শুধু দুই বাংলা নয়, ইলিশে দাবি আছে পাকিস্তানেরও! কীভাবে বানানো হয় সুস্বাদু করাচি ইলিশ?

ইলশে গুঁড়ি, ইলশে গুঁড়ি

ইলিশ মাছের ডিম।

ইলশে গুঁড়ি, ইলশে গুঁড়ি

দিনের বেলায় হিম।

বর্ষা এসেছে ঝমঝমিয়ে। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র বললেন, "এই ভরা বর্ষায় বাজার থেকে ইলিশ হাতে কেউ যদি রাজসভা পর্যন্ত আসতে পারে, আর কোনও লোক যদি তার দাম জিজ্ঞেস না করে, তবে সে মোটা পুরস্কার পাবে।" গোপাল ভাঁড় বলল, "আমি পারব মহারাজ", বলে, দিগম্বর হয়ে বেরিয়ে পড়ল ইলিশ আনতে। গোপাল ভাঁড়ের এই গল্প আমাদের সকলেরই জানা।

বর্ষা এল বলে, আর বৃষ্টি পরা মানেই ইলিশের মরশুমি ডাক। ইলিশের নাম শুনলেই বাঙালির জিভে জল আসে। ইলিশ খেতে বাঙালির কোনও উপলক্ষ প্রয়োজন হয় না। ভেজে, ভাপিয়ে, সর্ষে দিয়ে; আরও কতভাবে যে ইলিশ খাওয়া হয়, তার হিসেব বাঙালি রাখেনি কোনওদিন। রবীন্দ্রনাথ থেকে স্বামী বিবেকানন্দ পর্যন্ত- ইলিশ খেতে ভালবাসতেন সকলেই। আর ইস্টবেঙ্গল জিতলে সমর্থকদের উদযাপন তো হয় ইলিশেই। সরস্বতী পুজোর দিন ধান-সিঁদুর-দুব্বো দিয়ে বরণ করে জোড়া ইলিশ ঘরে তোলা হয় অনেক বাড়িতেই। নিয়ম এমন, এই বরণ করার দিন থেকে ইলিশ মাছ খাওয়ার শুরু বাঙালি বাড়িতে, আর তা শেষ হয় দশমীর দিন জোড়া ইলিশ খেয়ে। তারপর আবার পরের মরশুমের অপেক্ষা।

বঙ্গোপসাগরের ব-দ্বীপ অঞ্চল, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নদীর মোহনা থেকে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে ইলিশ মাছ ধরা হয়। এটি সামুদ্রিক মাছ হলেও বড় নদীতে ডিম দেয়। ডিম ফুটে গেলে ও বাচ্চা বড় হলে (যাকে বাংলায় বলে জাটকা) ইলিশ মাছ সাগরে ফিরে যায়। সাগরে ফিরে যাওয়ার পথে জেলেরা এই মাছ ধরে। এই মাছের অনেক ছোট ছোট কাটা রয়েছে। যদিও ইলিশ লবণাক্ত জলের মাছ বা সামুদ্রিক মাছ, বেশিরভাগ সময় সে সাগরে থাকে, কিন্তু বংশবিস্তারের জন্য প্রায় ১২০০ কিমি দূরত্ব অতিক্রম করে ভারতীয় উপমহাদেশে নদীতে পাড়ি জমায়। বাংলাদেশে নদীর সাধারণ দূরত্ব ৫০ কিমি থেকে ১০০ কিমি। ইলিশ প্রধানত বাংলাদেশের পদ্মা (গঙ্গার কিছু অংশ), মেঘনা (ব্রহ্মপুত্রের কিছু অংশ) এবং গোদাবরী নদীতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এর মাঝে পদ্মার ইলিশের স্বাদ সবচেয়ে ভাল বলে ধরা হয়।

আরও পড়ুন: মাংস মদিরা সহযোগে ‘বর্ধমান স্ট্যু’, যখন তখন ফিরে যাওয়া যায় ঔপনিবেশিক ভারতে আজও

ইলিশ না চিংড়ি, এ যেমন ঘটি ও বাঙালের তর্কের বিষয়, তেমনই পদ্মা আর গঙ্গার ইলিশের মধ্যে কোনটা সেরা, তা নিয়েও তর্কের অন্ত নেই। এটি প্রায় লাখ টাকার প্রশ্ন। এই দু'পারের ইলিশ নিয়ে তর্ক অন্তহীন। খাদ্যরসিকরা মনে করেন, নদীর ইলিশ আর সাগরের ইলিশের মধ্যে স্বাদেও বিস্তর পার্থক্য হয়। কেন? আসলে নদীর, এক্ষেত্রে পদ্মা ও মেঘনা অববাহিকায় জলের প্রবাহের ধরন আলাদা। ফলে ইলিশের স্বাদেও পার্থক্য হয়। পদ্মায় সাধারণত তিন রকমের ইলিশ মেলে। সেগুলি হল, পদ্মা ইলিশ, চন্দনা ইলিশ, ও গুর্তা ইলিশ। অন্যদিকে গঙ্গায় মেলে দুই ধরনের ইলিশ- খোকা ইলিশ ও বড় ইলিশ। ছোট ইলিশকে বলা হয় খোকা ইলিশ।

