মমতা বনাম জুনিয়র ডাক্তার! বৈঠক বাতিলের পর স্নায়ুযুদ্ধে কে কোথায় দাঁড়িয়ে?

পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণ, স্নায়ুযুদ্ধে এদিন সকালে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু এরপর কী হবে? তাকিয়ে ছিল সব পক্ষই। কিন্তু কোনো সমাধানসূত্রেই পৌঁছনো গেল না।

Tanvia Barua
৩ মিনিট
মমতা বনাম জুনিয়র ডাক্তার! বৈঠক বাতিলের পর স্নায়ুযুদ্ধে কে কোথায় দাঁড়িয়ে?

বার বার তিনবার। ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলার জন্য এর আগেও দু'বার সময় দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথমবার মমতা অপেক্ষা করে বাড়ি ফিরে যান। জুনিয়র ডাক্তাররা জাননি। দ্বিতীয়বার জুনিয়র ডাক্তাররা নবান্ন অবধি পৌঁছলেও সাত তলায় ওঠেননি। তার কারণ লাইভ স্ট্রিমিং-এর বিষয় সহমতে আসা যায়নি। অবশেষে সেই বৈঠক নবান্নে নয়, বৈঠক স্থির হলো কালীঘাটে। ৩২ জন জুনিয়র ডাক্তারই সেই বৈঠকে অংশ নিতে এল। কিন্তু বারেও, বৈঠকে লাইভ স্ট্রিমিং নিয়ে ফের জটিলতা হল। বৃষ্টিমাথায় ভিজছেন চিকিৎসকরা, মুখ্যমন্ত্রী মুখ্যসচিব তাঁদের বারবার অনুরোধ করছেন বৈঠকে যোগ দিতে। বলছেন, মিনিটস সই করে দেওয়া হবে। তবুও, দাবিতে অনড় চিকিৎসকরা। শেষমেশ ভেস্তেই গেল বৈঠক।

পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণ, স্নায়ুযুদ্ধে এদিন সকালে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু এরপর কী হবে? তাকিয়ে ছিল সব পক্ষই। কিন্তু কোনো সমাধানসূত্রেই পৌঁছনো গেল না।

গত মঙ্গলবার বিকেল ৫টার মধ্যে কাজে ফিরতে হবে জুনিয়র ডাক্তারদের এমন নিদান দিয়েছিল স্বয়ং সুপ্রিম কোর্ট। চিকিৎসকরা কাজে তো ফেরেননি বরং ৬টি দাবি সামনে রেখে স্বাস্থ্য ভবনের সামনে ধর্না শুরু করেছিলেন। দাবিগুলি ছিল - ১) মহিলা চিকিৎসকের খুনের ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত, ২) উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের লিখিতভাবে পদত্যাগ, ৩)২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিহত চিকিৎসকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, ৪) রাজ্যের প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতালে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, ৫) আন্দোলনরতদের জুনিয়র চিকিৎসকদের উপর অত্যাচারের জন্য কলকাতা পুলিসকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে,৬) কলকাতা পুলিশ কমিশনারকে পদত্যাগ করতে হবে।

জুনিয়র ডাক্তারদের দাবির উত্তরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, আলোচনার পথ খোলা আছে কিন্তু গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত প্রশাসনকে সরকারি কর্মচারীকে রাতারাতি অপসারণের নিদান দেওয়া অগণতান্ত্রিক। চলতে থাকে স্নায়ুর যুদ্ধ। চিকিৎসকরা আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। তাঁদের ওপর নাগরিক সমাজের যে বিপুল আস্থা আছে তা বোঝা যায় নাগরিক সমাজেরও একটা বড় অংশ তাঁদের সাথে রাত জাগতে শুরু করলে। কখনও মাথার উপর ত্রিপল, কখনও বস্ত্র, কখনও খাওয়ার একটানা চিকিৎসকদের জুটিয়ে গেছেন নাগরিক সমাজ।

এমন ঘটনা চলাকালে দু'টি বিষয় সামনে আসে যা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়। প্রথমত, বিজেপি অফিসে কিছু ছাত্রকে দেখা যায়। তৃণমূল সমর্থকরা বলতে থাকেন যে বিজেপির সঙ্গে ছাত্রদের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, কলতান দাশগুপ্ত-র অডিও ক্লিপ সামনে আসে। তাতেও যথেষ্ট অস্বস্তিতে পরে বাম শিবির। বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেট সাংবাদিক বৈঠক করে বলেন, এই অডিওর সত্যতা যাচাই হয়েছে। জুনিয়র ডাক্তাররা অবশ্য রাজনৈতিক যোগাযোগের তত্ত্ব প্রথম থেকেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁরা বলছিলেন, তাঁরা অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়কে ফিরিয়েছেন,অগ্নিমিত্রা পালকে ফিরিয়েছেন এবং অধীর চৌধুরীকেও ফিরিয়েছেন। ফলে এগুলি তাঁদের আন্দোলনকে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু স্নায়ুর যুদ্ধ চলছিলই। পর পর দু'বার মমতা বন্দোপাধ্যায়কে অপেক্ষা করিয়ে চাপ রাখার এই কূটনীতিতে এগিয়েই গিয়েছিলেন আসলে জুনিয়র ডাক্তাররাই।

