পৃথিবীর বৃহত্তম টেলিস্কোপে মহাকাশের রহস্যময় আলো, কীসের ইঙ্গিত পাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা?
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, রিপিটিং ফাস্ট রেডিও বার্স্ট ভেসে আসছে বহু দূরের কোনও ছায়াপথ (Galaxy) থেকে। এবং সেই রেডিও তরঙ্গর উৎস সেরকমই কোনও ছায়াপথে লুকিয়ে আছে, কারণ বিজ্ঞানীরা এখনও জানতে পারেননি দূরের সেই ছায়াপথের কোন অংশে রয়েছে রেডিও তরঙ্গের উৎস।

পৃথিবীর সবথেকে বড় টেলিস্কোপে ধরা পড়ল তিন বিলিয়ন আলোকবর্ষ (Lightyears) থেকে ধেয়ে আসা রহস্যময়, ধারাবাহিক উজ্জ্বল আলো । এই ধরনের আলোকে বলে হয় রিপিটিং ফাস্ট রেডিও বার্স্ট [Repeating Fast Radio Bursts (FRB)] এবং এদের স্থায়িত্ব মাত্র কয়েক মিলিসেকেন্ড। কিন্তু এই কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যেই যে পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়, তা তৈরি করতে সূর্যের একটি বছর সময় লাগে।
বেশিরভাগ রিপিটিং ফাস্ট রেডিও বার্স্ট মাত্র একবারই দেখা যায়। তাদের পাঁচ শতাংশেরও কম রিপিটিং ফাস্ট রেডিও বার্স্ট, একাধিক উজ্জ্বল আলোর জন্ম দেয় এবং তার ফলেই পরবর্তীকালে তাদের পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। এবং পরবর্তী উজ্জ্বল আলোদের পর্যবেক্ষণ করেই ন্যাশানাল অ্যাস্ট্রোনমিকাল অবজা়র্ভেশন অফ চায়না-র (National Astronomical Observation of China) জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, তারা কোথা থেকে ধেয়ে আসছে এবং কীভাবেই বা তারা উৎস থেকে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে।
খুব সম্প্রতি এই গবেষণার ফলাফল 'নেচার' (Nature) জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এই পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহার করেছিলেন ফাইভ হান্ড্রেড মিটার অ্যাপারচার স্ফেরিক্যাল রেডিও টেলিস্কোপ (Five Hundred Meter Aperture Radio Telescope or FAST), যেটি অবস্থিত দক্ষিণ-পূর্ব চিনে। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, রিপিটিং ফাস্ট রেডিও বার্স্ট ভেসে আসছে বহু দূরের কোনও ছায়াপথ (Galaxy) থেকে। এবং সেই রেডিও তরঙ্গর উৎস সেরকমই কোনও ছায়াপথে লুকিয়ে আছে, কারণ বিজ্ঞানীরা এখনও জানতে পারেননি দূরের সেই ছায়াপথের কোন অংশে রয়েছে রেডিও তরঙ্গের উৎস।
ন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিকাল অবজা়র্ভেশন অফ চায়না-র জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, সম্প্রতি লক্ষ করা এই রিপিটিং ফাস্ট রেডিও বার্স্টের মতো এত শক্তিশালী রেডিও বার্স্ট এর আগে দেখা যায়নি। এবং গবেষকদের মতে, এটি প্রথম রিপিটিং ফাস্ট রেডিও বার্স্ট , যা দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর ছিল। এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ডি লি (Dr. Di Li) জানাচ্ছেন, তাঁরা প্রায় প্রত্যেক ঘণ্টায় এই রেডিও বার্স্ট দেখতে পেয়েছিলেন।
তিনি আরও জানাচ্ছেন, সদ্য নজরে আসা এই রিপিটিং ফাস্ট রেডিও বার্স্টের সঙ্গে বাকিগুলির তফাৎ এখানেই, এটি এক ঘণ্টায় একশোরও বেশি বিস্ফোরণ (Bursts) তৈরি করে, আবার পরের এক ঘণ্টায় একদম নিশ্চুপ হয়ে যায়।
