, এটি একটি চার চাকার ইলেকট্রিক বাহন এবং এর সঙ্গে গাড়ির তেমন কোনও সম্পর্ক নেই। কিছু মোবাইল বিশেষজ্ঞ আবার বলছেন, এটি নাকি একটি স্কুটার কার। সঙ্গেই, এটি হতে চলেছে বিশ্বের সবথেকে সস্তা চার চাকার ইলেকট্রিক বাহন। তবে, আকৃতিতে যাই-ই হোক না কেন, ইতিমধ্যেই ইভি মার্কেটে ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলে দিয়েছে এই ছোট্ট গাড়ি। লঞ্চ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় ৩০,০০০ রিজার্ভেশন হয়ে গিয়েছে এই গাড়ির।

ভবিষ্যৎ-উপযোগী ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট
কোম্পানির তরফ থেকে জানানো হয়েছে, এই গাড়িতে একটি ভবিষ্যৎ-উপযোগী একেবারে ইনোভেটিভ ডিজাইন থাকবে এবং ২ সিটার একটি কেবিন থাকবে, যেখানে দু'টি ডিজিটাল ডিসপ্লে দেওয়া হবে যাত্রীদের জন্য। এই গাড়ি প্রোডাকশন ভার্সনের সর্বাধিক গতি হবে মোটামুটি ৯০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা এবং থাকবে একটি ১১,০০০ ওয়াটের শক্তিশালী মোটর। এই মোটর সর্বাধিক ১০০ ন্যানোমিটার টর্ক জেনারেট করতে পারবে এবং মাত্র ৫ সেকেন্ডের মধ্যেই ০ থেকে ৫০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টার গতি অর্জন করতে সক্ষম হবে।

  1. বাইক না কি গাড়ি, কী আসলে এই মাইক্রোলিনো?
    মাইক্রোলিনো আসলে একটি সুইস ডিজাইন মাইক্রো ইলেকট্রিক গাড়ি। তবে এটি প্রকৃতপক্ষে একটি গাড়ি নয়, বরং গাড়ি এবং মোটরবাইকের মধ্যবর্তী একটি অবস্থা। এই মাইক্রোলিনো ইঞ্জিনের দিক থেকে একটি স্কুটারের মতো এবং আকারের দিক থেকে একটি ছোট গাড়ির মতো। দেখে মনে হতেই পারে, বাইকের ওপরে কেউ একটি গাড়ির আচ্ছাদন দিয়ে দিয়েছে। তবে মানুষজন বসার জায়গার পাশাপাশি এখানে ২৩০ লিটারের স্টোরেজ স্পেসও দেওয়া হয়েছে জিনিসপত্র রাখার জন্য।

এই গাড়িকে আপনি কখনও একটি সাধারণ গাড়ির সঙ্গে তুলনা করতে পারবেন না। এই গাড়িতে দেওয়া হয়েছে দু'টি দরজা যা সামনের দিকে খুলে আসে। ভেতরে রয়েছে একটি ডবল সিটের কেবিন। এই গাড়ির হেডলাইটগুলি দুই পাশে লাগানো এবং দুই দিকে রয়েছে বড় বড় দু'টি জানলা এবং কালো রঙের চাকা।

রিমুভেবল সানরুফ এবং ৩ স্পোক স্টিয়ারিং হুইল
মাইক্রোলিনো ইলেকট্রিক বাবল গাড়িতে ব্যবহার করা হয়েছে একটি খুবই সহজসরল ডিজাইনের ২ সিটার কেবিন এবং একটি রিমুভেবল সানরুফ। একটি অ্যালুমিনিয়াম হ্যান্ডেল বারের মাধ্যমে খুব সহজে এই সানরুফ খোলা যাবে। এছাড়াও থাকবে একটি ৩ স্পোক স্টিয়ারিং হুইল এবং ডিজিটাল ইন্সট্রুমেন্ট ক্লাস্টার। এই গাড়িতে ব্যবহার করা হবে ডিজিটাল টাচস্ক্রিন প্যানেল এবং ক্লাইমেট কন্ট্রোলের মতো বিশেষ কিছু ফাংশনালিটি। ওভার দি এয়ার আপডেট পাওয়া যাবে এই দু'টি প্যানেলেই।

কত কিলোমিটার রেঞ্জ দেবে এই গাড়ি?
এটির ওজন মাত্র ৫৩৫ কিলোগ্রাম এবং ২৩০ কিলোমিটারের রেঞ্জ দিতে পারবে এই মাইক্রোলিনো। আকারে টাটা ন্যানোর থেকে ছোট হলেও, অনেকাংশে টাটা ন্যানোর থেকে ভালো এই ছোট্ট মাইক্রোলিনো। আসল মজার কথা হলো, ৯০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারবে এই ছোট্ট গাড়িটি। যদিও এর বেস মডেলের রেঞ্জ মাত্র ১১৫ কিলোমিটার। যদি আপনারা শহরের রাস্তায় ভালোভাবে চালাতে পারেন, তাহলে এক দিন চার্জ দিলে প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত চলবে এই মাইক্রোলিনো।

