মাড়ি হোক বা দাঁত, সামান্য অচেতন হলেই যে রোগগুলি বাসা বাঁধবে...

প্রচণ্ড ব্যথা দাঁতে? এতই ব্যথা যে কোনো খাবারই খেতে পারছেন না। অথবা ভীষণ দুর্গন্ধ মুখে । আশেপাশের লোক কথাই বলতে চান না এমন মানুষের সাথে। এমন লক্ষণগুলি থাকলে ওই ব্যক্তির মৌখিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে। শরীরের যে কোনো  অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতোই মুখগহ্বরে বাসা বাঁধতে পারে বিভিন্ন রোগ। তবে সঠিক স্বাস্থ্যবিধি পালন এবং সাবধানতার মাধ্যমে সহজেই এড়ানো সম্ভব এই ধরনের রোগ। কিন্তু মৌখিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে ওরাল ক্যানসার এমনকি হার্ট অ্যাটাকও হতে পারে। চলুন বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক মৌখিক স্বাস্থ্য বা ওরাল হেলথের খুঁটিনাটি-

মৌখিক স্বাস্থ্য বা ওরাল হেলথ কী?

মৌখিক স্বাস্থ্য বলতে দাঁত, মাড়ি এবং মুখের সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে বোঝায়। মৌখিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে এমন অবস্থার উল্লেখ করতে আমরা অনেক সময়েই ' ডেন্টাল প্রবলেম' কথাটি ব্যবহার করে থাকি। দাঁতে ব্যথা, মাড়ির প্রদাহ, ফোলাভাব, মাড়ি থেকে রক্তপাত, দাঁতের ক্ষয়, ক্যাভিটি এবং মুখে দুর্গন্ধ - এমন নানা সমস্যা দেখা দেয় মৌখিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে।

চিকিৎসকদের মতে , মুখের অভ্যন্তরে কোনো প্রকার সমস্যা হলে তা সঠিক সময়ে চিকিৎসা করা উচিত। তা না হলে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় মৃত্যুও হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু এর মতে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে সাধারণ ও দীর্ঘস্থায়ী রোগের মধ্যে অন্যতম হল দাঁতের রোগ। ২০১৭ সালেই দ্য গ্লোবাল বার্ডেন অফ ডিজিজ স্টাডি  অনুমান করেছে যে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন মানুষ মৌখিক রোগের সমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে, দাঁতের গহ্বর বা ওরাল ক্যাভিটি সবচেয়ে সাধারণ একটি রোগ।

রোগের লক্ষণ

রোগের ওপর নির্ভর করে দাঁতের সমসস্যার লক্ষণগুলি আলাদা হতে পারে। তবে দাঁতের সমস্যার সাধারণ লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে-

১. দাঁত ব্যথা

২. ঠাণ্ডা বা গরম খাবার বা পানীয়ের প্রতি সংবেদনশীলতা

৩. আলগা দাঁতের গোঁড়া

৪. দাঁতের রঙ বা আকৃতি পরিবর্তন

৫. দাঁতে গর্ত বা ফাটল

৬.  মাড়ি থেকে রক্তপাত

৭. মাড়ি ফুলে যাওয়া

৮. মাড়িতে ব্যথা

৯. ফোলা গাল

১০. মুখে দুর্গন্ধ

দাঁতের সমস্যা

১. দাঁতের গহ্বর বা ক্যাভিটিঃ দাঁতের গহ্বর বা ক্যাভিটি হল দাঁতের মধ্যে তৈরি হওয়া ছোট ছোট গর্ত। চিকিৎসা না করা হলে দাঁতের গহ্বরের ফলে দাঁতে ব্যথা, সংক্রমণ বা দাঁতের ক্ষতি হতে পারে।মিষ্টি খাবার, কোমল পানীয় এবং অন্যান্য জাঙ্ক ফুডের অত্যধিক ব্যবহার, যথাযথভাবে মুখের যত্ন না নেওয়া  এবং সঠিক উপায়ে দাঁত না পরিষ্কার করার ফলে দাঁতের ক্ষয় বা দাঁতের মধ্যে গহ্বর তৈরি হয়। চিনির পরিমাণ বেশি থাকে এমন খাবার খাওয়ার ফলে এই সমস্যা তৈরি হয়।খাবারে উপস্থিত চিনি মুখগহ্বরে উপস্থিত লালা এবং ব্যাকটেরিয়াগুলির সাথে একত্রিত হয়ে দাঁতের উপরিভাগে প্লাক তৈরি করে। দীর্ঘ সময়ের জন্য চিকিৎসা না করা হলে, এটিই দাঁতের বাইরের অংশ অর্থাৎ এনামেলের ক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় যা দাঁতের ক্ষয় বা দাঁতের গহ্বর তৈরি করে।

সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন প্রাপ্তবয়স্কদের এই সমস্যা দেখা যায়। চিকিৎসকেরা দাঁতের ক্ষয় নির্ণয় করতে এক্স-রে করতে দেন।বিভিন্ন যন্ত্র ব্যবহার করে দাঁতের নরম জায়গাগুলি পরীক্ষা করেও নেওয়া হয়।  দাঁতের ক্ষয় রোধে করনীয়-

  • নরম ব্রাশ ও ফ্লোরাইড টুথপেস্ট দিয়ে দিনে দুবার দাঁত ব্রাশ করুন
  • ঘন ঘন স্ন্যাক্স এবং চিনিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলুন

২. দাঁতের গোড়ায় প্রদাহ/পায়োরিয়া : দাঁত ও মাড়িতে খাদ্যদ্রব্য জমা হওয়ায় এবং ভালোভাবে পরিষ্কার না করার কারণে সেখানে জীবাণু জন্মায়। এরফলে দাঁতের গোড়ার উপরের দিকে পেরিঅস্টিয়াম মেমব্রেনের সংযোগস্থল নষ্ট হয়। ঐ স্থানে জীবাণুর কারণে পচনশীল দুর্গন্ধযুক্ত রোগের সৃষ্টি করে। এই রোগে দাঁতের গোড়া ফুলে উঠে এবং কখনও কখনও পুঁজ দেখা যায়। সঠিক পরিমাণে সুষম খাদ্যের অভাবে এ রোগ প্রায়ই দেখা যায় লোকের মধ্যে।এই রোগে ক্ষেত্রে করনীয়-

  • নড়বরে দাঁত তুলে ফেলতে হবে
  • প্রতিদিন মুখ পরিষ্কার রাখতে  হবে এবং আঙুল দিয়ে দাঁতের মাড়িতে ম্যসেজ করতে হবে
  • সঠিক পরিমাণে খাবার খেতে হবে

৩. মুখের ক্যানসারঃ মুখগহ্বরের যে কোনো অংশ যেমন ঠোঁট, জিভ, টনসিলে ক্যানসারের মত মারণ রোগ হতে পারে। মুখের ভিতরকার কোনো অংশে দীর্ঘকালীন ঘা এবং তা নিরাময় না হলে ক্যানসারের রূপ নিতে পারে। তথ্য বলছে, বিশ্বে মুখের ক্যানসারে আক্রান্তদের মধ্যে ৭৫ শতাংশই ভারতীয়।

করনীয়ঃ

  • ধূমপান , তামাক জাতীয় দ্রব্য ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
  • অ্যালকোহল ত্যাগ করাই ভালো এক্ষেত্রে।

মৌখিক স্বাস্থ্যের জন্য টিপস

একজন ব্যক্তি নিয়মিত যথাযথভাবে মৌখিক স্বাস্থ্যবিধি পালন করলে দাঁতের সমস্যা সহজেই প্রতিরোধ করতে পারেন। এক্ষেত্রে করনীয়-

১. দিনে অন্তত দুবার ফ্লোরাইড টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করুন

২.প্রতিদিন দাঁত ফ্লস করুন বা অন্য যে কোনো জিনিস দিয়ে দাঁতের মাঝখানে জমে থাকা খাবারগুলি পরিষ্কার করে নিন

৩.চিনি খাওয়া সীমিত করতে হবে

৪.তামাক এবং ধূমপান এড়ানোই ভালো

৫.নিয়মিত দাঁতের ডাক্তার দেখান

৬.প্রধান পানীয় হিসাবে জল ব্যতীত অন্য সবকিছু বর্জন করাই শ্রেয়

৭. সীমিত পরিমাণে অ্যালকোহল পান করতে হবে  

৮.মুখের যে কোনো ঘা ফেলে রাখবেন না।

দাঁতের জন্য উপকারী খাবার –

১. ওমেগা-৩,ভিটামিন-ডি এবং ক্যালশিয়াম দাঁত এবং মাড়ির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই তৈলাক্ত মাছ, দুধ, ডিম ও ভাদাম দাঁতের জন্য উপকারি

২. সবুজ শাকসবজি মুখের ভিতর উপকারি ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। প্রচুর মিনারেল থাকায় দাঁত মজবুতও হয়। অনেকের মুখে ঘা হওয়ার প্রবণতা থাকে। সবুজ শাকসবজি ঘা সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে।

৩. লেবু, কমলা, আঙ্গুরের মত ফলগুলি ভিটামিন সি-তে ভরপুর যা যেকোনো ক্ষত, রক্তপাত কমাতে সাহায্যও করে   

More Articles

;