মেঘের মধ্যে বন্দি ৪০ মিনিট! ৬৪ বছর আগে যে ভয়াবহ ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল বিশ্বকে...

40 Minutes Within the Cloud: দ্য ম্যান হু রোড দ্য থান্ডার বইটি লিখেছিলেন তিনি, নিজের সেই ৪০ মিনিটের অভিজ্ঞতা নিয়ে।

Madhurima Dutta
৩ মিনিট
মেঘের মধ্যে বন্দি ৪০ মিনিট! ৬৪ বছর আগে যে ভয়াবহ ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল বিশ্বকে...

মেঘ সাধারণত কী কী ধরনের হয়? সাধারণ অনেকেই বলবেন সাদা মেঘ, কালো মেঘ, বৃষ্টির মেঘ। ছোটবেলায় ভূগোল পড়ে মনে রাখা কেউ কেউ নিম্বাস, কিউমুলোনিম্বাস অবধি যাবেন। উড়োজাহাজে চেপে মেঘের উপর দিয়ে যাওয়ার কথাও বলবেন অনেকে। স্বভাব-কবিরা দার্জিলিং অবধি গিয়ে মেঘ মাখার কথা বলবেন, আরও অফবিট গন্তব্যে গিয়ে জানলা খুলেই ঘরে মেঘ ঢুকে যাওয়ার কথা বলবেন। কিন্তু ধরুন, মেঘের মধ্যে আটকা পড়ে গেলেন আপনি! বিষয়টা যতই রোম্যান্টিক শোনাক না কেন, আদতে তা নয় একেবারেই। কিন্তু মেঘের মধ্যে আটকে যাবেনই বা কীভাবে? মেঘ তো আর উড়ন্ত বেলুন না যে ভেতরে ঢুকে থাকা যাবে! ঢুকতে গেলেই ধপাস! ভিজেও যাবেন দিব্যি। কিন্তু আটকে পড়েছিলেন এক ব্যক্তি, একটি কিউমুলোনিম্বাস মেঘের মধ্যে।

কিউমুলোনিম্বাস মেঘ (Cumulonimbus) হচ্ছে মেঘ জগতের ভিলেন। এই মেঘ অশান্ত, বিশাল বিশাল তার আকার। যতরাজ্যের বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি সব তৈরি করতে পারে এই কিউমুলোনিম্বাসই। বেশিরভাগ মেঘই ২,০০০ মিটার (৬,৫০০ ফুট) পর্যন্ত পৌঁছায় না কিন্তু কিউমুলোনিম্বাস মেঘগুলি ২০,০০০ মিটার (৬০,০০০ ফুট) পর্যন্ত উপরে উঠে যায়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পৃথিবীর উচ্চতম সেতুর উপর দিয়ে বন্দে ভারত! মেঘের উপর দিয়ে এবার যে গন্তব্যে যাবে ট্রেন

Jammu-Srinagar Vande Bharat Train: ১,৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি এই খিলান সেতুটি প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের চেয়েও ৩৫ মিটার লম্বা।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল উইলিয়াম র‌্যাঙ্কিন হলেন সেই দু'জন ব্যক্তির মধ্যে একজন যিনি একবার মেঘের মধ্যে আটকে পড়েছিলেন। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলে গিয়েছেন তিনি। সাল ১৯৫৯, দিনটা ছিল ২৬ জুলাই। লেফটেন্যান্ট কর্নেল উইলিয়াম র‌্যাঙ্কিন এবং তাঁর উইংম্যান হার্বার্ট নোলান তাঁদের F-8 ক্রুসেডার জেট নিয়ে দক্ষিণ ক্যারোলিনার দিকে উড়ে যাচ্ছিলেন। সামনে যে ঝোড়ো বাতাস ও মেঘ রয়েছে সেই সম্পর্কে সচেতনই ছিলেন তারা। তাই প্রায় ১৪,৩০০ মিটার (৪৭,০০০ ফুট) উপর দিয়ে উড়ছিলেন তারা, মেঘেদের অনেক উপর দিয়ে।

নীচে তখন বেজায় ঝড়। ঝড়ের উপরে রয়েছেন এই দু'জন। হঠাৎ র‍্যাঙ্কিনের ইঞ্জিনের গোলযোগ দেখা দেয় এবং এটি বন্ধ হয়ে যায়। এবার উপায়? প্রেসার স্যুট নেই সঙ্গে, বাইরে তখন -৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। বাতাসে এত কম অক্সিজেন যে শ্বাস নিতেই পারছিলেন না র‍্যাঙ্কিন। কিন্তু বেরোলেই মরণ! সন্ধ্যা ৬ টা নাগাদ তিনি বুঝতে পারলেন, না বেরনো ছাড়া উপায় নেই। তিনি ইজেকশন হ্যান্ডেল টেনে ১৪,৩০০ মিটারে নিয়ে গেলেন। এই করতে গিয়ে হাত থেকে গ্লাভস গেল খুলে। এবার একেবারে শিরে সংক্রান্তি!

