নোবেলের জন্য চার বার মনোনয়ন! বাংলাতেই তবু জাতের লড়াইয়ে কোণঠাসা ছিলেন মেঘনাদ সাহা

Scientist Meghnad Saha: ১৯১১ সালে উচ্চমাধ্যমিকে সমগ্র বাংলার মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন মেঘনাদ। এরপর তিনি পড়তে এলেন এপার বাংলায়, কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখানে তখন চাঁদের হাট!

প্রথম পর্ব

বিংশ শতাব্দীর জ্যোতির্পদার্থ বিজ্ঞানের মৌলিক ধারণা যে ক’জন দিকপাল বিজ্ঞানীদের চিন্তা ও মেধার প্রতিফলনে স্থাপিত হয়েছিল, মেঘনাদ সাহা তাঁদের অন্যতম। আগের শতকের তৃতীয় দশকের একেবারে গোড়ার দিকে ১৯২০ সালে সাহার আয়নাইজেশান ইকুয়েশান বা তাপীয় আয়নন সমীকরণ জ্যোতির্পদার্থ বিজ্ঞানের জগতে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। শুধু তাই নয় ১৯২০ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় দুই দশক বিজ্ঞানের এই ক্ষেত্রে যত গবেষণা হয়েছে তাদের স্বীয়ভাগের নেপথ্যে সাহার এই তাপীয় আয়নন সমীকরণ। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তি পারমাণবিক তত্ত্ব থেকে শুরু করে বিগ-ব্যাং পর্যন্ত বিভিন্ন অত্যাধুনিক তত্ত্ব বোধগাম্য হয়ে উঠেছে যে কণাত্বরক যন্ত্রের উদ্ভাবনের ফলে– সেই সাইক্লোট্রনের উদ্ভাবক বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী লরেন্স সহ অসংখ্য কালজয়ী বিজ্ঞানীর প্রশংসা পেয়েছেন মেঘনাদ সাহা, তাঁর কাজের জন্য। এক ঝাঁক নোবেলজয়ী পদার্থবিদ, সমারফেল্ড, বোর, ম্যাক্স বর্ন, আইনস্টাইন, এডিংটন, ফার্মি, কম্পটন প্রমুখ দিকপাল মুগ্ধতায় কুর্নিশ করেছেন অবিভক্ত বাংলার এই অনন্য মেধাকে। শুধুমাত্র রয়েল সোসাইটির ফেলোই নয়, চার চারবার নোবেলের জন্য মনোনীত হয়েছেন তিনি।

ভারতীয় উপমহাদেশে স্নাতক স্তরের ছাত্রছাত্রীরা কম বেশি প্রায় সকলেই সাহার কালজয়ী বই ‘আ ট্রিটাইস অন হিট’ সম্পর্কে পরিচিত। গ্যাসিয় অবস্থায় পাদার্থের অণুগুলির ছোটাছুটিতে একটা সিস্টেমের যে ধর্মগুলি সব থেকে বেশি প্রভাবিত হয়, যেমন তাপ, চাপ, অন্তর্নিহিত শক্তি, এন্ট্রপি বা মাধ্যমের অস্থিরতা তা নিয়েই তাপবিজ্ঞান বা থার্মোডায়নামিক্সের এই বই। এত প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা সাহার এই পাঠ্য, যার দোসর পদার্থবিদ্যার বুকলিস্টে খুঁজে পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিরল। কিন্ত আশ্চর্যের বিষয়, মেঘনাদ সাহা কিন্ত পদার্থবিদ্যার ছাত্র ছিলেন না। তিনি তাঁর সমস্ত প্রতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন করেছেন মিশ্র গণিতে। তারপর নিজের গরজেই শিখেছেন পদার্থবিদ্যা। শুধু শেখেনইনি, শিখিয়েছেন পরাধীন উপমহাদেশের আপামর বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের। তাঁরই প্রচেষ্টায় সাইক্লোট্রন এসেছে এদেশে। ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স তাঁরই অক্লান্ত চেষ্টার ফসল। এমনকী ব্রিটিশ শাসিত ভারতে নিউক্লিও পদার্থবিদ্যার চর্চা আরম্ভ হয়েছে তাঁর উদ্যোগেই। তাঁরই নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একের পর এক সব বৈজ্ঞানিক সংগঠন, ন্যাশনাল আকাডেমি অব সায়েন্স, ইন্ডিয়ান ফিজিক্যাল সোসাইটি, ইন্ডিয়ান সায়েন্স নিউজ অ্যাসোসিয়েশন প্রভৃতি।

