একে ওয়েডিং ফটোগ্রাফার, তাও আবার মেয়ে!

Wedding Photography: পশ্চিমবঙ্গের বাইরে তাও ওয়েডিং ফটোগ্রাফির বাজারে মানুষের কিঞ্চিৎ সম্মান আছে। অথচ বাংলায় ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারের বাইরে পেশা কেউ ভাবতেই পারে না আজও!

Ranjurima Das
৩ মিনিট
একে ওয়েডিং ফটোগ্রাফার, তাও আবার মেয়ে!

একে ওয়েডিং ফটোগ্রাফার, তাও আবার মেয়ে! সমাজের জোড়া সাঁড়াশি কেড়ে নিতে চায় সমস্ত স্বপ্নই। তবু, লরাই করে বাঁচার মজা আছে বলেই না পৃথিবীটা আকর্ষণীয় এখনও। বাড়ি আমার হাওড়ায়, আন্দুলে। মা, আমি আর পোষ্যকে নিয়ে ছোট্ট সংসার ছিল। আমার বাবা মারা যান ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সম্প্রতি বিয়েও করলাম। স্বামী অবশ্য ফটোগ্রাফির দুনিয়ার মানুষ নন। এই ওয়েডিং ফটোগ্রাফির বাজারে প্রায় বনবাসের মেয়াদ কাটিয়ে ফেললাম। আমার ওয়েডিং ফটোগ্রাফির সফর শুরু হয় ২০১০ সালের ১৫ অগাস্ট। বাড়িরই একটি ছোট্ট অনুষ্ঠান দিয়ে হাতেখড়ি। আমার এক জ্যেঠুর মেয়ের বিয়ে ছিল। মানে, ঘরের কাজ দিয়েই শুরু বলা যায়। আমার পরিবারে কিন্তু সকলেই প্রায় চাকরি করে। আমার বাবা-মা দু'জনেই আবার খেলাধুলোর জগতের মানুষ। মা একজন আন্তর্জাতিক জিমন্যাস্ট ছিলেন। বাবা ভারোত্তোলন, বডি বিল্ডিং করতেন। তাঁরা সবসময়ই চাইতেন আমি চাকরিটাই করি গুছিয়ে। ওয়েডিং ফটোগ্রাফার হব শুনে, তাই স্বাভাবিকভাবেই কেউই সমর্থন করেননি। চাপ ছিল যে চাকরি করতেই হবে। ফলে বাড়ির অমতে গিয়ে বড্ড লড়াই করতে হলো। ছবি তুলতে ভালো লাগত বটে, তবে এও ঠিক যে প্যাশনকেই প্রফেশন করব এমনটাও ভাবিনি কখনও।

আগে তো স্ট্রিট ফটোগ্রাফিই করতাম। এই পেশায় এত বছর কাটিয়ে বুঝেছি, ওয়েডিং ফটোগ্রাফি মানে মুহূর্তকে ধরে রাখা। মুহূর্ত ছবির মাধ্যমে তৈরি করতে হয়। আমি যদি স্ট্রিট ফটোগ্রাফি দিয়ে শুরু না করতাম তাহলে মূহূর্ত কীভাবে ধরতে হয় তা হয়তো শিখতেই পারতাম না। ইমোশন হোক বা মুহূর্ত, ক্যামেরায় তা ধরতে শিখেছি স্ট্রিট ফটোগ্রাফি করেই। ১৪ বছর কাটিয়েও ফেললাম এই পেশায়। ৫০০-র উপরে বিয়ের ছবি তুলেছি এই এক যুগেরও বেশি সময়ে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিশ্বে ৩২ টি দেশেই বৈধ, কেন সমকামী মানুষদের বিবাহের বিরুদ্ধে নরেন্দ্র মোদির সরকার?

Same Sex Marriage: নেদারল্যান্ডস ২০০০ সালে প্রথম দেশ হিসেবে সমকামী বিয়েকে বৈধতা দেয়। এশিয়ায়, তাইওয়ান প্রথম দেশ যারা ২০১৯ সালে এই ধরনের বিয়েকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