আসলে কি এটি চার চাকার সাইকেল?
এই মাইক্রোলিনো হলো ইউরোপের ক্লাস L7e ক্যাটেগরির একটি যান। এই ক্যাটেগরি সাধারণত ব্যবহার করা হয় সাইকেলের জন্য। অর্থাৎ, সেদিক থেকে দেখতে গেলে, মাইক্রোলিনো এটি চার চাকার সাইকেল হতে পারে। যদিও এটিকে ডিজাইন করা হয়েছে একটি কোম্পানির গাড়ির মতো। এতে ব্যবহার করা হয়েছে এটি ইউনিবডি চ্যাসি, একটি ছোট ব্যাটারি এবং নামমাত্র কার্বন ফুটপ্রিন্ট। এর ৯০ শতাংশ উপাদান তৈরি হয়েছে ইউরোপে।

কত দাম হবে এই EV MICROLINO-র?
ইতিমধ্যেই ৩০ হাজারের বেশি বুকিং হয়ে গিয়েছে এই নতুন মাইক্রো গাড়ির। প্রাথমিকভাবে সুইজারল্যান্ডে ১৫,৩৪০ ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১২ লক্ষ টাকা) মূল্যে পাওয়া যেতে চলেছে এই নতুন মাইক্রোলিনো। ইউরোপে যখন এই গাড়িটি আসবে, তখন দাম রাখা হবে ১৩,৪০০ ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ১০.৫ লক্ষ টাকা)। সুইজারল্যান্ডের ক্রেতাদের জন্য এই বছরের গ্রীষ্মকাল থেকেই ডেলিভারি শুরু হবে এই গাড়ির। অন্যদিকে, ইউরোপের অন্যান্য দেশে গাড়িটির বিক্রি শুরু হবে আর কিছুদিন পর থেকে। ইতালির তুরিনে এই গাড়ি তৈরি করবে কোম্পানিটি। এই মুহূর্তে প্রতি বছরে ১০,০০০ ইউনিট মাইক্রোলিনো তৈরি করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে মাইক্রো মোবিলিটি।

ভারতে সম্ভাবনা কীরকম?
ভারতে এই মুহূর্তে ইলেকট্রিক ভেহিকল বেশ ভালো জনপ্রিয়তা লাভ করলেও, ছোট গাড়ির কনসেপ্ট সাধারণত ভারতে খুব একটা চলে না। এর আগেও রতন টাটা তার মস্তিষ্কপ্রসূত টাটা ন্যানো ভারতীয় ক্রেতাদের জন্য নিয়ে এসেছিলেন। তবে সেটি ভারতে খুব একটা ভালো ব্যবসা করতে পারেনি। বলতে গেলে টাটা ন্যানো ছিল একেবারে ফ্লপ। তার পাশাপাশি, কিছু শহরের রাস্তা ভালো হলেও ভারতের সিংহভাগ রাস্তার অবস্থা একেবারে তথৈবচ। তাই সেই সমস্ত জায়গায় ছোট গাড়ি ভালোভাবে চলতে পারে না। আরবান মোবিলিটি হলেও রাস্তার মান ভারতে এতটাই খারাপ যে, এত ছোট আকারের এবং এত ছোট চাকাবিশিষ্ট গাড়ি ভারতের রাস্তায় চলতে সমস্যার মধ্যে পড়বে।

কনসেপ্ট ভালো হলেও, রাস্তার পরিস্থিতির জন্য এর আগেও এরকম মাইক্রো কনসেপ্ট ভারতে ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে। যদি কেউ ইনোভেটিভ গাড়ি কিনতে চান, তাহলে তার জন্য অবশ্যই মাইক্রোলিনো একটি আকর্ষণীয় জিনিস। তবে ভারতের আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের জন্য এই মুহূর্তে এই বাবল কার খুব একটা উপাদেয় নয়। ভারতের রাস্তার পরিস্থিতি যদি ভবিষ্যতে ভালো হয়, ইলেকট্রিক গাড়ির একটি এনভায়রনমেন্ট ভারতে যদি ভালোভাবে তৈরি হয়, তাহলে অবশ্যই এই ধরনের ইলেকট্রিক বাবল কার ভারতেও জনপ্রিয় হবে। তবে তার আগে পর্যন্ত, এই ধরনের মিনিমালিস্টিক গাড়ি কতটা ভারতে ভালোভাবে ব্যবসা করতে পারবে, সেই নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

More Articles

;