বন্দুকের জয়গান গেয়েছে যে, বন্দুক আজ তাকেই তাক করছে

Gun Civilization: বন্দুকের নল একদিকে যেমন ক্ষমতার উৎস সেই ক্ষমতা আরেকদিক থেকে নির্বুদ্ধিতারও উৎস।

Sayantan Mukherjee
৩ মিনিট
বন্দুকের জয়গান গেয়েছে যে, বন্দুক আজ তাকেই তাক করছে

রাম না থাকলে রামরাজ্য যেমন থাকে না, তেমনই বোঝা মুশকিল ১৭৯১ থেকে ২০২৪ এ পৌঁছে গেলে ১৭৯১-এর আক্ষরিক আইন নিয়ম এসব মানুষ কেন মেনে চলবে বা চলতে চাইবে। আজ আমেরিকাতে যেসব জিনিস নিয়ে লাফালাফি বা হামবড়াই ১৭৯১-এ তার কিছুই ছিল না। ইন্টারনেট থেকে হলিউড, টাইম স্কোয়ার থেকে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি সবারই বয়স বেশ কম আমেরিকার মার্কিন সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী থেকে। মার্কিন সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী বলে, A well regulated Malesia being necessary to the security of a free state, the right of the people to keep an bare arms, shall not be infringed. অর্থাৎ, একটি সুনিয়ন্ত্রিত মিলিশিয়া রাষ্ট্র নিরাপত্তার জন্য যেমন প্রয়োজনীয় এই প্রেক্ষিতে জনগণের অস্ত্র রাখার এবং বহন করার অধিকার লঙ্ঘন কখনই করা হবে না। সদ্য ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির পর নবজাতক রাষ্ট্রের পিতারা সতর্ক থাকছেন দ্বিতীয় সংশোধনীতে দু'টি বিষয়ের ওপর। এক, বন্দুকের নল যেহেতু ক্ষমতার উৎস তাই সরকারের কাছে যেন সেই ক্ষমতার একচেটিয়া অধিকার না থাকে। দুই, ১৭৯১ তে স্বল্প জনঘনত্বের মার্কিন দেশে বড় বড় ভূ-স্বামীদের রমরমা। অনেক রাজনীতিকেরাও ছিলেন ভূ-স্বামী। তাদের দাসদাসী সম্বলিত জীবনকে কীভাবে সামরিক ভাবে সুরক্ষিত করা যায় তার চিন্তা থেকেও তৈরি হয়েছে দ্বিতীয় সংশোধনী।

১৭৯১ থেকে ২০২৪ মিসিসিপি, কলোরাডো, মিসৌরির মধ্যে দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। দ্বিতীয় সংশোধনী আর ব্যক্তিগত বন্দুকের অধিকার আমেরিকাতে আজ সর্বগ্রাসী। ৩৫ কোটি আমেরিকাবাসীর ব্যক্তিগত অধিকারে আজ ৪২ কোটি বন্দুক। তার মধ্যে ঐতিহাসিক ছররা পিস্তল যেমন আছে তেমনই আছে মেশিন গান। আর তেমনই এক মেশিন গান কান ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল ডোনাল্ড ট্রাম্পের গত সপ্তাহে পেনসিলভেনিয়াতে। প্রশ্ন এখানেই আসে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর এই আক্রমণ কেন? এবং এই আক্রমণ রোখা গেল না কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু যে বিষয় নিয়ে আমরা খুবই কম কথা বলি তা হল, ভারতের রেল দুর্ঘটনা যেমন নিত্য নৈমিত্তিক আমেরিকাতে মাস শুটিং বা গুলি করে গণ-নিধনও এক নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। মার্কিন রাজনীতিকরা প্রতি সপ্তাহেই কোন না কোন গণ নিধন বা মাস শুটিং বা কোন না কোন শুটিং নিয়ে মিডিয়ার মুখোমুখি হন এবং তাদের চিন্তা এবং প্রার্থনা (thoughts and prayers) তারা আমাদেরকে উপহার দিয়ে চলেছেন।

