মাড়ি হোক বা দাঁত, সামান্য অচেতন হলেই যে রোগগুলি বাসা বাঁধবে...

Piya Saha
৪ মিনিট
মাড়ি হোক বা দাঁত, সামান্য অচেতন হলেই যে রোগগুলি বাসা বাঁধবে...

প্রচণ্ড ব্যথা দাঁতে? এতই ব্যথা যে কোনো খাবারই খেতে পারছেন না। অথবা ভীষণ দুর্গন্ধ মুখে । আশেপাশের লোক কথাই বলতে চান না এমন মানুষের সাথে। এমন লক্ষণগুলি থাকলে ওই ব্যক্তির মৌখিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে। শরীরের যে কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতোই মুখগহ্বরে বাসা বাঁধতে পারে বিভিন্ন রোগ। তবে সঠিক স্বাস্থ্যবিধি পালন এবং সাবধানতার মাধ্যমে সহজেই এড়ানো সম্ভব এই ধরনের রোগ। কিন্তু মৌখিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে ওরাল ক্যানসার এমনকি হার্ট অ্যাটাকও হতে পারে। চলুন বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক মৌখিক স্বাস্থ্য বা ওরাল হেলথের খুঁটিনাটি-

মৌখিক স্বাস্থ্য বা ওরাল হেলথ কী?

মৌখিক স্বাস্থ্য বলতে দাঁত, মাড়ি এবং মুখের সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে বোঝায়। মৌখিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে এমন অবস্থার উল্লেখ করতে আমরা অনেক সময়েই ' ডেন্টাল প্রবলেম' কথাটি ব্যবহার করে থাকি। দাঁতে ব্যথা, মাড়ির প্রদাহ, ফোলাভাব, মাড়ি থেকে রক্তপাত, দাঁতের ক্ষয়, ক্যাভিটি এবং মুখে দুর্গন্ধ - এমন নানা সমস্যা দেখা দেয় মৌখিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে।

চিকিৎসকদের মতে , মুখের অভ্যন্তরে কোনো প্রকার সমস্যা হলে তা সঠিক সময়ে চিকিৎসা করা উচিত। তা না হলে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় মৃত্যুও হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু এর মতে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে সাধারণ ও দীর্ঘস্থায়ী রোগের মধ্যে অন্যতম হল দাঁতের রোগ। ২০১৭ সালেই দ্য গ্লোবাল বার্ডেন অফ ডিজিজ স্টাডি অনুমান করেছে যে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন মানুষ মৌখিক রোগের সমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে, দাঁতের গহ্বর বা ওরাল ক্যাভিটি সবচেয়ে সাধারণ একটি রোগ।

রোগের লক্ষণ

রোগের ওপর নির্ভর করে দাঁতের সমসস্যার লক্ষণগুলি আলাদা হতে পারে। তবে দাঁতের সমস্যার সাধারণ লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে-

১. দাঁত ব্যথা

২. ঠাণ্ডা বা গরম খাবার বা পানীয়ের প্রতি সংবেদনশীলতা

৩. আলগা দাঁতের গোঁড়া

৪. দাঁতের রঙ বা আকৃতি পরিবর্তন

৫. দাঁতে গর্ত বা ফাটল

৬. মাড়ি থেকে রক্তপাত

৭. মাড়ি ফুলে যাওয়া

৮. মাড়িতে ব্যথা

৯. ফোলা গাল

১০. মুখে দুর্গন্ধ

দাঁতের সমস্যা

১. দাঁতের গহ্বর বা ক্যাভিটিঃ দাঁতের গহ্বর বা ক্যাভিটি হল দাঁতের মধ্যে তৈরি হওয়া ছোট ছোট গর্ত। চিকিৎসা না করা হলে দাঁতের গহ্বরের ফলে দাঁতে ব্যথা, সংক্রমণ বা দাঁতের ক্ষতি হতে পারে।মিষ্টি খাবার, কোমল পানীয় এবং অন্যান্য জাঙ্ক ফুডের অত্যধিক ব্যবহার, যথাযথভাবে মুখের যত্ন না নেওয়া এবং সঠিক উপায়ে দাঁত না পরিষ্কার করার ফলে দাঁতের ক্ষয় বা দাঁতের মধ্যে গহ্বর তৈরি হয়। চিনির পরিমাণ বেশি থাকে এমন খাবার খাওয়ার ফলে এই সমস্যা তৈরি হয়।খাবারে উপস্থিত চিনি মুখগহ্বরে উপস্থিত লালা এবং ব্যাকটেরিয়াগুলির সাথে একত্রিত হয়ে দাঁতের উপরিভাগে প্লাক তৈরি করে। দীর্ঘ সময়ের জন্য চিকিৎসা না করা হলে, এটিই দাঁতের বাইরের অংশ অর্থাৎ এনামেলের ক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় যা দাঁতের ক্ষয় বা দাঁতের গহ্বর তৈরি করে।

সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন প্রাপ্তবয়স্কদের এই সমস্যা দেখা যায়। চিকিৎসকেরা দাঁতের ক্ষয় নির্ণয় করতে এক্স-রে করতে দেন।বিভিন্ন যন্ত্র ব্যবহার করে দাঁতের নরম জায়গাগুলি পরীক্ষা করেও নেওয়া হয়। দাঁতের ক্ষয় রোধে করনীয়-

  • নরম ব্রাশ ও ফ্লোরাইড টুথপেস্ট দিয়ে দিনে দুবার দাঁত ব্রাশ করুন

  • ঘন ঘন স্ন্যাক্স এবং চিনিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলুন

২. দাঁতের গোড়ায় প্রদাহ/পায়োরিয়া : দাঁত ও মাড়িতে খাদ্যদ্রব্য জমা হওয়ায় এবং ভালোভাবে পরিষ্কার না করার কারণে সেখানে জীবাণু জন্মায়। এরফলে দাঁতের গোড়ার উপরের দিকে পেরিঅস্টিয়াম মেমব্রেনের সংযোগস্থল নষ্ট হয়। ঐ স্থানে জীবাণুর কারণে পচনশীল দুর্গন্ধযুক্ত রোগের সৃষ্টি করে। এই রোগে দাঁতের গোড়া ফুলে উঠে এবং কখনও কখনও পুঁজ দেখা যায়। সঠিক পরিমাণে সুষম খাদ্যের অভাবে এ রোগ প্রায়ই দেখা যায় লোকের মধ্যে।এই রোগে ক্ষেত্রে করনীয়-

  • নড়বরে দাঁত তুলে ফেলতে হবে

  • প্রতিদিন মুখ পরিষ্কার রাখতে হবে এবং আঙুল দিয়ে দাঁতের মাড়িতে ম্যসেজ করতে হবে

  • সঠিক পরিমাণে খাবার খেতে হবে

৩. মুখের ক্যানসারঃ মুখগহ্বরের যে কোনো অংশ যেমন ঠোঁট, জিভ, টনসিলে ক্যানসারের মত মারণ রোগ হতে পারে। মুখের ভিতরকার কোনো অংশে দীর্ঘকালীন ঘা এবং তা নিরাময় না হলে ক্যানসারের রূপ নিতে পারে। তথ্য বলছে, বিশ্বে মুখের ক্যানসারে আক্রান্তদের মধ্যে ৭৫ শতাংশই ভারতীয়।

করনীয়ঃ

  • ধূমপান , তামাক জাতীয় দ্রব্য ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

  • অ্যালকোহল ত্যাগ করাই ভালো এক্ষেত্রে।

মৌখিক স্বাস্থ্যের জন্য টিপস

একজন ব্যক্তি নিয়মিত যথাযথভাবে মৌখিক স্বাস্থ্যবিধি পালন করলে দাঁতের সমস্যা সহজেই প্রতিরোধ করতে পারেন। এক্ষেত্রে করনীয়-

১. দিনে অন্তত দুবার ফ্লোরাইড টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করুন

২.প্রতিদিন দাঁত ফ্লস করুন বা অন্য যে কোনো জিনিস দিয়ে দাঁতের মাঝখানে জমে থাকা খাবারগুলি পরিষ্কার করে নিন

৩.চিনি খাওয়া সীমিত করতে হবে

৪.তামাক এবং ধূমপান এড়ানোই ভালো

৫.নিয়মিত দাঁতের ডাক্তার দেখান

৬.প্রধান পানীয় হিসাবে জল ব্যতীত অন্য সবকিছু বর্জন করাই শ্রেয়

৭. সীমিত পরিমাণে অ্যালকোহল পান করতে হবে

৮.মুখের যে কোনো ঘা ফেলে রাখবেন না।

দাঁতের জন্য উপকারী খাবার –

১. ওমেগা-৩,ভিটামিন-ডি এবং ক্যালশিয়াম দাঁত এবং মাড়ির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই তৈলাক্ত মাছ, দুধ, ডিম ও ভাদাম দাঁতের জন্য উপকারি

২. সবুজ শাকসবজি মুখের ভিতর উপকারি ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। প্রচুর মিনারেল থাকায় দাঁত মজবুতও হয়। অনেকের মুখে ঘা হওয়ার প্রবণতা থাকে। সবুজ শাকসবজি ঘা সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে।

৩. লেবু, কমলা, আঙ্গুরের মত ফলগুলি ভিটামিন সি-তে ভরপুর যা যেকোনো ক্ষত, রক্তপাত কমাতে সাহায্যও করে

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।