স্বাভাবিক হাঁটছেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষ! মস্তিষ্কের চিপ আবিষ্কার করে যে চমৎকার ঘটাল চিন

China’s Brain-spinal interface: চিনের গবেষকদের এই মস্তিষ্ক-মেরুদণ্ডের সংযোগটি সরাসরি সুপ্ত স্নায়ুকে উদ্দীপিত করে কাজটি করে। এই প্রক্রিয়ার নাম নিউরাল রিমডেলিং।

মেরুদণ্ডের আঘাত থেকে পক্ষাঘাত হলে তা ভয়াবহ। বিজ্ঞানীরাও মনে করেছেন যে, মেরুদণ্ডের আঘাতের ফলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত অঙ্গগুলিকে আবার সচল করা প্রায় অসম্ভব। এলন মাস্কের নিউরালিংক কিছুকাল আগেই তৈরি করেছে, উন্নত ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস। মস্তিষ্কের মধ্যে চিপ বসিয়ে মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের দিকে এগিয়েছে নিউরালিংক। তবু, পক্ষাঘাতগ্রস্ত অঙ্গগুলিকে বাঁচানোর চেষ্টা বেশ কঠিন। চিন সম্প্রতি এই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করছে। চিনের সাংহাইয়ে যুগান্তকারী একটি ক্লিনিকাল ট্রায়াল চমকে দিয়েছে বিশ্বকে।

সাংহাইয়ের ফুদান ইউনিভার্সিটির গবেষকরা ন্যূনতম অস্ত্রোপচারের কয়েক ঘণ্টা পরেই চারজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীকে নিজেদের পায়ের উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দিতে পেরেছেন। এই পরীক্ষামূলক অস্ত্রোপচারে মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডে ইলেক্ট্রোড চিপ স্থাপন করা হয়েছিল। আঘাত লাগার ফলে মস্তিষ্ক আর মেরুদণ্ডের মাঝে এই সংযোগটিই ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। সকলকে তাজ্জব করে দেন চিকিৎসকরা! দেখা যায়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, রোগীরা আবার তাদের পা নড়াচড়া করতে পারছেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, নিজে নিজেই চলাফেরা করতেও পারছিলেন রোগীরা। অনেকেরই স্নায়ুর সংবেদনশীলতা আবার আগের মতোই ফিরেও আসে।

আরও পড়ুন- এই প্রথম মানুষের মাথায় বসল ‘চিপ’! যে অভাবনীয় কাণ্ড ঘটাল এলন মাস্কের নিউরালিংক

ব্রেন-স্পাইনাল ইন্টারফেসের ক্ষেত্রে গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের জন্য বাহ্যিক কম্পিউটারের উপর নির্ভর করতে হয়। তবে চিনের গবেষকদের এই মস্তিষ্ক-মেরুদণ্ডের সংযোগটি সরাসরি সুপ্ত স্নায়ুকে উদ্দীপিত করে কাজটি করে। এই প্রক্রিয়ার নাম নিউরাল রিমডেলিং। এই প্রক্রিয়ায় স্নায়ুতন্ত্র নিজেই নিজেকে আবারও সক্রিয় করে। আজীবন কোনও সহায়ক যন্ত্রের আর প্রয়োজন পড়ে না।

ফুদান ব্রেইন লাইক ইন্টেলিজেন্স সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান গবেষক জিয়া ফুমিন বলছেন, "আগে, সবাই জানত বিদেশে উচ্চ পর্যায়ের চিকিৎসা সরঞ্জাম পাওয়া যায় কিন্তু এখন আমরা এক অজানা অঞ্চলে প্রবেশ করেছি। বিশ্বের প্রথম নতুন প্রজন্মের আসল ব্রেন-স্পাইনাল ইন্টারফেস সিস্টেম সমাধানের কাজ করছি৷"

এই নিউরাল রিমডেলিং প্রক্রিয়ায় দু'টি ক্ষুদ্র ইলেক্ট্রোড চিপ মস্তিষ্কের মোটর কর্টেক্সে বসিয়ে দেওয়া হয়। এই চিপগুলি প্রতিটি প্রায় ১ মিমি ব্যাসের। এই ব্রেন-স্পাইনাল চিপগুলি নিউরাল সিগন্যাল সংগ্রহ করে ডিকোড করে এবং তারপর মেরুদণ্ডের স্নায়ুর শিকড়গুলিতে সুনির্দিষ্ট বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা পাঠায়। এই উদ্দীপনাই মস্তিষ্ক এবং পক্ষাঘাতগ্রস্ত পেশিগুলির মধ্যে একটি সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে।

এই পরীক্ষামূলক অস্ত্রোপচারে প্রথম যিনি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এগিয়ে আসেন তাঁর বয়স ৩৪ বছর। পড়ে গিয়ে পক্ষাঘাত হয়। গত ৮ জানুয়ারি অস্ত্রোপচার হয় তাঁর। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, তিনি দুই পা তুলতে পারছিলেন। ১৪ তম দিনে দেখা যায় সব বাধা অতিক্রম করে ১৬ ফুট উপরে দাঁড় করানো ফ্রেম দিয়ে হাঁটছেন তিনি। ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসে আরও তিনজন রোগীর অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল, সবাই সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছেন।

আরও পড়ুন- করোনা বদলে দিয়েছে টিন-এজারদের মস্তিষ্ক! ভয়াবহ তথ্য উঠে এল গবেষণায়

এর আগে সুইজারল্যান্ডের একটি গবেষণায় নিউরাল রিমডেলিং নিয়ে কজ করা হয়। সেখানেও একই রকম প্রভাব দেখা গিয়েছিল কিন্তু তা ছয় মাস পরে। চিনের গবেষকরা এই সময়সীমাকে মাত্র দুই সপ্তাহে নামিয়ে দিয়েছেন। এই অস্ত্রোপচারটিও খুব সাধারণ।

ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে প্রথম রোগীর অবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়। তিনি বলেছেন, "আমার পা উষ্ণ থাকছে এবং ঘামও হচ্ছে, পায়ে সংবেদনশীলতা টের পাচ্ছি। যখন আমি দাঁড়াই, আমি বুঝতে পারি যে আমার পায়ের পেশিগুলি সংকুচিত হচ্ছে।" এই অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত সমস্ত যন্ত্রপাতিও চিনেই তৈরি করা হয়েছিল। নিউরোটেকনোলজিতে সেই দেশের অগ্রগতির এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন এটি। চিনে এই মুহূর্তে ৩.৭৪ মিলিয়ন মেরুদণ্ডের আঘাত পাওয়া রোগী আছেন। প্রতিবছরই ৯০,০০০ মানুষ নতুন করে এই আঘাতে জেরবার হচ্ছেন। স্বাভাবিকভাবেই অনুমেয়, এই প্রযুক্তির প্রভাব বিশাল উপকার পেতে পারেন ভুক্তভোগীরা।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪-এর প্রকৃতি সূচক অনুসারে, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান গবেষণায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবার আগে রয়েছে। চিন দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। তবে এই ধরনের অগ্রগতি যদি চিনে অব্যাহত থাকে তাহলে মার্কিন মুলুকের সঙ্গে সেই ব্যবধান দ্রুত সংকুচিত হবে বলেই আশা করছেন চিনের গবেষক বিজ্ঞানীরা।

More Articles