নিজের জমিতে গড়ে তুলেছেন জঙ্গল, ফিরিয়েছেন কোটি কোটি টাকার টোপ! কে এই ব্যক্তি?

তেলেঙ্গানার সুরয়াপেট জেলার রাঘবপুরা গ্রাম। সেখানে সত্তর একর জায়গাজুড়ে লক্ষ লক্ষ গাছের সারি। ফুল-ফলে সমৃদ্ধ, জীববৈচিত্র্যে পূর্ণ এক জঙ্গল। এর মধ্যে বেশ কিছু গাছের বয়স পঞ্চাশ বছরেরও বেশি, কিছুর বয়স তিন দশক। তার মধ্যে শয়ে শয়ে ভিন্ন পাখি এবং বন্যপ্রাণীর প্রজাতি।

 

বাইরে থেকে দেখলে দক্ষিণ ভারতের আর পাঁচটা জঙ্গলের মতোই লাগবে। কিন্তু যদি জঙ্গলের ভেতরে প্রবেশ করা যায়, তাহলে অনেক বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যেতে পারে, যা আর কোথাও আপনি পাবেন না।

 

শুরুতেই অবাক করা যে বিষয়টি আবিষ্কার করবেন, তা হল নিরাপত্তা ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। কোনও ঘেরাটোপ নেই, কাঁটাতার নেই, নিরাপত্তারক্ষী নেই। এই জঙ্গলের ওপর বনদপ্তরের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। এই জঙ্গলের একজনই অভিভাবক। একজনই প্রতিপালক। দুশার্লা সত্যনারায়ণা।

 

৬৮ বছর বয়সি দুশার্লা এই জমি কেনেননি, লিজও নেননি। পূর্বপুরুষের রুক্ষ জমিকে নিজের শৈশবজুড়ে চূড়ান্ত পরিশ্রম এবং ভালবাসা দিয়ে এক অপূর্ব জীববৈচিত্র্যপূর্ণ স্থানে পরিণত করেছেন।

 

আরও পড়ুন: মাটির তলায় থাকেন আইনজীবী! কেন এই জীবন বেছে নিয়েছেন তিনি? জানলে চমকে উঠবেন

 

"আমার যখন চার বছর বয়স, তখন থেকেই আমি এই জঙ্গলকে গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছি। এই জমিতে আগে গবাদি পশুরা বিচরণ করত। আমি ওই সময় থেকে গোটা জমিতে বিভিন্ন গাছের বীজ ছড়াতে শুরু করি। ওই বয়স থেকেই আমার প্রকৃতি, আমাদের প্রাকৃতিক যে জগৎ, তার প্রতি অসম্ভব ভালবাসা জন্মায়। সেই কারণেই আমার এই ইচ্ছেটা জন্ম নেয়, যে আমার চারপাশে অসংখ্য গাছের মধ্যে বেড়ে উঠব।"

 

দুশার্লার শৈশব কেটেছে অসংখ্য পশুপাখির সান্নিধ্যে। সেই থেকেই তার মধ্যে গড়ে উঠেছে জীববৈচিত্র্যের প্রতি তাঁর একাত্মতা। দুশার্লা পাটওয়ারি পরিবারের সন্তান, পাটওয়ারিরা হলেন জমিদার। দুশার্লার পরিবারের কাছে প্রায় তিনশো একর জমির মালিকানা ছিল।

 

"উনিশ শতকের চারের দশক পর্যন্ত নিজামরা এই অঞ্চলে রাজত্ব করতেন। আমার পূর্বপুরুষরা ওঁদের অধীনে কাজ করতেন এবং সেই সুবাদে এই জমির ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ ছিল। এই জমিতে মুলত গবাদি পশুর প্রতিপালন এবং চাষবাসের কাজ হতো।"

 

স্বাধীনতার পর নিজামদের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যায় এবং এই জমির মালিকানা দুশার্লার পরিবারের কাছে সম্পূর্ণভাবে চলে আসে। সেই সঙ্গে দুশার্লার কাছে আসে স্বাধীনতা, এই জমিতে নিজের স্বপ্নের পরিবেশ সৃষ্টি করার।

