কলকাতার বাতাসে বিষ! উদাসীন থেকে কত বড় বিপদ ডেকে আনছে শহরবাসী

বাতাসে PM 2.5 ধূলিকণার নিরিখে কলকাতা গোটা বিশ্বে এই মুহূর্তে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। প্রথম স্থানেও কোনও চমক নেই। শিল্ড দেশের বাইরে যায়নি। প্রথম স্থান অধিকার করেছে রাজধানী দিল্লি।

Satyaki Tat
৩ মিনিট
কলকাতার বাতাসে বিষ! উদাসীন থেকে কত বড় বিপদ ডেকে আনছে শহরবাসী

তিলোত্তমা কলকাতা। কলকাতা দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী, সেই সঙ্গে ক্রিকেট এবং ফুটবলপাগল এই শহর। ভীষণভাবে রাজনৈতিকও। এখন তো আবার রাজনীতির বাইরে আর কোনওকিছুতেই কলকাতার মন নেই। রাজনীতি, বা আরও স্পষ্ট করে বললে রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতি। কিছুদিন পরেই আবার পুজোও এসে যাচ্ছে। বাঙালি এবং কলকাতা ভীষণ ব্যস্ত করে পড়বে। সবই ঠিক আছে, কিন্তু এই ভীষণ ব্যস্ততার মধ্যেই একটা চিন্তার কারণ থেকে যাচ্ছে, বা বলা ভালো, চিন্তার কারণ আরও গভীর হচ্ছে, বৃদ্ধি পাচ্ছে। কলকাতাবাসীর ফুসফুস একেবারে ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তাদের বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে তারা সেদিকে আর ঠিক নজর দিতে পারছে না। এইবার কি দেবেন?

কিন্তু কেন? নজর দেওয়ার মতো কোনও ঘটনা ঘটেছে নাকি? হ্যাঁ, ঘটেছে। যদিও নতুন কিছু নয়। কিছু বছর আগেও এই মুকুট আমাদের শহরের মাথায় ছিল। আবার ফিরে এসেছে। বাতাসে PM 2.5 ধূলিকণার নিরিখে কলকাতা গোটা বিশ্বে এই মুহূর্তে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। প্রথম স্থানেও কোনও চমক নেই। শিল্ড দেশের বাইরে যায়নি। প্রথম স্থান অধিকার করেছে রাজধানী দিল্লি।

Global Air report on Air Quality and Health in Cities-এর নতুন রিপোর্ট অনুযায়ী আমাদের শ্বাসযন্ত্রের জন্য সবথেকে ক্ষতিকারক অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণা PM 2.5 দিল্লি এবং কলকাতার বাতাসে সবথেকে বেশি পাওয়া গেছে। ১৪তম স্থানে আছে দিল্লী। দিল্লির বাতাসে প্রতি কিউবিক মিটারে পাওয়া গেছে ১১০ মাইক্রোগ্রাম PM 2.5। কলকাতার বাতাসে যার পরিমাণ ৮৪ মাইক্রোগ্রাম। WHO-এর নির্ধারিত নিরাপদ PM 2.5-এর মাত্রা কত জানেন? পাঁচ মাইক্রোগ্রাম। এই রিপোর্টে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের সংস্পর্শে আসার নিরিখে যদিও দেশের কোনও শহর প্রথমে নেই। সেই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে সাংহাই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দিল্লিবাসীর নাভিশ্বাস! পরিবেশ ধ্বংসের পরিণাম ফলছে, বাসের অযোগ্য হবে রাজধানী?

প্রতি বছর শীতের আগমন ঘটলেই দিল্লির বায়ু আরও দূষিত হয়ে যায়। প্রায় বাসের অযোগ্য হয়ে ওঠে দিল্লির বাতাস। প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয় পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশে চাষিদের ফসলের গোড়া পোড়ানো।

এবার একটু পরিসংখ্যানে আসা যাক। অস্বাস্থ্যকর বায়ু বা দূষিত বায়ু ফুসফুসে প্রবেশ করার কারণে গোটা বিশ্বে গড়ে চল্লিশ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। এই চল্লিশ লক্ষর মধ্যে দশ লক্ষই ভারতীয়। আমাদের দেশে দূষণ এতটাই বেশি এবং সরকার তা কমাতে এতটাই ব্যর্থ যে, WHO-র নির্ধারণ করা মাত্রাকে (পাঁচ মাইক্রোগ্রাম) মানা সম্ভব হয়নি এই দেশে। তা বাড়িয়ে করা হয়েছে চল্লিশ মাইক্রোগ্রাম। কিন্তু তাতেও বিশেষ লাভ কিছু হয়নি। মানুষের প্রাণ তাতে বাঁচানো যায়নি। পাশ করার নম্বর একটু এদিকওদিক করে হয়েতো নিজেদের সান্ত্বনা দিতে সুবিধা হয়েছে Central Pollution Control Board-এর কর্তাদের।

বিভিন্নভাবে নাগরিকদের স্বাস্থ্যহানি হওয়া সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারকেই সদর্থক কোনও ভূমিকা নিতে দেখা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যবিদ থেকে শুরু করে বিজ্ঞানী সবাই বারবার বলছেন যে, দূষিত বায়ু থেকে শ্বাসজনিত রোগ থেকে শুরু করে ক্যানসার, হৃদযন্ত্রের সমস‍্যা- সবকিছু হতে পারে; এবং যদি একটু সময় নিয়ে নিজেদের কাজ করেন সরকারি অধিকর্তারা, তাহলে শুধুমাত্র সরকারি হাসপাতালের আপৎকালীন ওয়ার্ডে গেলেই তাঁরা বুঝবেন যে, বায়ুদূষণের কারণে কত মানুষ ভুগছেন। হয়তো সেই সংখ্যার সিংহভাগ আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষ বলেই এই মুহূর্তে গা করছেন না তাঁরা।