কিন্তু নিজের পালে হাওয়া টানার ক্ষেত্রে এ দিন নতুন কৌশল নেন মমতা। আজ সকালে হঠাৎ সরাসরি জুনিয়র ডাক্তারদের ধর্নামঞ্চে চলে যান মমতা। সঙ্গে ছিলেন রাজ্যের ডিজি রাজীব কুমারও। সেখানে তিনি ডাক্তারদের উদ্দেশ্যে বলেন, 'আমার নিরাপত্তাজনিত নানা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তা সত্ত্বেও আমি নিজে ছুটে এসেছি। আপনাদের আন্দোলনকে কুর্নিশ জানাচ্ছি। আমি আপনাদের ব্যথা বুঝি। আমিও ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে এসেছি।'

মনে পড়তে পারে হোক কলরব আন্দোলনের কথা। সে সময়ও আন্দোলন যখন চূড়ান্ত আকার ধারণ করে মমতা নিজেই রণাঙ্গনে প্রবেশ করেন। এবং আন্দোলনকারীদের আশ্বাস দিয়ে প্রশমিত করেন।

উল্লেখ করতে হবে, আরও একটি বিষয় প্রসারভারতীর প্রাক্তন অধিকর্তা, তৃণমূলের রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ জহর সরকার তাঁর ইস্তফাপত্রে বলেছিলেন, মমতা কেন আগের মতো আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলতে যাচ্ছেন না। ক্ষেত্রে কি মমতা নিজের ইতিহাস স্মরণ করলেন? নাকি জহর সরকারের উপদেশ মেনে নিলেন? উপদেশ মেনে নিয়েই কি পৌঁছে গেলেন জুনিয়র ডাক্তারদের মাঝে? এবং তাঁদের সাথে আন্তরিকতা নিয়ে কথা বলে জনমানসে এমন একটি বার্তা দিলেন, যে তিনি বরংবার মুখ্যমন্ত্রী পদের তোয়াক্কা না করে, চেয়ারের তোয়াক্কা না করে চিকিৎসকদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে তিনি বার বার কথাবার্তার দরজা খোলা রাখছেন। 'আমি ইস্তফা দিতে রাজি আছি' এমন কথাও শোনা গিয়েছিল মমতার মুখে। অর্থাৎ বার্তা দিয়েছেন, তাঁর পদের লোভ নেই, তিনি চেয়ার থেকেও নেমে আসতে পারেন। আলোচনার দরজা খোলা। এমনকি, জুনিয়র ডাক্তারদের দাবি মনোযোগ দিয়ে শোনা হবে, আসতে আসতে তাঁদের দাবি মানা হবে এমন কথাও বলেছেন মমতা। সুতরাং এরপর যদি জুনিয়র ডাক্তাররা মমতার সঙ্গে দেখা না করেন তাহলে চিকিৎসকদের সদিচ্ছা নিয়ে জনমানসে প্রশ্ন উঠবে, সেই পরিসর তৈরি করে স্নায়ুযুদ্ধে এগিয়ে গিয়েছিলেন মমতা। কিন্তু এই মুহূর্তে যখন আরও একবার বৈঠক মাঠে মারা গেল, মমতা না জুনিয়র ডাক্তার, কার প্রতি সহানুভূতিশীল হবে জনতা, পরিষ্কার হবে কিছুক্ষণেই।

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? সরকার বদলায়, কেন বদলায় না মন?

Rabindranath Tagore Targeted in Bangladesh: বাংলাদেশে বারবার কেন নিশানা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? হাসিনা থেকে ইউনূস, সরকার বদলালেও কেন থামছে না তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার চেষ্টা? জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টাকেই কেন বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হচ্ছে?

যন্তর মন্তরে ঢুকে বিক্ষোভ, পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে সিজেপি-র দুই নেতা

Jantar Mantar protest: যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের জেরে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠাল আদালত। নির্বাচন কমিশন, এসআইআর এবং প্রতিবাদের অধিকার ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক।

দিল্লিতে মহিলা বিক্ষোভকারীদের হেনস্থার অভিযোগ, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উঠছে যে সব প্রশ্ন

Delhi protest: দিল্লিতে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে মহিলা আন্দোলনকারীদের একাংশ পুলিশের বিরুদ্ধে হেনস্থা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।