পরাধীন ভারতবর্ষের বিজ্ঞানচর্চাকে তৎকালীন উন্নত দুনিয়ার গবেষণার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিশ্বমানের উন্নীত করার ব্যাপারে মেঘনাদ ছিলেন বদ্ধপরিকর। এ তো গেল মেঘনাদ সাহার মেধা, প্রজ্ঞা, বিজ্ঞানের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা। এর পাশাপাশি তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টা বাকি গুণগুলিকে পরিপূর্ণ করেছিল। সেজন্য নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানী হিসেবে জন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও থেমে থাকেননি তিনি। দেশের কাজ করার জন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। কোনদিকে ছাপ রাখেননি তিনি? বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে হোক বা শিক্ষা বিকাশের ক্ষেত্রে, শিল্প বিজ্ঞানের সফল প্রয়োগ হোক বা সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের জাতীয় পরিকল্পনায়, এমনকি নদী বাঁধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণেও ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তিনি। আধুনিক বিজ্ঞানকে অজ পাড়াগাঁয়ের মানুষের কাছে পৌঁছনোর জন্য জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন ছোটবেলা থেকে প্রবল অর্থকষ্টে ভোগা, হতদরিদ্র জগন্নাথ সাহা ও ভুবনেশ্বরী দেবীর সন্তান মেঘনাদ। জীবনের প্রতি পদে বর্ণবিদ্বেষের শিকার হয়েছেন। সেখান থেকে অদম্য জেদ, কোনও কিছু যাচাই না করে গ্রহণ না করার মানসিকতা, অতুলনীয় মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের জোরে একজন মানুষ যে কীভাবে পরিবার-সমাজ ছাড়িয়ে দেশের ও দশের হয়ে উঠতে পারেন মেঘনাদ তার জ্বলন্ত নিদর্শন।

আরও পড়ুন- পুরস্কারের লজ্জা! নোবেল পায়নি জগদীশ বসু, মেঘনাদ সাহাদের

১৯০৫ সালে মাত্র বারো বছর বয়সের এক বিস্ময় বালক মেঘনাদ সরকারি চারটাকা বৃত্তির উপর ভরসা করে গাঁয়ের বাড়ি থেকে পড়তে এলেন ঢাকা শহরে। পরে অবশ্য আরও দু’টাকা মাসিক বৃত্তির বন্দোবস্ত হলো পূর্ববঙ্গ বৈশ্য সমিতির থেকে। সারা মাসে মাত্র ছয় টাকা সম্বল! ভাইয়ের পড়াশোনা ও খাওয়ার খরচের কথা ভেবে জুটমিলের শ্রমিক দাদা জয়নাথ পাঁচ টাকা করে মাসোহারা দিতে থাকেন। সবে মিলিয়ে মাসিক এগারো টাকায় ভালোভাবেই দিনগুজরান হচ্ছিল বালক মেঘনাদের। কিন্তু এরই মধ্যে হঠাৎ করে শুরু হলো বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন। লর্ড কার্জনের বাংলা ভাঙার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাংলায় দিকে দিকে তখন আগুন জ্বলছে। বালক মেঘনাদের মনে বিপ্লবের টান থাকলেও পড়াশোনা ছাড়া অন্যদিকে মন দিতে চান না তিনি। পয়সা না থাকায় খালি পায়েই প্রতিদিন স্কুলে যান মেঘনাদ। কিন্তু সেইদিনই ঘটনাচক্রে বাংলার গভর্নর ব্যামফাইল্ড ফুলার স্কুল পরিদর্শনে এলেন। প্রতিবাদ স্বরূপ যারা প্রতিদিন জুতো পায়ে স্কুলে আসত তারাও আজ খালি পায়ে এল। কলেজিয়েট স্কুলের সংস্কৃতিতে এটা একটা অসভ্যতা তো বটেই! ফলে আরও অনেকের সঙ্গেই মেঘনাদকেও বহিস্কার করল স্কুল কর্তৃপক্ষ, বাতিল হলো তাঁর বৃত্তিও। লেখাপড়ার কী হবে এখন? ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্যে স্কুল-কলেজ থেকে বহিস্কার তখন আকছার ঘটনা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানই হচ্ছে একমাত্র মুশকিল আসানের জায়গা। সেই সময় মেঘনাদের ভর্তির ব্যবস্থা হলো ঢাকার কিশোরী লাল জুবিলি স্কুলে, তাও আবার বিনা খরচায়। একটা বৃত্তিও জোগাড় হলো দৈনন্দিন খরচা চালানোর জন্য। এদিকে স্কুলের পাঠের শেষ পর্যায়ে ঢাকা ব্যাপ্টিস্ট মিশন পরিচালিত বাইবেল পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন মেঘনাদ। পুরস্কার হিসাবে মিলল একশো টাকা। ১৯০৯ সালে তৎকালীন পূর্ব-বাংলায় প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম হন মেঘনাদ।

