নিজেকে ভালোবাসো তুমি এবার, এ কথাটাই কী ভাবে শেখাবেন সন্তানকে!

Piya Saha
৪ মিনিট
নিজেকে ভালোবাসো তুমি এবার, এ কথাটাই কী ভাবে শেখাবেন সন্তানকে!

স্যোশাল মিডিয়া, সেলফির যুগে আট থেকে আশি আমরা সকলেই নিজের 'লুক' সম্পর্কে খুব সচেতন। কিশোর- কিশোরী বা মাঝবয়সিদের অনেককেই বন্ধুদের বলতে শোনা যায় যেখানে তাঁকে ভালো লাগছে তেমন ছবি যেন ফেসবুকে পোস্ট করে। সব সময়েই নিজেকে পারফেক্ট হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা চোখে পড়ে। তবে গবেষণা বলছে মানুষের শারীরিক উপস্থিতি পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দেয় নিজের সম্পর্কে তিনি কী ভাবছেন। অনেকেই আছেন যাঁরা মনে করেন যদি সুযোগ থাকত নাকটা আর একটু টিকালো করার, কিংবা চোখগুলো আর একটু বড় হলে বা ছিপছিপে চেহারা থাকলে এই পেট নিয়ে সমস্যায় ভুগতে হতো না, দেখতেও সুন্দর দেখাতো অনেক। আপনার এই চিন্তা অজান্তেই আপনার শরীর-মনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এসব ভাবনা ছেড়ে নিজেকে মন থেকে মেনে নিলেই ইতিবাচক ছবি ফুটে উঠবে আপনার চরিত্রে। নিজের সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবনা আপনাকে সুস্থ জীবনযাপনে সাহায্য করবে। যার ফলে আপনার ব্যক্তিত্বে ইতিবাচক শক্তি এবং আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে।

কিশোর বয়সে অনেকেই স্কুলের বন্ধুদের দ্বারা বা পরিবারের নিকটাত্মীয়ের কাছের শারীরিক গঠনের কারণে ঠাট্টার বিষয় হয়ে ওঠে। দীর্ঘকাল এমন ঘটনার সম্মুখীন হতে থাকলে নিজের শরীরকে ঘৃণার চোখে দেখতে শুরু করে তাঁরা। এই ঘটনার ফলে মানসিক এমনকী শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। দৃঢ় মানসিকতার অভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় কিশোর কিশোরী এবং মাঝবয়সীদের মধ্যেই এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। উদ্বেগ, হীনমন্যতা, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার এমনকি কারো কারো খাদ্যাভ্যাসও বদলে যেতে পারে একারণে। ঘন ঘন মেজাজ হারিয়ে চিৎকার করে ওঠে তাঁরা। আবার কেউ কেউ নিজেকে একঘরে করে ফেলে বাঁচার চেষ্টা করে কটূক্তির থেকে।অনেকের মধ্যে নিজেকে শেষ করে দেবার প্রবণতাও তৈরি হয়। অথচ কত সহজেই তাঁকে আমরা একটা সুস্থ জীবন দিতে পারতাম।নিজেকে ভালোবেসে বাঁচার সুযোগ করে দিতে পারতাম।তবে এই সমস্যা গোঁড়া থেকেই সারিয়ে তুলতে পারেন অভিভাবকরা। কী উপায়ে? আসুন বুঝে নেওয়া যাক-

১. সরাসরি খোলামেলা আলোচনা করুন

কিশোর বয়সে অনেকেরই মনে হয় মা-বাবা ঠিকমতো বুঝতেই পারেন না তাঁদের। সবসময় শুধুই নির্দেশে দিয়ে চলেছেন। ফলে দুই প্রজন্মের মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে।যে মূহুর্তে তাঁরা বুঝে যায় তাঁদের কথার গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে, ছেলেমেয়েরা নিজেদেরকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের উচিত তাঁদের গুরুত্ব দিয়ে শোনা। তাঁরা কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কথা বলছে, কি চাইছে সে ব্যাপারে খোলামেলা আলোচনা করা তাঁদের সাথে।২. নির্দিষ্ট কোনোদিকে মনোনিবেশ করা ঠিক নয়

কোনো একটি বিষয় নিয়ে বারবার কথা বলতে থাকলে তা অনেকক্ষেত্রেই বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে তাঁদের মনে বিরূপ মনোভাবের জন্ম দেয়। যেমন ধরুন অনেক কিশোর কিশোরী আজকাল ব্র্যান্ডেড জামাকাপড় পড়তে পছন্দ করে।অথচ আপনি বুঝতে পারছেন তাঁকে সেই পোশাকে মানাচ্ছে না কিন্তু এর আগে আপনি বলেও কাজ হয়নি। সেক্ষেত্রে অন্যভাবে ছেলে মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে স্বাচ্ছন্দ্যই পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিচার্য বিষয়, বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়।

