ধর্মতলার নাম ধর্মতলা হলো কেন! মনোহর পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোন ইতিহাস?

Dharmatala Name History: কালীঘাট যাওয়ার পথে যে জঙ্গলাকীর্ণ পথ পার করতে হতো তার শুরু ছিল এই এলাকা। পুরনো নথি ঘেঁটে একটি এলাকার নাম পাওয়া যায়।

Raktim Dey
৩ মিনিট
ধর্মতলার নাম ধর্মতলা হলো কেন! মনোহর পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোন ইতিহাস?

ব্রিটিশ শাসনের শুরুতে এবং তার পূর্বে বর্তমান কলকাতা শহরের জায়গায় ছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা কয়েকটি গ্রাম। গ্রামের চারিদিকে ঘিরে থাকা সেই জঙ্গলে বাঘ সহ অন্যান্য জন্তুর সঙ্গে ডাকাতের ভয়ও ছিল। তাই মানুষ খুব প্রয়োজন ছাড়া জঙ্গলে যাতায়াত করত না। কথিত আছে, জঙ্গলের পথে ঘুরে বেড়ানো সেইরকমই এক ডাকাত দলের সর্দার একদিন তার দলবল নিয়ে নিজের ডেরায় ফেরার পথে এক অনাথ ছেলেকে খুঁজে পায়। শোনা যায়, এই অনাথ ছেলেটির পরিবার বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছিল। জঙ্গলের মধ্যে খুঁজে পাওয়া সেই অনাথ ছেলেটিকে ডাকাত দলের সর্দার নিজের সঙ্গে নিয়ে আসে। ধীরে ধীরে এই ছেলেটির কারণেই সর্দারেরর মনের ভাব পরিবর্তন হয়। শুনে মনে হতে পারে, কোনও সিনেমার চিত্রনাট্য। তবে মনে রাখা দরকার, যা রটে, তার অনেকটাই আসলে ঘটে।

ডাকাত সর্দার ছেলেটির নাম রেখেছিল হারাধন। ছেলেটিকে প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত করে সমাজের মূল স্রোতে নিয়ে আসে সর্দার। নিজের মৃত্যুর পূর্বে ডাকাত দলের সর্দার তার এই পালিত সন্তানকে মানুষের ব্যবহারের জন্য একটি পুকুর খনন এবং একটি কালী মন্দির নির্মাণের নির্দেশ দেয়। হারাধন তার পালিত পিতার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন এবং মানুষের ব্যবহারের জন্য একটি পুকুর এবং একটি কালী মন্দির নির্মাণ করেন। হারাধনের বাবা অর্থাৎ সেই ডাকাত দলের সর্দারের নাম ছিল মনোহর। তার নাম অনুসারেই খনন করা পুকুরের নাম হয় মনোহর পুকুর। কালক্রমে সেই পুকুরের আশেপাশের এলাকার নাম পুকুরের নাম অনুযায়ীই হয়ে যায় মনোহর পুকুর। বর্তমানে অবশ্য সেই পুকুরটির অস্তিত্বই নেই।

বেশ কিছু ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায়, বর্তমানের দেশপ্রিয় পার্ক সংলগ্ন এলাকায় সেই পুকুর ছিল। যদিও অন্য কিছু সূত্র অনুযায়ী, এককালে যেখানে পুকুরটি ছিল আজ সেখানেই দেশপ্রিয় পার্ক তৈরি হয়েছে। হারাধনের খনন করা সেই পুকুরের অস্তিত্ব নেই ঠিকই কিন্তু কালী মন্দিরের অস্তিত্ব আজও আছে। দক্ষিণ কলকাতার ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের কাছে মানুষের কাছে পরিচিত ডাকাত কালী বাড়িটিই আসলে মনোহরের নির্দেশ পালন করে হারাধনের তৈরি করা কালী বাড়ি। ভাবতেও অবাক লাগে, সেই কতকাল আগে এক ডাকাত সর্দার এবং এক অনাথ শিশুর যদি কোনওদিন দেখা না হতো তাহলে হয়তো কোনওদিন সেই পুকুর অথবা এই মন্দির তৈরিই হতো না।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দক্ষিণ কলকাতার ব্যস্ততম রাস্তা! হরিশ মুখার্জি রোডের নেপথ্যের মানুষকে চিনলই না বাঙালি

Harish Mukherjee Road: দক্ষিণ কলকাতার হরিশ মুখার্জি রোড অথবা হরিশ মুখার্জি পার্ক যার নামে সেই হরিশ মুখার্জি কে?