গঙ্গা ও পদ্মার ইলিশের মধ্যে বাহ্যিক পার্থক্য হলো, গঙ্গার ইলিশের গায়ে সোনালি আভা থাকে, অন্যদিকে পদ্মার ইলিশের গায়ে থাকে গোলাপি আভা। তবে, পদ্মা ও গঙ্গা- দুই ইলিশের ক্ষেত্রেই ডিম ছাড়ার আগে মাছের স্বাদ থাকে তুঙ্গে। আর মৎস্যজীবীদের অভিজ্ঞতা, ভাদ্র মাসে ইলিশের পেটে ডিম থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এমনিতে চলতি ধারণা হলো, পদ্মার ইলিশ চেহারায় মনোমুগ্ধকর হলেও স্বাদে কিন্তু খানিক এগিয়ে গঙ্গার ইলিশ। এই সিদ্ধান্তের সত্যতা কতটা, জানা যায় না।

তবে, সম্প্রতি এক নতুন খবরে জানা গেছে, সিন্ধের সঙ্গে ইলিশ মাছের সম্পর্কের কথা। সিন্ধ, যা এখন পাকিস্তান নামে পরিচিত। আমরা অনেকেই ইলিশ ভাপা, সর্ষে ইলিশ, ইলিশ ভাজা, বেগুন ও জিরে দিয়ে ইলিশ মাছ রান্না খেয়েছি। কিন্তু কখনও কি শুনেছেন যে, আদা, রসুন এবং পেঁয়াজ দিয়ে ইলিশ মাছ রান্না হয়? এ যেন বাঙালি মৎস্য-প্রেমিকের মাথায় বজ্রাঘাত। কিন্তু এই ভিন্নস্বাদের ইলিশ আজ একটা পরম্পরার অন্তর্গত হয়েছে। বিভিন্ন দেশের শেফরা এই ধরনের ইলিশের পদকে একটা ব্র্যান্ড হিসেবে ঘোষণা করছেন।

তাহলে কী এই সিন্ধ প্রদেশের ইলিশ মাছের রহস্য? এর পিছনে একটি ধর্মীয় কাহিনি জড়িত। বাংলার বটতলা থেকে ইস্টবেঙ্গলি ময়দান পর্যন্ত ইলিশের গল্পে ঝলমল। গুমো বাতাস ভিজতে না-ভিজতেই পদ্মার ইলিশের জন্য প্রাণ আনচান। কিন্তু ইলিশ-বাহন দেবতাটি যে বাংলার নন! গৌরবর্ণ মুখে বুক-লুটোনো তাঁর ধবধবে সাদা দাড়ি, ইলিশের রূপোলি পিঠে বিছানো পদ্মে তাঁর আসন, তিনি ঝুলেলাল! আরব সাগরে নামা সিন্ধু নদের ইষ্টদেবতা তিনি। আপাতত পাক নাগরিক! কিন্তু ঝুলেলালকে (যাঁর আর এক নাম উদেরোলাল) ভূগোল বা ধর্মের সীমানায় বাঁধে, কার সাধ্যি! বিশ্বের যেখানেই সিন্ধিদের বাস, সেখানেই তিনি। তবে পাকিস্তানের সুফি রাজধানী সিন্ধ প্রদেশেই তাঁর রমরমা। তাতে হিন্দু-মুসলিম ভেদ নেই। মুসলমানের চোখে তিনি জিন্দাপির, দরিয়াপির!

সিন্ধুর দু’পাশ ছাপিয়ে বহু দূর যাঁর এমন বিস্তার, সেই ঝুলেলালের বাহন ইলিশ। যাদের নাকি ইলিশ ছাড়া জামাইয়ের মুখে ভাত রোচে না, বউয়ের মুখের ঝাল মরে না, সেই বাংলায় কিন্তু তার এই মর্যাদা জোটেনি। পদ্মার দেবীত্ব নেই, কিন্তু তার সোদর বোন গঙ্গারও বাহন মকর। ইলিশ সেখানে ব্রাত্য। পুরাণমতে, ইলিশ বরুণ দেবতার বাহন। আর কী আশ্চর্য, সিন্ধি বিশ্বাসে ঝুলেলাল সেই বরুণদেবেরই অবতার! বিপন্ন মৎস্যজীবীদের ডাকে মানবদেহ ধরেছিলেন জলের দেবতাই।