স্কুলের পাঠক্রম শেষে কিশোর মেঘনাদ ভর্তি হলেন ঢাকা কলেজে, বিজ্ঞান নিয়ে। কলেজে পড়াকালীন তাঁর 'হ্যালির ধুমকেতু' নিয়ে লেখা প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ বের হয় কলেজ ম্যাগাজিনে। কলেজের পাশাপাশি জার্মান ভাষা চর্চা শুরু করেন মেঘনাদ। এ বিষয়ে তাঁর গুরু সদ্য ভিয়েনা থেকে পিএইচ ডি করে আসা অধ্যাপক নগেন্দ্রনাথ সেন। ১৯১১ সালে উচ্চমাধ্যমিকে সমগ্র বাংলার মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন মেঘনাদ। এরপর তিনি পড়তে এলেন এপার বাংলায়, কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখানে তখন চাঁদের হাট! পদার্থবিজ্ঞান পড়াচ্ছেন জগদীশ চন্দ্র বসু, রসায়নের ক্লাস নিচ্ছেন প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। যদিও তাঁর বেশি ভালো লাগত অধ্যাপক ডি. এন. মল্লিকের অঙ্কের ক্লাস। সহপাঠী হিসাবে পেলেন আর এক প্রতিভাধর সত্যেন বসুকে, যিনি আবার জীবনে কোনও পরীক্ষায় দ্বিতীয় হননি । এছাড়াও ছিলেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, নীলরতন ধর, নিখিল রঞ্জন সেনের মতো দিকপালরা। প্রশান্ত চন্দ্র মহালনবীশ ছিলেন মেঘনাদের বছর খানেকের সিনিয়র। সত্যেন বসু আর মেঘনাদ, দু’জনেরই পছন্দের বিষয় গণিত ।

কলকাতায় মেঘনাদ থাকতেন ইডেন হিন্দু হোস্টেলে। সেখানে জাত-পাতের বিদ্বেষ তখন প্রবল। ব্রাহ্মণদের জন্য আলাদা খাওয়া-থাকার ব্যবস্থা। সদ্য শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এমন বিদ্বেষ দেখে ব্যথিত হন মেঘনাদ। তাঁরই অনেক ব্রাহ্মণ সহপাঠী নিচু জাত জ্ঞান করে তাঁকে হোস্টেলের সরস্বতী পুজোমণ্ডপ থেকে বেরও করে দেয়। হোস্টেলের পরিবেশ ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠতে থাকে তাঁর কাছে। শেষমেশ হোস্টেল ছেড়ে কলেজ স্ট্রিটের একটা মেসে গিয়ে উঠলেন ১৯১৩ সালে। সে বছরই গণিতে অনার্স নিয়ে বিএসসি পাশ করলেন মেঘনাদ। পরীক্ষায় সত্যেন হলেন প্রথম, মেঘনাদ সাহা দ্বিতীয়।

কলেজ স্ট্রিটের মেসেও মেঘনাদকে তাড়া করে বেড়াল জাত পাতের ভেদাভেদ। এখানেও ব্রাহ্মণরা অন্য জাতের সঙ্গে এক টেবিলে খান না। তবে মেসের একটি বিষয় ভালো লেগেছিল তরুণ মেঘনাদের। এখানেই পরিচয় বছর তিনেকের ছোট সুভাষ চন্দ্র বসুর সঙ্গে। তারপর আরও কত বিপ্লবী- অনুশীলন সমিতির পুলিন দাস, শৈলেন ঘোষ, যুগান্তরের যতীন মুখোপাধ্যায়, যাঁকে সবাই বাঘা যতীন নামে চেনে, একে একে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল তরুণ মেঘনাদের। যদিও বাঘা যতীন মেঘনাদকে পরামর্শ দিতেন তাঁদের সঙ্গে প্রকাশ্য না মিশতে, কারণ দেশ গড়ার কাজে বিপ্লবীদের পাশাপাশি মেঘনাদের মতো তরুণ মেধাবীদেরও দরকার। তখনকার সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে সাধ্যমতো দূরে রাখতেন মেঘনাদ। তখন তাঁর মস্তিষ্ক জুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে আইনস্টাইন, বোর, প্ল্যাঙ্ক, ৱ্যাদেরফোর্ড, বোল্টজম্যান প্রমুখ বিশ্বশ্রুত বিজ্ঞানীদের নিত্য নতুন তত্ত্ব। এইভাবে চলতে চলতে ১৯১৫ সালে মিশ্র-গণিতে এমএসসি পাশ করলেন মেঘনাদ। এবারেও তিনি দ্বিতীয় আর প্রথম সত্যেন বসু। মনস্থির করলেন এবার আইএফএস (ইন্ডিয়ান ফাইনান্সিয়াল সিভিল সার্ভিস) দেবেন। কিন্তু সে গুড়ে বালি! পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি মিলল না ব্রিটিশদের থেকে। গোয়েন্দা মারফত ব্রিটিশরা ততক্ষণে জেনেই গেছে তরুণ মেঘনাদের বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। ফলত পরাধীন এ দেশে একজন শিক্ষিত যুবকের দিন গুজরানোর একমাত্র উপায় টিউশনি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কলকাতার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত চলতে লাগল টিউশনি, আর সঙ্গী একমাত্র সাইকেল!