কলকাতার পরতে পরতে রয়েছে ইতিহাসের গল্প। ইতিহাস সংরক্ষণের সদিচ্ছা এবং সময়ের অভাবে সেই অমূল্য গল্প বহু ক্ষেত্রেই মানুষের অজানা থেকে যায়। কলকাতা শহরের প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলার নামের উৎস তারই এক উদাহরণ। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ইংরেজ কোম্পানির বিভিন্ন নথিতে ধর্মতলা নাম পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির লেখক বিনয় ঘোষের মতে, বর্তমান ধর্মতলা এলাকার কাছেই ধর্মরাজ ঠাকুরের মন্দির থাকার কারণেই এলাকার নাম হয়েছে ধর্মতলা। কথিত আছে, সতেরো শতকে এই এলাকায় প্রধানত ডোম এবং হরিজনদেরই বাস ছিল। তাদের আরাধ্য দেবতার নাম থেকেই ধর্মতলা নিজের নাম পেয়েছে। যদিও এই যুক্তির বিপক্ষেও যুক্তি রয়েছে। কথিত আছে, শুধু ধর্মরাজের মন্দির নয় বরং ধর্মরাজ মন্দির, মসজিদ এবং নিকটবর্তী বৌদ্ধদের ধর্মস্থান থাকায় একই এলাকায় বিভিন্ন ধর্মের সমন্বয় ঘটে এবং সেই কারণেই লোকমুখে এই এলাকার নাম হয়ে যায় ধর্মতলা।

অপর একটি সূত্র অনুযায়ী, কালীঘাট যাওয়ার পথে যে জঙ্গলাকীর্ণ পথ পার করতে হতো তার শুরু ছিল এই এলাকা। পুরনো নথি ঘেঁটে একটি এলাকার নাম পাওয়া যায়। সেই নাম হলো, ধর্মতলা যাওয়ার রাস্তা। তাই মনে করা হয়, এই ধর্মতলা বলতে আসলে কালীঘাটকে বোঝানো হয়েছে। ধর্মস্থান যাত্রার সূচনার এলাকা হিসাবে এই এলাকার নাম হয়ে যায় ধর্মতলা। ধর্মতলা নামের সঙ্গে বহু মানুষ সুপরিচিত হলেও তার নামের সঠিক উৎস আজও অনেক মানুষের অজানা।

ধর্মতলা নামের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে সংশয় থাকলেও পুরনো কলকাতায় ধর্মতলার আশেপাশের এলাকার কিছু গল্পের প্রমাণ পাওয়া যায়। ধর্মতলার উত্তর দিকে একটি খাল চাঁদপাল ঘাট থেকে বেলেঘাটা অবধি প্রবাহিত হতো। সেই খাল পরবর্তীকালে প্রাকৃতিক এবং মানুষের কার্যকলাপের কারণে বুঁজে যায়। সেই খালের প্রবাহের পথে তৈরি হয় একটি পুকুর যার নাম ছিল ওয়েলিংটন স্কোয়ার। গাছের ছায়ায় ঘেরা এই পুকুর বর্তমানে মানুষের কাছে রাজা সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার নামে পরিচিত। ১৮২১ সালের ৯ অগাস্ট দ্যা ক্যালকাটা গেজেটে প্রকাশিত একটি সংবাদে এই পুকুরকে দ্য নিউ স্কোয়ার অব ধর্মতলা বলেই অভিহিত করা হয়েছে। কলকাতা শহর যেন আস্ত একটা গল্পের বই এবং তার প্রত্যেকটা অলিগলি যেন সেই বইয়ের এক একটা পাতা। যদিও দুঃখের বিষয় যে যত্নের অভাবে সেই বইয়ের পাতা নষ্ট হতে বসেছে। মানুষ কি আগামীতে জানতে চাইবে তার ইতিহাস? যত্ন করে আগলে রাখবে পুরাতন সেই বই!

তথ্য ঋণ : টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান, ওয়ার্ডপ্রেস, পুরনো কলকাতা।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।