তবে ঠিক একই উৎস থেকে এই গবেষকরা সংকেত পেয়েছিলেন ২০১৯ সালেই। আর তার ঠিক পরের বছরেই, মোট পঁচাত্তরটি সংকেত চিনের এই বৃহৎ টেলিস্কোপে ধরা দেয় ঠিক একই উৎস থেকে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এই পিরামিড আসলে স্বাভাবিক এক প্রাকৃতিক গঠন। নাসার মার্স কিউরিওসিটি রোভারে ধরা পড়া যে ছবি দেখে এই দাবি করছেন ওয়ারিং, তা ট্যুইট করে কিওরিওসিটি রোভারের তরফে জানানো হয়েছে, দেখতে দরজার মতো মনে হলেও, জিওলজির সঙ্গে পরিচিতদের কাছে বিষয়টি এমন কিছুই অস্বাভাবিক নয়।
ন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিকাল অবজা়র্ভেশন অফ চায়না-র জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পরে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সাহায্য নেন সেই ছায়াপথের সন্ধান করতে, যা এই রহস্যময় সংকেতের উৎস। তারপর দুই দেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ক্যালিফোর্নিয়ার হাওয়াই ও নিউ মেক্সিকোতে অবস্থিত দু'টি টেলিস্কোপের সাহায্যে একটি খুব ক্ষুদ্র ছায়াপথের সঠিক অবস্থান খুঁজে পান। তাঁরা দেখেন, এই ছায়াপথটি কেবল ক্ষুদ্রই নয়, এর বিভিন্ন ধাতুর অভাব রয়েছে এবং আকাশগঙ্গা ছায়াপথের (Milky Way Galaxy) তুলনায় এটি বহুগুণে কম উজ্জ্বল।
নেচারে প্রকাশিত গবেষণাটি থেকে জানা যাচ্ছে, এই রেডিও বার্স্টের উৎস অত্যন্ত ঘন (High Density) এবং উচ্চ চৌম্বকীয় শক্তি-যুক্ত পরিবেশে। কিন্তু তবুও এর সঠিক অবস্থান কোথায় তা নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এখনও সন্দিহান।
তাঁদেরই মধ্যে কারও কারও মতে এই রেডিও তরঙ্গ আসছে কোনও নিউট্রন নক্ষত্র (Neutron Star) থেকে, যেটি সম্ভবত কোনও নবীন সুপারনোভার (Young Supernova) কেন্দ্রে রয়েছে।
চিনের এই গবেষকদের দল একটি কৃত্রিম মডেল বানিয়ে দেখেছেন, যখন কোনও ম্যাগনেটার (Magnetar) বৃহৎ কোনও বি স্টারের (B Star) চারপাশে প্রদক্ষিণ করে, তখন ঠিক একই রকমের রিপিটিং ফাস্ট রেডিও বার্স্ট তৈরি হয়। ম্যাগনেটার বলতে খুব উচ্চ চৌম্বকীয় ক্ষমতাসম্পন্ন নিউট্রন নক্ষত্রকে বোঝায়।
সাম্প্রতিক কালে রিপিটিং ফাস্ট রেডিও বার্স্ট নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞান শাখায় বেশ আলোড়ন দেখা দিয়েছে। অনেকেই এই নিয়ে গবেষণার উৎসাহ দেখিয়েছেন। কিন্তু এই বিষয়ে একটি প্রাথমিক প্রশ্ন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও অধরা রয়ে গেছে- পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পাওয়া পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে তাঁরা এখনও জানেন না রিপিটিং ফাস্ট রেডিও বার্স্টের উৎস কী।
ফাইভ-হানড্রেড-মিটার অ্যাপারেচার স্ফেরিক্যাল রেডিও টেলিস্কোপ বা ফাস্টের পাশাপাশি কানাডার চাইম (CHIME) বা ক্যানাডিয়ান হাইড্রোজেন ইন্টেনসিটি ম্যাপিং এক্সপেরিমেন্ট (Canadian Hydrogen Intensity Mapping Experiemnt) বর্তমানে জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ফাইভ-হানড্রেড-মিটার অ্যাপারেচার স্ফেরিক্যাল রেডিও টেলিস্কোপ বা ফাস্ট নির্মাণ করা হয় ২০২০ সালে, যেটি বর্তমানে ন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজা়র্ভেশন অফ চায়না-র অধীনে রয়েছে। কিন্তু এরই মাঝে চিনে দ্বিতীয় টেলিস্কোপটি তৈরির কাজ শুরুও হয়ে গিয়েছে। আশা করা যায়, ভবিষ্যতে নতুন টেলিস্কোপটিও একাধিক নতুন গবেষণায় সমানভাবে সাহায্য করবে।