৩. নিজের নিরাপত্তাহীনতার আঁচ পড়তে দেবেন না

আপনি যদি এমন পরিবেশে বড় হন যেখানে মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্যকেই তাঁকে বিচারের মাপকাঠি হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, তবে নিজের অজান্তেই আপনার সন্তানের মধ্যেও সেই ধারণা প্রকট হয়ে উঠতে পারে। ফর্সা ত্বক কিংবা ছিপছিপে চেহারা দিয়ে কখনই মানুষের সৌন্দর্য বিচার করা সম্ভব নয়। বরং সুস্থ জীবন আপনাকে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলবে সকলের কাছে।এগুলি এমন বিষয় যা নিয়ে প্রাপ্ত বয়স্করা খুব বেশি ভাবেন না তবে কিশোর বয়সে ছেলেমেয়েদের কাছে আপনার এই মতামত মনখারাপের কারণ হতেই পারে।

৪. স্বাস্থ্য- ব্যায়ামের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

আজকাল ছেলেমেয়েদের অনেকের হাতেই স্মার্টফোন থাকায় তাঁরা গেম খেলা বা সিনেমা দেখার মতো কাজ করতেই বেশি পছন্দ করে। ফলে অল্পবয়সীদের অনেকের ওজনই বাড়তে থাকে। তাই তাঁদের উৎসাহ দিন প্রতিদিন ব্যায়াম করায়। সাঁতার, ক্যারাটে বা তাঁদের পছন্দ মত কোনো খেলার প্রশিক্ষণও নেওয়াতে পারেন। এতে তাঁদের শরীর এবং মন দুইই সুস্থ থাকবে।

৫. শরীর নিয়ে ছুঁৎমার্গ

এক্ষেত্রে ব্যক্তি তাঁর শারীরিক গঠন সম্পর্কে মাত্রাতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। প্রায়ই দেখা যায়, মানুষটি তাঁর শরীরের কোনও একটি অংশ বা কোনো ক্ষতচিহ্ন সম্পর্কে অতিরিক্ত সচেতন হয়ে আছেন। সবসময় এই সম্পর্কেই ভাবতে থাকে তাঁরা। অনেকসময় এই চিন্তাভাবনা এতটাই তীব্র হয়ে দাঁড়ায় যে অন্য আর কোনো কিছু ভাবতেই পারে না। জীবনের সমস্ত পরিসরেই এমন চিন্তার প্রভাব পড়ে ফলে তাঁর কর্মদক্ষতা কমতে থাকে। কিশোর কিশোরী এবং মাঝবয়সীদের ক্ষেত্রেই এ লক্ষণ বেশি দেখা যায়।

৬. শব্দের প্রয়োগ সম্পর্কে সচেতন হোন

ছেলেমেয়ের সঙ্গে কথা বলার সময় কী ধরনের শব্দ প্রয়োগ করছেন সে বিষয়ে অতিরিক্ত সচেতন থাকুন।অনেকই সন্তানদের মোটা বা অতিরিক্ত ওজনের কারণেই বিয়ে হচ্ছে না এমন মন্তব্য করে থাকেন। সাথে রয়েছে অন্যদের সাথে তুলনা টেনে কথা শোনানো। এধরনের মন্তব্য শরীর সম্পর্কে নিজের মনে সন্দেহ এনে দেয়।

৭. কঠোর ডায়েটের থেকে স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিন

অভিভাবক হিসেবে সন্তানকে সরাসরি প্রশ্ন করুন ডায়েটের মূল লক্ষ্য কী? সুস্থ জীবনযাপন করা নাকি কিছু পোশাকে নিজেকে ফিট করা। সেক্ষেত্রে তাঁকে পরামর্শ দিন যেন ফাস্টফুডের বদলে স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করে প্রতিদিন। কিশোর কিশোরীদের অনেকেই উপবাসে থেকে বা খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে ওজন কমানোর কথা ভাবে। কিন্তু এর ফলে শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের অভাব দেখা দেয়।তাই খাবার খাওয়া অত্যন্ত জরুরী একথা সন্তানকে বোঝান।

৮. নিজেকে ভালোবাসতে শেখান

নিজেকে গ্রহণ করতে পারলেই ভালোবাসা সম্ভব। এক্ষেত্রে অভিভাবকদেরও সন্তানদের খুঁত ভুলে গ্রহণ করতে হবে। তাই তাঁদের নিজেকে ভালোবাসতে উৎসাহ দিন। বলুন তাঁর শারীরিক গঠন কখনই তাঁর প্রতি আপনার ভালোবাসা কমিয়ে দেবে না। বাইরের লোক কটুক্তি করলেও ছেলেমেয়ের পাশে দাঁড়ান। সমাজ তাঁকে তাঁর বাহ্যিক গঠন দিয়ে বিচার করলেও বাড়িতে নিজের সন্তানের জন্য সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করুন। সন্তানকে বলুন তোমার খারাপটা নিয়েই তোমাকে ভালোবাসি।তোমার খারাপ দিকটাকে সঙ্গে নিয়েই সবসময় ভালোবাসবো ভবিষ্যতে।

তবে এসবের পরেও অনেকের সমস্যা কমতে চায় না। সেক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সাইকোথেরাপি এবং কাউন্সেলিং-এর সাহায্য নিতে পারেন। এতে সন্তানের চরিত্রে আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং নিজের সম্পর্কে তিক্ততা কমবে।

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।