অবিলম্বে, তাঁর চোখ এবং কান থেকে রক্ত পড়তে শুরু করে। তাত্ক্ষণিক ডিকম্প্রেশনের জন্য পেট ফুলতে শুরু করে। গ্লাভস হারিয়ে ফেলায় হিমশীতল তাপমাত্রায় তার হাত জমে যায়। র‍্যাঙ্কিন জরুরি অক্সিজেন এবং একটি প্যারাসুট সহ একটি কিউমুলোনিম্বাস মেঘের মধ্যে ঢুকে পড়েন, ওই প্যারাসুট বজ্রবিদ্যুৎ বা ঝড়ের মাঝখানে মানুষকে বাঁচানোর মতো শক্তপোক্তই নয়। প্যারাসুট কর্ড টানেননি, র‍্যাঙ্কিনের উপস্থিত বুদ্ধি বলছিল, টানলেই মৃত্যু। তিনি ব্যারোমিটারটিকে কাজে লাগালেন যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্যারাসুটটিকে ছেড়ে দেবে যখন তার উচ্চতা প্রায় ৩,০৪৮ মিটারে (১০,০০০ ফুট) নেমে যাবে। তিনি আশা করেছিলেন, দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে বা জমে যাওয়ার আগেই বজ্রপাত থেকে বেরিয়ে আসবেন তিনি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আকাশে ৪৮ কেজি নুন ছড়িয়ে বৃষ্টি ঘটায় 'মেঘধরা' দল! অসম্ভবকে বাস্তব করেছে এই দেশ

Rain Making With Salt: সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯,০০০ ফুট উপরে, বিমানটি আকাশে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সাদা মেঘের মধ্যে নুন ছড়িয়ে দেয়।

র‍্যাঙ্কিন মেঘের মধ্যেই থেকে গেলেন। চরম আবহাওয়ার মেঘের মধ্যে প্রতি পল এক এক যুগের মতো মনে হয়েছিল! বিজ্ঞানীরা এই হিংস্র ঝোড়ো মেঘের অভ্যন্তরীণ কার্যকারিতা সম্পর্কে খুব কমই জানেন, কিন্তু ক্রমবর্ধমান গরম বাতাস এবং শিলাবৃষ্টি আর বজ্রপাতের ফলে মানুষকে নিমেষে শেষ করে দেওয়ার জন্য এই মেঘ যথেষ্ট।

অবশেষে প্যারাসুটটি খুলে গেল। র‍্যাঙ্কিন ভাবলেন ৩,০৪৮ মিটারের কাছাকাছি এসে গিয়েছেন কিন্তু কোথায় কী! ভিতরের চাপগুলির ফলে ব্যারোমিটারের পাঠ গুলিয়ে যায়, র‍্যাঙ্কিন সরাসরি উপরের দিকে উঠতে থাকেন। কখনও ওঠেন, কখনও নামেন। অবশেষে ঝড় থেকে মুক্তি পেলেন। নামতে নামতে এক গাছে আটকে পড়লেন, গাছের দাল ভেঙে, মাথায় চোট পেয়ে সোজা নীচে মাটিতে। ঘড়ি দেখলেন। সময় তখন সন্ধা ৬:৪০ মিনিট। মানে প্রায় ৪০ মিনিট মেঘের মধ্যে ছিলেন র‍্যাঙ্কিন। ডিকম্প্রেশন ইনজুরি এবং অন্যান্য ছোটখাটো আঘাত ছাড়া তুলনামূলক অক্ষত অবস্থাতেই বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি।

এর প্রায় ৫০ বছর পরে, ২০০৯ সালে ৮৮ বছর বয়সে র‍্যাঙ্কিন মারা যান। দ্য ম্যান হু রোড দ্য থান্ডার বইটি লিখেছিলেন তিনি, নিজের সেই ৪০ মিনিটের অভিজ্ঞতা নিয়ে।

লিখেছেন
Madhurima Dutta
Madhurima Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।