দুর্ভিক্ষের সময় তৈরি গোলকধাঁধা! কেন একা কেউই বেরোতে পারেন না ভুলভুলাইয়া থেকে?

Myths of Bhool Bhulaiya: ভুল ভুলাইয়া এমনভাবে তৈরি যে আপনি যদি ৫০ মিটার দূরে কোনও দেশলাই জ্বালান তার শব্দ সুস্পষ্ট শুনতে পাবেন।

inscript
৩ মিনিট
দুর্ভিক্ষের সময় তৈরি গোলকধাঁধা! কেন একা কেউই বেরোতে পারেন না ভুলভুলাইয়া থেকে?

প্রাচীন গন্ধ পেতে হলে যেতে হবে উত্তরপ্রদেশ। কতদিন সেই গন্ধ রাজনৈতিক কারণে আর পাওয়া যাবে তা অবশ্য বলা মুশকিল, তবু রাজধানী লখনউ এখনও নবাবদের নির্মিত অনেক স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক বিস্ময়কে আঁকড়ে রেখেছে নিজের দেহে। নবাবি খানা, উর্দু ভাষার মিষ্টি সম্ভাষণে 'মুস্কুরাইয়ে, আপ লখনউমে হ্যায়' কতদিন ঠিক বলা বা শোনা যাবে জানা নেই। শুধু জানা আছে, ঐতিহ্যকে ভাঙতে গেলে ঐতিহ্যকে, তার ইতিহাসকে উল্টেপাল্টে দেখে নিতে হয়। এমনই এক ঐতিহ্য ভুল ভুলাইয়া। শহরের বড় ইমামবাড়ায় অবস্থিত ১,০০০ গলি আর ৪৮৯টি দরজার এক আজব গোলকধাঁধা৷

ইমামবাড়া হচ্ছে মহরম এবং অন্যান্য অনুষ্ঠান পালনের জন্য শিয়াদের দ্বারা নির্মিত সমাবেশ স্থল। লখনউয়ের এই বড় ইমামবাড়াটি ১৭৮৪ সালে আওধের (বর্তমানে লখনউ) চতুর্থ নবাব আসাফ-উদ-দৌলার তৈরি। সেবার টানা দশ বছর ধরে চলেছিল ভয়াবহ খরা আর দুর্ভিক্ষ। আসাফ-উদ-দৌলা তখন আওধের নবাব। মদ্যপান করতে ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন বিভিন্ন উদ্ভট আগ্রহকে বাস্তব করে তুলতে। তবে খামখেলায়লি বা রগচটা বললে ভুল হবে, উদার নবাব হিসেবেই পরিচিত ছিলেন আসাফ। তাই দরিদ্র ও বেকারদের আয়ের জন্য বড়া ইমামবাড়া নির্মাণের দায়িত্ব নেন তিনি। ইমামবাড়া নির্মাণের জন্য নবাব প্রায় ২০০০০ শ্রমিক নিয়োগ করেছিলেন। দরিদ্রদের জীবিকা নির্বাহের জন্যই চালু করা হয়েছিল এই ইমামবাড়ার নির্মাণ। শ্রমিকরা দিনের বেলায় ইমামবাড়ার কাঠামোটি নির্মাণ করতেন এবং রাতে সেটি ভেঙে ফেলা হতো যাতে প্রত্যেকের জন্য পরের দিন জীবিকা অর্জনের জন্য যথেষ্ট কাজ থাকে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দেবদেবী নয়, পুজো করা হয় ব্যাঙকে! রহস্য-মিথে ভরা ভারতের ২০০ বছরের প্রাচীন এই মন্দির

Frog Temple of India : যেখানে দেবদেবী নন, প্রাধান্য পায় ব্যাঙ! বলা ভালো, ভারতের একমাত্র ব্যাঙের মন্দির!