আসলে অন্য অনেক কাজের মতোই, মেয়ে হিসেবে এই কাজে আসায় অনেক সমস্যা থাকে। বহু বাড়িতেই মেয়েদের এই পেশায় আসাকে আজও সমর্থন করা হয় না। আমি একটু ডাকাবুকো ঠিকই। সবটাইকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল চিরকাল। এমনকী বিয়েটাও করেছি সেইভাবেই। আমি প্রথমেই বলে দিয়েছিলাম, আমি ওয়েডিং ফটোগ্রাফার। সেইটাকে মান্যতা দিয়েই যদি তাঁরা এগোতে চান, তবেই বিয়ে করব। অনেকক্ষেত্রেই তো দেখেছি মেয়ে চাকরি করলে ঠিক আছে কিন্তু ওয়েডিং ফটোগ্রাফার মেয়ে চলবে না। আবার ছেলেরা যাঁরা এই প্রফেশনে আছেন, তাঁদের সঙ্গীরা তাঁদের ছেড়ে চলে গেছেন কারণ পাত্রের নির্দিষ্ট চাকরি নেই, উপার্জনের নিশ্চয়তা নেই। কত দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ভেঙে যেতে দেখেছি। সবাই বলে যে, কোনও কাজই ছোট না, অথচ নিজের জীবনে তা মানতে পারে না।

বাবা যখন মারা যান, প্রবল ঋণের বোঝা মাথায় এসে পড়েছিল। অবস্থা এমন যে ঋণ না মেটালে বাড়ি ব্যাঙ্ক দখল করে নেবে। সেই সময় আমার প্রিয় সব ক্যামেরা আমাকে বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। কোনওরকমভাবে বাড়িটা বাঁচাই আগে। তারপর প্রবল পরিশ্রমে একে একে কাজ করে করেই এগিয়েছি জীবনে। ওই কঠিন সময়ে আমার ওয়েডিং ফটোগ্রাফিই আমাকে বাঁচিয়েছিল। তাই সুসময়ে কীভাবে এই পেশাকে ছেড়ে বাঁচি! হ্যাঁ, সমাজে 'বিয়েবাড়ির ছবি তোলা' বিষয়টা এখনও ততটা পাতে দেওয়ার যোগ্য ভাবে না অনেকেই। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে তাও ওয়েডিং ফটোগ্রাফির বাজারে মানুষের কিঞ্চিৎ সম্মান আছে। অথচ বাংলায় ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারের বাইরে পেশা কেউ ভাবতেই পারে না আজও! অথচ পশ্চিমবাংলার চাকরির পরিস্থিতিতে কি মানায় এটা?

আমি যে সময় কাজ শুরু করি, প্রায় ১৪ বছর আগে, তখন প্রায় কোনও মহিলাই ছিলেন না এই পেশায়। আমি অন্তত দেখিনি কলকাতায় কাউকে। এখন অনেক অনেক মেয়েরা এগিয়ে এসেছেন। অর্থাৎ ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। মেয়েরা পরিবার থেকে সমর্থনও পাচ্ছেন। এটা অবশ্যই একটা বড় বদল। তবে এই পেশায় মেয়েদের অসুবিধার দিকগুলিকে এখনও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। পিরিয়ডসের সময় ওয়েডিং ফটোগ্রাফির পেশায় থাকা মেয়েদের খুবই সমস্যা হয়। কাজ করতে করতে বাইরে বেরিয়ে নিজেকে সামলানোর সময়ও পাওয়া যায় না। নানা জায়গা এত অস্বাস্থ্যকর হয় যে ইনফেকশনের আশঙ্কা ভয়াবহ থাকে। টানা কাজের ফলে শৌচালয় যাওয়ার সময়ও পাওয়া যায় না। ক্লায়েন্ট ও সহকর্মীদের থেকে একটু সংবেদনশীলতা তাই অবশ্যই কাম্য।

ছবির ধরন রাতারাতি বদলে যাচ্ছে এই পেশায়। আগে বিয়েবাড়ির ছবি নিয়ে মানুষের যেমন ধারণা ছিল, তা অনেকটাই বদলে গেছে। আগে যখন ক্লায়েন্টদের জিজ্ঞেস করতাম কী কী চান, তাঁদের পরিবার বারবার বলতেন, খাবার জায়গার ছবি চাই। বিয়ে মানে শুধু বর-কনের ছবি তোলা না। সমস্ত মুহূর্তগুলো ধরাই তো আসল কাজ। ঝাঁ চকচকে ভেন্যুতে তোলা জমকালো ছবি নয়, অনেকসময় সেরা ছবি উঠে আসে একেবারে গ্রামের, পুরনো ধাঁচের বিয়েবাড়িতেও! আজকাল আর সব মুহূর্ত কেউ চান না তেমন। শুধু বরকনের লক্ষ লক্ষ ছবি! ওয়েডিং ফটোগ্রাফি স্মৃতি ধরে রাখার চাবিকাঠি। তাতে সমস্ত উদযাপনটাই ধরা উচিত। জীবনভর, সুখস্মৃতিই তো উল্টেপাল্টে দেখতে চায় মানুষ।

লিখেছেন
Ranjurima Das
Ranjurima Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।