"আজ আছি, কাল নাও থাকতে পারি", মৃত্যুর একদিন আগেই নিয়তির আঁচ পেয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী?

Last Days of Indira Gandhi : ভুবনেশ্বরের সেই সভা, বক্তৃতা… গোটা দেশবাসীর বারবার মনে পড়ছিল সেটা। মৃত্যুর পদধ্বনি আগেভাগেই পেয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী?

Aritra Som
৪ মিনিট
"আজ আছি, কাল নাও থাকতে পারি", মৃত্যুর একদিন আগেই নিয়তির আঁচ পেয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী?

১৯৮৪ সালের ৩০ অক্টোবর। ওইদিন গোটা দেশের নজর ছিল ভুবনেশ্বর শহরের দিকে। সমস্ত সংবাদমাধ্যম, ক্যামেরা ওড়িশার এই শহরের দিকে তাক করা। মঞ্চও সাজিয়ে গুছিয়ে তৈরি করা হয়েছে। কারণ, একটু পরেই এখানে বক্তৃতা দিতে উঠবেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। বক্তৃতার খসড়া নিয়ে আলাপ আলোচনা আগেই সেরে রেখেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া উপদেষ্টা এইচ ওয়াই শারদা প্রসাদ। সেইমতো খসড়াপত্রও তৈরি রেখেছেন নিজের কাছে। এই বক্তৃতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সবদিক দিয়ে তৈরি থাকতে হবে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, ১৯৮৪ সালেই মাত্র কয়েক মাস আগে, জুনে হয়ে গিয়েছে ‘অপারেশন ব্লু স্টার’। অজস্র রক্ত দেখেছিল স্বর্ণ মন্দির। মারা গিয়েছিলেন অনেক শিখ। এরপরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে যায়। ইন্দিরা গান্ধী তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী, তাঁর নির্দেশেই এমনটা হয়েছে। ফলে গোটা শিখ সমাজ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো, গোয়েন্দা, পুলিস সবাই বারবার প্রধানমন্ত্রীর কাছে ছুটছে। তাঁর শিখ নিরাপত্তারক্ষীদের সরিয়ে দেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। হামলা হতে পারে ইন্দিরা গান্ধীর ওপর। কিন্তু তিনি যে ‘লৌহমানবী’! ধর্মনিরপেক্ষ দেশে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের হওয়ার জন্য কেন কাউকে সরিয়ে দেওয়া হবে কাজ থেকে? সমস্যা তো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ে; সাধারণ শিখরা কী করেছেন?

তারপরই অক্টোবরের শেষে ভুবনেশ্বরে সভা। বক্তৃতার খসড়া নিয়ে মঞ্চে উঠলেন ইন্দিরা গান্ধী। ভাষণ চলছে ভাষণের মতো। হঠাৎই চমক ভাঙল শারদা প্রসাদের। এখন ইন্দিরা গান্ধী যে কথাগুলো বলছেন, সেগুলো তো লেখা ছিল না। খসড়ার বাইরে গিয়ে এ কি বলছেন প্রধানমন্ত্রী?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
"আমি চাইলে ইন্দিরা গান্ধী নাচবেন," কেন বিতর্কিত এই মুখ্যমন্ত্রীকে সম্মান জানিয়েছিল ৩ টি দেশ!

Biju Patnaik: প্রধানমন্ত্রীর আদেশ মতো, একটি পুরনো ডাকোটা প্লেন নিয়ে জাকার্তা পৌঁছন বিজু। এই মিশনে তাঁর সহপাইলট ছিলেন, তাঁর স্ত্রী জ্ঞানদেবী।

“আমি আজ, এই মুহূর্তে বেঁচে রয়েছি। কাল নাও থাকতে পারি। অনেকদিন বেঁচেছি। কিন্তু আমি কোনও অনুতাপ পুষে রাখিনি মনে। পুরো জীবনটাই দেশের কাজে উৎসর্গ করেছি। আর যে কয়েকদিন বাঁচব, দেশের কাজেই নিজেকে নিয়োজিত রাখব। আমার শেষ রক্তের ফোঁটাটুকুও যেন ভারতকে মজবুত করে।”

স্তম্ভিত হয়ে গেলেন নেতা মন্ত্রীরা। স্তম্ভিত জনতা। হঠাৎ এ কি বললেন ইন্দিরা গান্ধী! মৃত্যুর কথা কেন বলছেন তিনি? ওড়িশার রাজ্যপাল বললেন, আপনি তো ভয় পাইয়ে দিচ্ছেন! তখনও নির্বিকার ‘লৌহমানবী’! তিনি যে মনের কথাই বলেছেন। বলতে ইচ্ছে করছিল যে!

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বন্ধ ঘরে যোগশিক্ষার আড়ালে... ইন্দিরা-যোগগুরুর সম্পর্ক নিয়ে ফিসফাস চলে আজও

Indira Gandhi: দিল্লি তো বটেই, সমগ্র ভারতেরই রাশ নিজের আঙুলের ডগায় রেখেছিলেন যোগগুরু ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারী, ইন্দিরার সঙ্গে সম্পর্কের জোরে।

