ডাইনোসরের অবলুপ্তির পর জন্মায় এই ফুল! রডোডেনড্রনের এই তথ্যগুলি চমকে দেবে

Rhododendrons Flower: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া সহ আরও অনেক দেশ রডোডেনড্রন এবং আজলিয়ার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। ভারতও রডোডেনড্রন রপ্তানি করে।

সুতোবাঁধা সমস্ত লাল-সাদা বেলুনকে রডোডেনড্রনগুচ্ছ বলে মনে করাই যায়, ফুল ফোটার কালে উষ্ণতম শহর ছেড়ে দৌড়ে যাওয়াই যায় পাহাড়ে, রডোডেনড্রনের খোঁজে। তবে সেই মুগ্ধতার আয়ু বোধহয় ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে। পাহাড়ি ঝোপে ঝাড়ে ফুটে থাকা এই ফুলের গাছটি বিপন্ন হয়েছে ক্রমেই। সারা বিশ্বে রডোডেনড্রনের প্রায় ১,০০০টি প্রজাতি থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। উত্তর আমেরিকা থেকে শুরু করে জাপান, ওইদিকে অস্ট্রেলিয়াতেও পাওয়া যায় রডোডেনড্রন। তবে, রডোডেনড্রনের বৈচিত্র্যের কেন্দ্র মূলত দক্ষিণ এবং পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের মধ্যেই অবস্থিত। আরও বিশেষভাবে বলা যায়, হিমালয় পর্বতমালা যেটি মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে পড়ে, সেটিই রডোডেনড্রনের স্থানীয় বৈচিত্র্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

উৎপত্তি, বন্টন এবং বাসস্থান

রডোডেনড্রন ফুলটি এরিক্যাসি পরিবারের। আজ থেকে ৬৮ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে যখন ডাইনোসররা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তখন সম্ভবত এই এরিক্যাসি পরিবারের প্রথম আবির্ভাব। রডোডেনড্রন পাতার জীবাশ্ম খতিয়ে দেখা গেছে, সেগুলি আজ থেকে ৫০ মিলিয়ন বছর আগেকার। রডোডেনড্রনের পূর্বপ্রজাতি সম্ভবত ক্যামেলিয়াস (যার মধ্যে পড়ে চা, ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস) এবং ম্যাগনোলিয়াস (ম্যাগনোলিয়াসি)। সুগন্ধি হলুদ-কমলা চাঁপাফুল ম্যাগনোলিয়াস নামক উদ্ভিদের পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।

রডোডেনড্রন গাছ সাধারণত অনেক উচ্চতাতেই দেখা যায়, তবে কিছু প্রজাতি যেমন রডোডেনড্রন আর্বোরিয়াম, পাহাড়ের নিচু ঢালেও তাদের দেখা যায়। হিমাচল প্রদেশে রডোডেনড্রন একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় এত সাধারণ গাছ হয়ে গেছে যে বিশেষভাবে এটির নামকরণ করা হয়েছে। বার্চ-রোডোডেনড্রন স্ক্রাব হচ্ছে এমন একটি উদ্ভিদ যা হিমাচল প্রদেশের জোগিন্দর নগর-মান্ডি অঞ্চলে দেখা যায়।

হিমাচল প্রদেশের মান্ডি জেলায়, রডোডেনড্রন আর্বোরিয়াম উচ্চ হিমালয়ের গাছ। এই গাছপালা ৬০০ থেকে ২,২০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে দেখা যায়। উত্তর-উত্তর-পশ্চিম এবং পশ্চিমমুখী ঢাল বরাবর এই গাছ দেখা যায় যা কেবল বিকেলে এবং সন্ধ্যায় সূর্যালোক পায়। নিম্ন উচ্চতায় রডোডেনড্রন আর্বোরিয়ামের উপস্থিতি দেখা যায় পশ্চিম হিমালয় অঞ্চলের উত্তর-পশ্চিম দিকে।

হিমালয়ের দক্ষিণে পাওয়া রডোডেনড্রনের একমাত্র প্রজাতি হলো রডোডেনড্রন আর্বোরিয়াম। প্লাইস্টোসিন হিমবাহের সময় বা তারও আগে হিমালয় অঞ্চল থেকে সম্ভবত পশ্চিমঘাটে পৌঁছনো বহু প্রজাতির অবশিষ্ট উদ্ভিদের মধ্যে এটি একটি। এটি সাধারণত নীলগিরি রডোডেনড্রন নামে পরিচিত এবং বৈজ্ঞানিকভাবে রডোডেনড্রন আর্বোরিয়াম নীলগিরিকাম নামে একটি স্থানীয় উপপ্রজাতি হিসাবে পরিচিত। তবে শুধু নীলগিরি পর্বতে নয়, পালানি এবং আনামালাইতেও এই গাছ পাওয়া যায়। পশ্চিমঘাটের রডোডেনড্রন আর্বোরিয়াম আবার খোলা পাহাড়ি তৃণভূমিতে পাওয়া যায়। সেখানে জোরালো বাতাস, ভারী বৃষ্টিপাত এবং দাবানলের সঙ্গে খাপ খাইয়েই সে বেঁচে থাকে।

আরও পড়ুন- বছরে একবার নিশুতি রাতে জন্ম নেয় ব্রহ্মকমল! হিমালয়ের ফুল ঘিরে রয়েছে নানা রহস্য