বন্দুক আমেরিকার সাধারণ মানুষের কাছে একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং দ্বিধাবিভক্ত মানুষের বিষয়। অধিকাংশ মানুষ যখন একদিকে যেমন বন্দুকের অপব্যবহার নিয়ে চিন্তিত এবং বিরোধী তেমনই এক বড় শতাংশের মানুষ ঐতিহাসিকভাবে তাদের পারিবারিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের দিক থেকে বন্দুকের প্রতি তাদের যে অধিকার তা ছেড়ে দিতে একেবারেই রাজি নন। এই রাজনৈতিক বিভেদ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে ২০১৬-র পর থেকে যখন ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শুরু এবং ডেমোক্র্যাটদের হারানোর জন্য ট্রাম্প এবং তার অনুগামীরা সমস্ত রক্ষণশীল এবং অতি রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তির সাথে হাত মিলিয়েছেন এবং সেখানে দাঁড়িয়ে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন হল এন। আর। এ বা ন্যাশানাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন। চার্চ বন্দুক এবং সাদা মানুষের ব্যক্তি স্বতন্ত্রের পরিচয়। এই বিষয়গুলো নিয়েই দক্ষিণপন্থী আমেরিকান রাজনীতি আন্দোলিত আর সেই রাজনৈতিক আন্দোলনের মূল হোতা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চারশো ফুট দূর থেকে ২০ বছর বয়সী এক আপাত নিরীহ তরুণ পরপর আটবার গুলি চালিয়ে হত্যা করবার চেষ্টা করবে তা বোধহয় কেউই ভাবেননি। কিন্তু যে কোন ক্রিয়ারই যেমন বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি এই হামলা যেন সেই প্রতিক্রিয়ারই অঙ্গ।

দুঃখের বিষয় এটাই যে, এই সমস্ত কিছুর পরেও স্যান্ডি হুক থেকে পার্ক সিটি অসমর্থ প্রতিবন্ধী থেকে নার্সারি স্কুলের বাচ্চা বন্দুকবাজদের বন্দুকের নল থেকে পরিত্রান কারুরই নেই বর্তমান আমেরিকান রাজনীতির প্রেক্ষিতে। তার মূল কারণ বর্তমান আমেরিকান রাজনীতিতে দুটি স্পষ্ট ভাগ। একদিকে যেমন প্রগতিশীল ক্যালিফোর্নিয়া, নিউ ইয়র্ক ইত্যাদি অন্যদিকে রক্ষণশীল টেক্সাস, লুইসিয়ানা, কানসাস ইত্যাদি। এই দুই রাজ্যভিত্তিক ভাগাভাগির মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সুপ্রিম কোর্ট যাতে বর্তমানে ৬ঃ৩ গরিষ্ঠতায় রক্ষণশীল বিচারকরা প্রাধান্য পেয়ে চলেছেন এবং তারা দ্বিতীয় সংশোধনী কেন সংবিধানের কোনও সংশোধনীকেই তারা আঁচড় অবধি কাটতে দেবেন না। কারণ তারা বিশ্বাস করেন যে ১৭৯১ তে লেখা সংবিধানের আক্ষরিক অর্থই মেনে চলা মার্কিন জনগণের কর্তব্য এবং ধ্রুব। এই সমস্ত পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে টিভি প্রাইম টাইমের বাকতাল্লা ছাড়া অনর্গল চিন্তা এবং প্রার্থনা ছাড়া অন্য কোনও কিছুই কোনও বন্দুক হামলায় আক্রান্ত আহত নিহত মানুষের পরিজনের জন্য বর্তমান আমেরিকাতে প্রাপ্য নয়। ট্রাম্প, বাইডেন, ওবামা, বুশ, কামলা হ্যারিস, জেডি ভ্যান্স কারোরই সামর্থ্য নেই দ্বিতীয় সংশোধনীর গায়ে আঁচ অবধি আসতে দেবে। কারণ, বন্দুকের নল একদিকে যেমন ক্ষমতার উৎস সেই ক্ষমতা আরেকদিক থেকে নির্বুদ্ধিতারও উৎস।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ডানাছাঁটা ট্রাম্প-নেতানিয়াহু, বিশ্ব রাজনীতি কোন দিকে যাবে?

Trump midterm defeat: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় এবং ইজরায়েলের নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো—দুটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী হবে? আমেরিকা-ইজরায়েল সম্পর্কের সমীকরণ কি বদলাবে? আর বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাবই বা কতটা পড়বে?

ট্রাম্পের হারের ৫ কারণ: কেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন মার্কিন ভোটাররা?

US Midterm Elections: আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ট্রাম্পের নীতি—রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পাঁচটি মূল কারণ কী কী?

পিস বন্ড কী, কেন দিতে হয়? নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঔপনিবেশিক আমলের আইন

Peace Bond: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেই কি দিতে হবে পিস বন্ড? AISA-র জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে বিতর্কে ঔপনিবেশিক আমলের প্রতিরোধমূলক আইন। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন ভারত, CrPC থেকে BNSS—কীভাবে বদলেছে এই আইনি ব্যবস্থা? কেন কাউকে ১০ হাজার টাকার মুচলেকা দিতে বলা হয়? কী বলছে আইন?

রামলীলা ময়দানের সভায় ভিড় দেখাতে এআই ছবি? কতটা সত্যি?

Ramlila Maidan AI image controversy: দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১ নভেম্বরের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমাবেশে ভিড় ও এআই ছবি ব্যবহার নিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে বিতর্ক তুঙ্গে। ভাইরাল ছবিগুলোর সত্যতা কী?

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।