বড় ইমামবাড়া আসাফি ইমামবাড়া নামেও পরিচিত। এই ইমামবাড়া নির্মাণের জন্য নবাব স্থপতিদের কাছ থেকে দরপত্র ডাকেন। দরপত্রের দরাদরিতে জিতে যান হাফিজ কিফায়াত উল্লাহ। শাহজাহানাবাদের (বর্তমানে পুরনো দিল্লি) এই স্থপতি লখনউতে রুমি দরওয়াজার নকশাও তৈরি করেছিলেন। এই ইমামবাড়া গড়ার ক্ষেত্রে নবাবেব মূল আবদার ছিল একটিই, ১৭০ ফুট x ৫৫ ফুটের এই ইমামবাড়ার কেন্দ্রীয় হলঘরটিতে কোনও স্তম্ভ থাকুক, চাননি নবাব আসাফ-উদ-দৌলা।

তাই, ইমামবাড়াকে দাঁড় করয়ে রাখার জন্য ফাঁপা দেওয়াল, ফাঁপা ছাদ এবং বিভিন্ন উচ্চতার গম্বুজ তৈরি করা হয়েছিল। এই ফাঁপা কাঠামোই ধীরে ধীরে ভুল ভুলাইয়া নামক গোলকধাঁধা নির্মাণের দিকে পরিচালিত করে। বড় ইমামবাড়া নির্মাণে ধাতু বা কাঠ ব্যবহার করা হয়নি। এটি লাখোরি ইট (বাদশাহি ইট) দিয়ে তৈরি যা আসলে সমতল, পাতলা, লাল পোড়া মাটির ইট। শাহজাহানের রাজত্বকালে মুঘল স্থাপত্যের একটি জনপ্রিয় উপাদান ছিল এই লাখোরি ইট।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অশরীরীর কান্না, রহস্যময় গোলকধাঁধা! পুজোর ছুটিতে গা ছমছমে সফর সারুন নবাবদের শহরে

পুজোর ছুটিতে ঘুরতে পারবেন এই ঐতিহাসিক শহর, তেমন অল্প-স্বল্প স্বাদও পেতে পারেন ইতিহাসের পাতায় রয়ে যাওয়া রহস্যের।

ভুল ভুলাইয়া এমন রহস্যময় কেন? ৪৫ টি সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে ভুল ভূলাইয়ার শুরুর জায়গায় পৌঁছতে পারবেন আপনি। এই ভুল ভুলাইয়া এমনভাবে তৈরি যে আপনি যদি ৫০ মিটার দূরে কোনও দেশলাই জ্বালান তার শব্দ সুস্পষ্ট শুনতে পাবেন। আড়াইশো বছর ছুঁতে চলা এই স্থাপত্যে বিবিধ গলি ছাড়াও একটি লুকনো সুড়ঙ্গ রয়েছে যা দিল্লির দিকে নিয়ে যায় এবং আরেকটি যায় আগ্রার দিকে। স্থানীয় গাইডরা বলেন, ভুল ভূলাইয়ার ভেতরে কিছু গোপন কুঠুরিও রয়েছে।

পুরো ভুলভুলাইয়াটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, এমনভাবে সেখানে জানলা স্থাপন করা হয়েছে যাতে দিনের সময় বায়ুচলাচল এবং আলোর কোনও অভাব না হয়। এসবই করা হয়েছিল ইমামবাড়ার কেন্দ্রীয় স্থলের কাঠামোর কথা মাথায় রেখে! গাইড না থাকলে এই ভুলভুলাইয়াতে ঢুকে বেরিয়ে আসা কার্যত অসম্ভব! বলা হয় যে, দিল্লি, ফৈজাবাদ এবং এলাহাবাদ পর্যন্ত যে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ছিল এই ভুলভুলাইয়ার মধ্যে, পরে ব্রিটিশরা নাকি গুপ্তধন খুঁজে না পেয়ে সেই সুড়ঙ্গগুলি বন্ধ করে দেয়!

শোনা যায়, ব্রিটিশ সহ অনেকেই কোনও গাইড ছাড়াই এই গোলকধাঁধায় প্রবেশ করেছেন, আর কখনই ফিরে আসেননি। ১,০০০টিরও প্রবেশের স্থান রয়েছে, অথচ বেরোবার পথ মাত্র একটিই। বেশিরভাগ টানেলই এখন জনসাধারণের জন্য বন্ধ। ইমামবাড়ার ছাদ থেকে রুমি দরওয়াজা, আসিফি মসজিদ এবং হুসেনাবাদ ক্লক টাওয়ার দেখা যায়।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।