রডোডেনড্রন এবং মানুষ

রডোডেনড্রন গাছের উজ্জ্বল রঙের বড় ফুল সারা বিশ্বজুড়েই মানুষকে মুগ্ধ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন এবং পশ্চিম ভার্জিনিয়াতে স্টেট ফ্লাওয়ার ঘোষণা করা হয় রডোডেনড্রনকে। ভারতে হিমাচল প্রদেশ এবং নাগাল্যান্ডের রাজ্যফুল এটি। উত্তরাখণ্ড এবং সিকিমে এটি রাজ্যগাছ। কিছু প্রজাতির ফুল ঐতিহ্যগত আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয় এবং খাওয়াও হয়। উদাহরণস্বরূপ, মান্ডিতে, রডোডেনড্রন ফুলগুলি প্রচুর পরিমাণে সংগ্রহ করে, রোদে শুকিয়ে বিভিন্ন রান্নায় ব্যবহার করা হয়। রডোডেনড্রনের চাটনিও তৈরি হয়।

আরও গবেষণার প্রয়োজন

তবে নীলগিরি রডোডেনড্রন সহ অন্য সমস্ত রডোডেনড্রন নিয়েই গবেষণা প্রয়োজন। দশ-হাজার বছর ধরে হিমালয়ের পূর্বপ্রজাতির থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পরও, একই প্রজাতির গাছ এরা হতে পারে না। এর রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এবং বাসস্থান বলে দিচ্ছে গাছটি স্থানীয়ভাবে অভিযোজিত হয়েছে এবং হিমালয়ের রডোডেনড্রন থেকে এটি কিঞ্চিৎ আলাদা।

রডোডেনড্রনের কিছু প্রজাতি বিষাক্ত বলেও পরিচিত। তাদের ফুল থেকে উৎপন্ন মধুকে 'পাগলা মধু' বলা হয়। নীলগিরি রডোডেনড্রনও বিষাক্ত বলে দাবি করেছে বিভিন্ন সূত্র। বাগানে বা বাড়িতে নীলগিরি রডোডেনড্রন লালন-পালন ও পরিচর্যা করার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সতর্ক করা হয়, যেখানে শিশু, কুকুর এবং বিড়াল আছে সেখানে এই গাছ না লাগানোই ভালো। পশ্চিমঘাট এবং হিমালয়ের সংগৃহীত বন্য নমুনার ভিত্তিতে এই বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করা উচিত কারণ এটি সকলেরই জানা যে, স্থানীয় পরিবেশ অনুসারে উদ্ভিদের বিষাক্ততা পরিবর্তিত হতে পারে।

উত্তরাখণ্ডে রডোডেনড্রন গাছের ফুলও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এই রাজ্যে সাধারণত হিমালয়ের বসন্তকালের সঙ্গে মিল রেখে মার্চ এবং এপ্রিল মাসে রডোডেনড্রন ফুল ফোটে। ইদানীং ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসেও ফুল ফুটতে দেখা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব পড়ছে এই গাছগুলির উপর। রডোডেনড্রনের উপর নির্ভরশীল মানুষদের আর্থ-সামাজিকভাবেও প্রভাবিত করছে এই ঘটনা। হিমালয়ের অন্যান্য অংশে এবং বিভিন্ন প্রজাতির ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটছে কিনা তা নিয়ে আরও গবেষণা করা উচিত।

আরও পড়ুন- ফুল ফোটে ১২ বছরে মাত্র একবার, কেবল এদেশেই! রহস্যময়ী নীলকুরিঞ্জিকে দেখতে কেন ছুটে আসেন মানুষ

সংরক্ষণ

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার অনুসারে, শত শত রডোডেনড্রন প্রজাতি সংরক্ষণ-নির্ভর। একটি প্রজাতি (R retrorsipilum) ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত। আরেকটি বন্য অঞ্চলেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ছত্রিশটি প্রজাতি ভয়াবহ বিপন্ন। ঊনত্রিশটি প্রজাতি বিপন্ন। দুশো একচল্লিশটি প্রজাতি অরক্ষিত এবং ছেষট্টিটি প্রজাতি বিপদের মুখে। এর অর্থ, বিশ্বের রডোডেনড্রন প্রজাতির ৩০-৪০ শতাংশেরই সংরক্ষণ দরকার।

বন উচ্ছেদ এবং জলবায়ু পরিবর্তনই এই বিপদের মূলে। অনেক হিমালয় প্রজাতির রডোডেনড্রন ঢাল বরাবর বেড়ে উঠতে পছন্দ করে। বন ধ্বংসের ফলে সৃষ্ট ভূমিধস এই গাছগুলির বেঁচে থাকার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। পাইনের পাতা অত্যন্ত দাহ্য হওয়াতে বনে আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তাতে রডোডেনড্রনও ধ্বংস হয়ে যায়। নীলগিরি রডোডেনড্রন যেহেতু পাহাড়ি তৃণভূমিতে হয়, তাই এই তৃণভূমির সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ এখন।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও বন্য রডোডেনড্রন ধ্বংসের একটি কারণ হতে পারে। সূত্রের মতে, রডোডেনড্রন এবং আজলিয়ার বার্ষিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ১১০ মিলিয়ন ডলার। বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ হচ্ছে বেলজিয়াম এবং বৃহত্তম আমদানিকারক হলো নেদারল্যান্ডস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া সহ আরও অনেক দেশ রডোডেনড্রন এবং আজলিয়ার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। ভারতও রডোডেনড্রন রপ্তানি করে।

ডাইনোসর হারানোর পরেই আবির্ভূত হয়েছিল রডোডেনড্রন। হিমালয় অস্তিত্বে আসার আগেই ব্যাপকভাবে তার বিস্তারও ঘটেছিল। উদ্ভিদের জগতের প্রাচীন এই বাসিন্দা প্রকৃতপক্ষেই 'পাহাড়ের রত্ন'। তবে, রত্নের যোগ্য দেখভাল কি হচ্ছে আদৌ? সঠিক সংরক্ষণ পরিকল্পনার অভাবে, রডোডেনড্রন ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে না তো?

More Articles