আরও পড়ুন- সময়ের উল্টোদিকেও রয়েছে ‘পদার্থ’? যে খোঁজ বদলে দিতে পারে আমাদের সব বোঝাপড়া

এদিকে অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে বাংলার গুণীজনরা বাংলার উন্নতির জন্য কাজ করে যাচ্ছিলেন, পরাধীন দেশে যতটা পারা যায় আর কী! ১৯০৬ সালে উপাচার্য হওয়ার পর থেকে বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রীবৃদ্ধির চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন অনবরত। এদিকে বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ১৯১৪ সাল নাগাদ দু’জন প্রখ্যাত উকিল তারকনাথ পালিত ও রাসবিহারী ঘোষ বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতিকল্পে প্রচুর অর্থ দান করলেন। সেই অর্থে আশুতোষ গড়লেন বিজ্ঞান কলেজ। বিজ্ঞান কলেজে তো হলো, কিন্ত পড়াবেন কারা? সেজন্যে দেশের তৎকালীন সেরা ছাত্রদের ডাকলেন আশুতোষ। ডাক পড়ল সেরা দুই মেধার, সত্যেন বসু ও মেঘনাদ সাহার। দু’জনই যোগদান করলেন গণিত বিভাগের প্রভাষক পদে।

তেইশ বছরের তরুণ প্রভাষক মেঘনাদ সাহা নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াতে শুরু করলেন গণিত বিভাগে। কিন্তু তৎকালীন বিভাগীয় প্রধানের দুর্ব্যবহার ও অসহযোগিতা মন ভেঙে দিল তরুণ দুই প্রতিভারই। উপায় না দেখে তাঁরা শরণাপন্ন হলেন স্যার আশুতোষের। সব শুনে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য খোলা পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দিতে বললেন তাঁদের। মেঘনাদ ও সত্যেন্দ্রনাথ যোগ দিলেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। সেখানে তাঁরা সতীর্থ হিসাবে পেলেন দেবেন্দ্রমোহন বসু ও শিশিরকুমার মিত্র ও পরে সি ভি রমনকে। প্রকৃতই, আসমানের সব তারার সমাহার।

এদিকে পদার্থবিজ্ঞানের প্রথাগত ছাত্র না হয়েও পদার্থবিজ্ঞানের প্রভাষক হয়ে বিরাট এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি মেঘনাদ ও সত্যেন্দ্রনাথ। নিজেদের কলেজ জীবনে পদার্থবিজ্ঞান পড়েছেন মাত্র এক বছর– তাও গ্রাজুয়েশনের ‘সাবসিডিয়ারি’ বিষয় হিসেবে। মেঘনাদ নিতে লাগলেন স্পেকট্রোস্কোপি ও থার্মোডায়নামিক্সের ক্লাস। পড়ানোর খাতিরে নিজে পড়তে গিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের মায়ায় জড়িয়ে পড়লেন মিশ্র গণিতে এমএসসি পাশ মেঘনাদ। গাণিতিক বুনিয়াদ আগে থেকেই শক্ত ছিল মেঘনাদের, তাই পদার্থবিজ্ঞানের নিত্য নতুন তথ্য ও তত্ত্ব চর্চায় খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। তবে শুরুতে পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাগারে যন্ত্রপাতি বিশেষ কিছুই ছিল না। তখন মাথাটাই গবেষণাগার! আর সেই কাজকে কিছুটা পরিণতি দিল প্রেসিডেন্সি কলেজের লাইব্রেরি। তখন ইউরোপে পদার্থবিজ্ঞানে প্রতিনিয়ত নিত্য নতুন কাজ হচ্ছে, বিশেষত জার্মানিতে। তখন ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাচ্ছে বিজ্ঞানীদের ধারণা। আশ্চর্যরকম কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বুনিয়াদ তৈরি হচ্ছে সেসময়। এদিকে তখন সবেমাত্র আইনস্টাইনের সার্বিক আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রকাশ পেয়েছে। সেই তত্ত্ব বুঝতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন মেঘনাদ। গবেষণাপত্রের বেশিরভাগ মৌলিক বিষয়ই জার্মানি ভাষায় রচিত। ঢাকা কলেজে পড়াকালীন অধ্যাপক সেনের কাছে শেখা জার্মান ভাষা কাজে লাগল এত দিনে।

 

পরবর্তী পর্বে...

More Articles