কিন্তু আর কত দিন? আপনারা রাস্তায় বেরিয়ে খেয়াল করেন কি না জানা নেই, তবে এখনও কলকাতার রাস্তায় ভূরি ভূরি ট্যাক্সি, বাস, লরি নিশ্চয়ই দেখতে পাবেন, যারা সম্পূর্ণভাবে কালো ধোঁয়া ছাড়ে, তার পরিমাণ এতটাই থাকে যে, শুধু স্বাসকষ্ট হয়, তা নয়, তার সঙ্গে দৃশ্যমানতাও কমে যায় কিছু সেকেন্ডের জন্য। খুব সহজেই বলে দেওয়া যায় যে, ওগুলো পনেরো বছরের পুর‌নো বাহন। আইন অনুযায়ী যার রাস্তায় নামারই কথা নয়। কিন্তু আইন বলবৎ কে করবে? যাদের করার কথা, তারা তো দর্শকের ভূমিকা পালন করে। কিছু চালকের জরিমানা হয়, ব্যস। যদিও তারা গ্রিন বেঞ্চের সামনে দাবি রাখেন যে, তারা কাজ করছেন, কিন্তু সেই দাবি রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিশ্রুতির মতোই ফাঁপা।

তাছাড়াও সার্বিকভাবে কলকাতার বায়ুকে দূষণমুক্ত করার ছিটেঁফোঁটা পরিকল্পনাও যদি সরকারের থাকত, তাহলে তারা রাস্তাঘাটে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে, যানপরিপল্পনা হতো অনেক উন্নত। যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা নির্মাণকাজে নজরদারি চলত, যেখানে-সেখানে গাছ কাটা, পুকুর বোজানো বন্ধ হতো। সেই সঙ্গে নজরদারি থাকত কলকারখানাগুলির ওপরেও, যারা ব্যাপক হারে দূষণ ছড়ায়। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষকে সচেতন করার কাজ, যা কোনওভাবেই করা হয় না।

সবশেষে বলা দরকার, সাধারণ মানুষের কথা। তাঁরা বিষাক্ত বায়ু সেবন করছেন, কষ্ট পাচ্ছেন, কিন্তু তাঁর পরেও যদি সেই বিষয়ে উদাসীন থেকে অন্যান্য বিষয়েই নিজেদের সময় ব্যয় করেন, সেক্ষেত্রে অবস্থার উন্নতি হওয়া বেশ কঠিন।

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বাঘের টানে রণথম্ভোরে, ৩৫ একর জমিতে তৈরি করলেন বন

Ranthambore tiger conservation: তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপর কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।

জলবায়ু বদল শুধু প্রকৃতির বিপদ নয়, ভারতের অর্থনীতির ভিতও নড়বড়ে করে দিচ্ছে

climate change and economy: ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২১টি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি খতিয়ে দেখে একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যদি মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসও বাড়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক উৎপাদন দক্ষতা কমে যায় প্রায় ৩.২২ শতাংশ।

নেপাল বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

Climate Justice for nepal: ২৬ অগাস্ট লাংটাং লিরুং-এর হিমবাহ ধসে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—নিহত ১,৩৪৪, নিখোঁজ ৪,৮৮৭। পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আছে মাত্র ৮২২ মিলিয়ন ডলার।নেপালের দাবি, চিন-ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায় আছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায়।

নেপালের হড়পা বান থেকে বেঁচে ফিরলেন যাঁরা, তাঁদের চোখে ২৬ অগাস্ট

Nepal flash floods 2026: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬-এ নেপালের হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু মানুষ বেঁচে ফিরেছেন। কেউ এক কাপ চায়ের বিরতির জন্য, কেউ গাড়ির একটা রিভার্স গিয়ারের কারণে, কেউ ডালপালা ছড়ানো একটা আমগাছ আঁকড়ে ধরে, আবার কেউ কেবল ১৫ সেকেন্ডের দৌড়ে ছিনিয়ে এনেছেন নিজের শ্বাস। মৃত্যু খুব কাছ থেকে অনুভব করে ফেরা সেই মানুষগুলির অভিজ্ঞতায় রইল রাসুয়া আর নুয়াকোটের সেই সকালের কথা।

হিমালয়ের বরফ গলছে দ্বিগুণ হারে, নেপালের বিপর্যয়ের বিজ্ঞান কী বলছে?

Nepal Flood 2026: বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ৪৫০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ অঞ্চলের অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাঁচ মাস পর সেই সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠল নেপালের উপত্যকায়।

ছয় দশকে কতটা সফল ভারত-নেপাল গান্ডাকচুক্তি?

Gandak dam history: নেপালের হিমবাহ থেকে পাথর ধসের পর জল নেমেছে ত্রিশূলী-কালীগণ্ডক হয়ে বিহারে। বাল্মীকিনগর বাঁধের ৩৬টি গেট খুলে প্রাণ বাঁচল বহু মানুষের। কিন্তু, ১৯৫৯ সালের গান্ডাক চুক্তি কি সত্যিই নেপাল ভারত দুই দেশের ‘সমন্বিত স্বার্থ’ রক্ষা করল? নেপালের তরাইয়ে জল মেলে না, ক্ষতিপূরণ মেলে না কৃষকদের। ৬০ বছরের পুরনো বাঁধ প্রকল্পকে নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

নেপালের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মহিলারাই, ঝুঁকিতে ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন

Nepal Flash Floods: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানে প্রায় ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন ঝুঁকিতে। বন্যার পর তাঁদের সামনে কী কী স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকার সংকট তৈরি হয়েছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নারীদের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ জরুরি?