ঠিক তার পরেরদিনের ঘটনা। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। ওইদিন অনেকগুলি অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল ইন্দিরা গান্ধীর। প্রথমেই তথ্যচিত্রকার পিটার উস্তিনভের সঙ্গে মিটিং ছিল। তিনি ইন্দিরা গান্ধীর ওপর তখন একটা তথ্যচিত্র বানাচ্ছিলেন। তারপর ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জেমস ক্যালিঘানের সঙ্গে বৈঠক ছিল। সন্ধ্যায় বাকিংহাম প্যালেসের রাজকুমারী অ্যানের সম্মানে ডিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে ব্যস্ত শিডিউল। গেরুয়া শাড়ি পরে পরিপাটি করে তৈরি হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এবার নিজের বাসভবন থেকে যাবেন আকবর রোডের অফিসে। কাছাকাছি বাড়ি, তাই ভেতর থেকেই রয়েছে রাস্তা।

সেই রাস্তা দিয়েই একটু একটু করে এগোচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সঙ্গে ছাতা হাতে সিপাহী নারায়ণ সিং; পেছনে ব্যক্তিগত সচিব আর কে ধাওয়ান, নিরাপত্তা অফিসার রামেশ্বর দয়াল। ইন্দিরা গান্ধীর একটু পাশেই ছিল নিরাপত্তাকর্মী বিয়ন্ত সিং। হঠাৎই তৎপর হয়ে উঠল সে। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে সটান গুলি চালাল। লক্ষ্য? ইন্দিরা গান্ধী! তিনি দেখলেন, তাঁর পেটে গুলি লেগেছে। গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরও দুটি গুলি ছুটে আসে। কোমর আর বুক ভেদ করে চলে যায় সেটা। বিয়ন্ত সিং চিৎকার করে ওঠে, ‘গুলি চালাও!’

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'বাংলাদেশি বাবু' ও ইন্দিরা গান্ধীর কণ্ঠস্বর! দেশের সবচেয়ে বড় রহস্য আজও অধরা

Nagarwala Scam: রুস্তম সোহরাব নাগারওয়ালা আসলে কে ছিলেন? সেই ‘বড় খবর’, যা তিনি ফাঁস করতে চেয়েছিলেন, সেটাই বা কী?

কাকে বলল এমনটা? দেখা গেল, খানিক দূরেই দাঁড়িয়ে আছে আরেক নিরাপত্তারক্ষী সতবন্ত সিং। হাতে অটোমেটিক কার্বাইন। ঘটনার প্রাথমিক ঝটকায় হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল সে। বিয়ন্ত সিংয়ের চিৎকারে ‘সম্বিত’ ফিরল। কার্বাইনের চেম্বারে থাকা ২৫টি গুলিই চালিয়ে দিল ইন্দিরা গান্ধীকে লক্ষ্য করে। গেরুয়া, কালো পাড় শাড়ির রং বদলে গেল মুহূর্তে। মাটি ভেসে গেল রক্তে…

এত দ্রুত ও আকস্মিক এই ঘটনা ঘটল যে, ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে থাকা মানুষজনও ঘাবড়ে গেল। নিরাপত্তা অফিসার রামেশ্বর দৌড়ে এলেও পায়ে সতবন্তের গুলি খেয়ে পড়ে যান। এদিকে ভেতর থেকে তড়িঘড়ি বেরিয়ে আসেন রাজীব-পত্নী সোনিয়া গান্ধী। আকবর রোড থেকে ছুটে এল পুলিস ফোর্স। ততক্ষণে বন্দুক ফেলে দাঁড়িয়ে পড়েছে বিয়ন্ত আর সতবন্ত সিং। কেবল একটিই কথা বলল তারা, “আমাদের যা করার ছিল, করে দিয়েছি। এবার আপনাদের যা করার, করুন।” তড়িঘড়ি গ্রেফতার করা হল দুজনকে।

এই ঘটনা কি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফল? কারণ, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাসভবনের এলাকায় একটা অ্যাম্বুলেন্স সবসময় থাকত। ঘটনাচক্রে, ১৯৮৪-র ৩১ অক্টোবরের দিনটিতেই সেই অ্যাম্বুলেন্সের চালক আসেননি। বাধ্য হয়ে সাদা অ্যাম্বাসাডর করে রক্তাক্ত ইন্দিরা গান্ধীকে দিল্লি এইমসে নিয়ে যাওয়া হয়। শাশুড়িকে আগলে গাড়িতে বসেন সোনিয়া গান্ধীও। কিন্তু ঘটনার আকস্মিকতা ছিল এমনই, বাড়ি থেকে কেউ এইমসে ফোন করে এমারজেন্সি সংবাদও দেননি। তাই কেউই প্রস্তুত ছিল না। গাড়ি থেকে নামিয়ে জরুরি বিভাগে ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে যেতে মিনিটখানেক সময় লাগে।

সবাই বুঝেছিলেন, আর কিছু করার নেই। এতগুলো গুলি শরীর ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে, রক্তে ভেসে গিয়েছে সমস্ত দেহ। গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত ফুসফুস, যকৃত। পাঁজরের হাড় ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়েছে। অন্ত্রেও মারাত্মক আঘাত। মস্তিস্কেও আঘাত লেগেছে। নাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না, স্থির চোখ, দেহের তাপমাত্রা একটু একটু করে কমছে। তবুও চেষ্টা করেছিলেন ডাক্তাররা। কিন্তু, কিছু যে করা যাবে না আগেই বুঝে গিয়েছিলেন সবাই। ঘটনার চার ঘণ্টা পর ডাক্তাররা ইন্দিরা গান্ধীকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। সন্ধ্যায় গোটা দেশে সেই খবর ছড়িয়ে পড়ে। ভুবনেশ্বরের সেই সভা… সেই বক্তৃতা… গোটা দেশবাসীর বারবার মনে পড়ছিল সেটা। মৃত্যুর পদধ্বনি আগেভাগেই পেয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী?

লিখেছেন
Aritra Som
Aritra Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।