 

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওই জমিতে তাঁর পরিবারের মালিকানা কমতে কমতে এসে দাঁড়ায় সত্তর একরে। তাঁর পূর্বপুরুষেরা বিভিন্ন কারণে এই জমির ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে।

 

"আমার বাবার কাছে যে সত্তর একর জমি পড়েছিল, তাতে আমি বীজ ছড়াতে শুরু করি। আমার বাবা-মা কেউই আমাকে এই কাজটা করা থেকে আটকানোর চেষ্টা করেননি। তাঁরা বুঝেছিলেন, আমি কীভাবে পরিবেশকে রক্ষা করার চেষ্টা করি। অনেকেই এখানে চাষ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু আমি কাউকেই এই জায়গাটা নষ্ট করতে দিইনি।" আজ পঞ্চাশ বছর পর, তাঁর সাধনা, তাঁর পরিশ্রম এবং অগাধ ভালবাসার ফসল হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর জঙ্গল।

 

দুশার্লা তাঁর যৌবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন সারা দেশ ঘুরে বীজ এবং চারা সংগ্রহ করে। একটি খাল খুঁড়েছেন, যাতে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করে তা ব্যবহার করতে পারেন। পুকুর কাটিয়েছেন, যেখানে অনেক মাছের, কচ্ছপের, ব্যাঙের বাস, যে পুকুর পদ্মফুলে পরিপূর্ণ।

 

১৯৮০ সালে তিনি কৃষিবিজ্ঞানে স্নাতক হন এবং 'ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া'-র ফিল্ড অফিসার হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। জীবনে যাইই অর্থ উপার্জন করেছেন, নিজের প্রয়োজনেরটুকু বাদ দিয়ে বাকি সব অর্থ তিনি এই জঙ্গল গড়ে তুলতে ব্যয় করেছেন। শুধু তাই নয়, এই জঙ্গলের কোনওকিছুই ব্যবসায়িক কোনও কাজে কোনওদিনই তিনি ব্যবহার হতে দেননি। এই জঙ্গলের সমস্ত সম্পদ শুধুমাত্র জঙ্গলের বাসিন্দাদের জন্য। এই জঙ্গলে পাঁচ কোটি গাছ, পুকুর, খাল রয়েছে এবং সবকিছুই অক্ষত এবং প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠছে, বাস্তুতন্ত্রের রক্ষা হচ্ছে।

 

প্রলোভন কম ছিল না। এই জমি ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করতে দেওয়ার জন্য অনেক প্রস্তাব পেয়েছেন। এমনকী, একশো কোটি টাকা পর্যন্ত তাঁকে দিতে চেয়েছেন কেউ। কিন্তু তিনি মাথা নোয়াননি। পরিবেশের প্রশ্নে তিনি কোনওভাবেই আপস করতে রাজি নন।

 

তিনি খুব স্পষ্টভাবেই জানাচ্ছেন, এইবার মানুষকে পরিবেশ এবং তার সংরক্ষণের গুরুত্ব বুঝতে হবে। আর আমাদের হাতে বিশেষ সময় নেই। মানুষের কার্যকলাপের ফলে জঙ্গল এবং জীববৈচিত্র্যের খুব ক্ষতি হয়েছে। বন্যপ্রাণীদের জঙ্গল ছাড়া কোনও থাকার জায়গা নেই। তাই জঙ্গলকে রক্ষা করা আমাদের পরিবেশের জন্য, মানুষ এবং বন্যপ্রাণের সহাবস্থান এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখনই যদি আমরা নিজেদের না পাল্টাতে পারি, তাহলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।

 

দুশার্লার মতো মানুষ পৃথিবীর জন্য যে কত প্রয়োজন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ওঁর মতো মানুষের কথা লোকমুখে, সমাজে ছড়িয়ে পড়া খুব প্রয়োজন। যাতে আগামী প্রজন্মের কাছে এক দুর্ধর্ষ দৃষ্টান্ত থাকে, এবং তা তাদের অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে।

 

 

More Articles

;