সিন্ধ অবশ্য ইলিশকে ইলিশ নামে চেনে না, চেনে ‘পাল্লা’ বলে। সিন্ধুর বুড়ো জেলেরা বলেন, আরব সাগর থেকে মিঠে জলে ঢোকার সময়ে পাল্লার গা থাকে কুচকুচে কালো। উজান বেয়ে যত সে তার মুর্শিদের (গুরু) থানের দিকে এগোয়, তত বাড়তে থাকে তার জেল্লা। আরব সাগর থেকে খানিক ওপরে উঠলে হলদে পাথরে ছাওয়া লক্ষ পিরের কবরিস্তান থাট্টা। একটা সময় ছিল, যখন থাট্টার হলুদ পাথরে মাথা ছুঁইয়ে পাল্লার ঝাঁক এগোত উত্তরে। জামশোরো হয়ে সেহওয়ানে শাহবাজ কলন্দরের দরগায় মাতন দেখে উজানে, ঝুলেলালের সুক্কুরে গিয়ে যখন সে পৌঁছত, পাল্লার শরীর তখন রুপোয় মোড়া।

এক সময় নাকি মোহনা থেকে হাজার কিলোমিটার উজিয়ে পাঞ্জাবের মুলতান পর্যন্ত চলে যেত পাল্লা। ফরাক্কা ব্যারাজ হওয়ার আগে যেমন গঙ্গা-পদ্মার ইলিশ যেত কাশীদর্শনে। এখন পথ রুখেছে বাঁধের পর বাঁধ। তার ওপরে গত দু’দশক ধরে সিন্ধুতে মরশুমি জলের ধারা শুকিয়েছে। ফলে সাগর ছেড়ে আর নদে ঢুকছে না ইলিশের ঝাঁক। তা বলে পাল্লার কদর কিন্তু এতটুকুও কমেনি! বাড়িতে কুটুম এলেই পাতে পাল্লা চাই, যে কোনও পরবে চাই পাল্লা। সিন্ধি বিশ্বাস আর রুচির পরতে-পরতে জড়িয়ে ঝুলেলাল। তার জন্য যদি ইরান বা মায়ানমার থেকে আমদানি করতে হয়, তবে তা-ই হোক!

তবে সিন্ধিরা মোটেই সর্ষে দিয়ে ইলিশ ভাপান না। কালো জিরে-ফোড়ন দিয়ে বেগুন চিরে রাঁধেন না ইলিশের ঝোল। তেল-ইলিশ? উঁহু! মোটেই না। বাংলাদেশে পেঁয়াজ-রসুন দিয়ে ইলিশের ঝাল রাঁধার চল আছে বহু দিন ধরে। কিন্তু সিন্ধিরা মাছ টুকরোই করেন না। বরং গোটাটাই ডানার পাশ দিয়ে চিরে ভিতরে পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ধনেগুঁড়ো, টক দই, আমচুর বা তেঁতুলের পুর দিয়ে ভাজেন, যতক্ষণ না তেল ছাড়ছে, গোটা তল্লাট ম-ম করছে সুঘ্রাণে। তার পর টমেটো-ধনেপাতা ছড়িয়ে পরিবেশন। এইরকম ছিল সিন্ধের সঙ্গে ইলিশের সম্পর্ক।

তাই জোর গলায় বলাই যায়, ইলিশ মাছের ওপর শুধু এপার-ওপার বাংলার অধিকার নয়, সেই জায়গায় আরেকটি নাম নিজের জায়গা করে নিয়েছে, তা হলো করাচি ইলিশ বা পাল্লা। ইলিশের আকর্ষণ শুধু ভারত, পাকিস্তান বা বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, সাহেবরাও এই ইলিশের পদ খুব পছন্দ করেন।

একটা সময় ছিল, যখন মোহনায় ছোট ইলিশ ধরার উৎপাতে গঙ্গা-পদ্মায় ইলিশের খুব টানাটানি হয়েছিল। অসময়ে, ক্ষতিকর জাল দিয়ে ইলিশ ধরা বন্ধ করে সেই দুর্দিন অনেকটাই কেটেছে। গঙ্গার ইলিশও বিপর্যয়ের মুখে, গবেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গায় যতদিন না দূষণ কমবে ততদিন গঙ্গার ইলিশ পাওয়া মুশকিল। কে জানে, হয়তো এদেশ আর ওদেশেও কোনও রাস্তা বেরিয়ে যাবে ঠিক। গঙ্গা আবার দূষণমুক্ত হবে, সিন্ধু আবার জলে ভরবে, পাল্লার ঝাঁক ফিরবে রূপোলি ঝিলিক তুলে। পথ দেখাবেন সেই তিনি, যিনি অক্লেশে দরিয়া পার করে দেন শরণাগতর ভেলা, ঝুলেলাল, বেড়া (ভেলা) পার!

 

More Articles

;