মাঙ্কিপক্স আতঙ্কের আঁচ ভারতেও, যৌন সম্পর্ক থেকেই সংক্রমণ? চিন্তায় চিকিৎসকরা

করোনা-আবহে বিশ্বকে ভয় ধরাচ্ছে মাঙ্কিপক্সের সংক্রমণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু-‌র) সোমবারের বুলেটিন অনুযায়ী, ১৩ মে থেকে ৬ জুন তারিখের মধ্যে বিশ্বের ২৭টি দেশে ৭৮০টি নিশ্চিত কেস ধরা পড়েছে মাঙ্কিপক্সের। হু-র অন্তর্ভুক্ত যে চারটি এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়েছে, সেখানে ভাইরাস এন্ডেমিক প্রকৃতির নয়। ভারতে এখনও পর্যন্তও কেউ সংক্রামিত হয়নি বলেই খবর। তবে শুক্রবার গাজিয়াবাদে এক মহিলার মাঙ্কিপক্সের লক্ষণ থাকায় তাঁর নমুনা পুনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজি-তে পাঠানো হয়েছে পরীক্ষার জন্য। বিচ্ছিন্নবাসে রাখা হয়েছে তাঁকে। তাঁর কোনও ভ্রমণ-ইতিহাস নেই।

যদিও সারা বিশ্বে সংক্রমণের হার বাড়লেও এখনও পর্যন্ত কোনও ব্যক্তির মৃত্যু হয়নি। সোমবার ব্রিটেনে ৭৭টি নতুন কেস ধরা পড়ায় ওই দেশে মোট আক্রান্তর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩০২। এর মধ্যে ৭৩ জন ইংল্যান্ডের, ২ জন স্কটল্যান্ড এবং ২ জন ওয়েলসের বাসিন্দা। এছাড়া আমেরিকা, কানাডার মতো ২৭টিরও বেশি দেশে মাঙ্কিপক্সের সংক্রমণ ছড়িয়ে গেছে। ভারতকেও সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

মাঙ্কিপক্স কী?
হু-র মতে মাঙ্কিপক্স হল একপ্রকারের সংক্রামক রোগ এবং এর জন্য দায়ী ভাইরাস আক্রান্ত প্রাণীর দেহ থেকে মানুষের দেহে সংক্রমণ ঘটায়। কম রান্না করা মাংস বা সংক্রামিত প্রাণীর মাংস থেকে তৈরি খাবার খেলে একজন ব্যক্তি এই রোগে আক্রান্ত হন। মানুষ থেকে অন্য একজনের শরীরে এই ভাইরাস সীমিত ক্ষেত্রেই সংক্রামিত হয়। মূলত সংক্রামিত ব্যক্তির দেহ-তরল, ত্বক, বিছানা এবং জামা-কাপড় ব্যবহার করলে এই ভাইরাস অন্যদের শরীরেরও ছড়িয়ে পড়ে। স্মল পক্সের সঙ্গে এর মিল থাকলেও ততখানি ভয়ের নয়‌। মধ্য এবং পশ্চিম আফ্রিকার দেশে সাধারণত এই রোগের সংক্রমণ দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া শহরাঞ্চলে বা ট্রপিক্যাল বনভূমির পার্শ্ববতী এলাকাতেও এই ভাইরাসের সংক্রমণ লক্ষ করা যায়।

আরও পড়ুন: ফের হু হু করে দেশে বাড়ছে করোনা-সংক্রমণ, ভারতে চতুর্থ ঢেউ?

মাঙ্কিপক্সের ইতিহাস
১৯৫৮ সালে প্রথম এই ভাইরাসের খোঁজ পাওয়া যায়। সেসময় বাঁদরদের মধ্যে পক্সে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ায় একটি গবেষণা শুরু করা হয়। তার থেকেই নাম হয় 'মাঙ্কি ভাইরাস'। মানুষের শরীরে প্রথম এই ভাইরাসের সংক্রমণ লক্ষ করা যায় ১৯৭০ সালে আফ্রিকার কঙ্গো দেশে। পরবর্তী সময়ে আফ্রিকার বহু দেশে ছড়িয়ে পড়ে এই ভাইরাস। আফ্রিকার বাইরে আমেরিকা, ইজরায়েল, সিঙ্গাপুরেও মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। ২০১৮ সালে ইংল্যান্ডে প্রথম এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া যায়। চিকিৎসকদের মতে, তারপর থেকে বেশ কিছু সংক্রমণের খবর এসেছে।

মাঙ্কিপক্সের লক্ষণ
শরীরে এই ভাইরাস প্রবেশের পর ৬ থেকে ১৩ দিন অবধি দেহে থাকে। তবে অনেকসময় দুই থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত মানবদেহে বাঁচতে পারে এই ভাইরাস।প্রথমদিকে এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি গা-হাত-পায়ে ব্যথা, গলা ব্যথা, মাথা ব্যথা, গলা ফুলে যাওয়া এবং ক্লান্তি অনুভব করেন। সঙ্গে গায়ে-মুখে ফুসকুড়ি দেখা যায়। এমনকী, পায়ের পাতা, হাতের তালু, মুখের ভেতর এবং কর্নিয়াতেও ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। এগুলি শুকিয়ে খসে পড়ার আগে সময়ে সময়ে বদলে যায় এর রূপ।

বয়স্ক এবং মাঝবয়সিদের তুলনায় বাচ্চারা এই ভাইরাসে বেশি আক্রান্ত হন। এমনকী, মায়ের শরীর থেকে ভ্রূণ বা সদ্যোজাতদের শরীরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে এই সংক্রমণ।

কীভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে?
চিকিৎসক সুবর্ণ গোস্বামী বলেছেন, "যৌন সম্পর্কের সময়, কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির বিছানা ব্যবহার করলেও সুস্থ মানুষের শরীরে এই ভাইরাস প্রবেশ করে। আবার মুখোমুখি কথা বলার সময় হাঁচি-কাশির মাধ্যমেও ছড়াতে পারে এই রোগ। শরীরে জলফোসকা, জ্বর এবং লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়ার পাশাপাশি পিঠে মারাত্মক ব্যথা হয় এই রোগের কারণে।"

কিন্তু মাঙ্কিপক্স স্মলপক্সের তুলনায় কম মারাত্মক, একথা চিকিৎসকদের সকলেই স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলেই মত চিকিৎসক সুবর্ণ গোস্বামীর। এক্ষেত্রে তিনি জানিয়েছেন, কোভিডের বিধিনিষেধগুলি পালন করলেই এই রোগের সংক্রমণ থেকেও বাঁচা সম্ভব। হু-র স্বাস্থ্যকর্তাদের মতে, এখনও পর্যন্ত যে ব্যক্তিদের শরীরে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে, তাঁরা সকলেই যৌন সংসর্গে রয়েছেন। এঁদের মধ্যে বেশিরভাগই পুরুষ এবং সমকামী ও উভকামী সম্পর্কে লিপ্ত তাঁরা। তাই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন হু।

চিকিৎসা
সংক্রমণের বেশ কিছুদিন পর নিজে থেকেই লক্ষণগুলি কমে যেতে থাকে কোনও চিকিৎসা ছাড়াই। তবে অনেক সময় ফুসকুড়িগুলি শোকাতে চিকিৎসার সাহায্য নিতে হয়। তবে হু-র মতে গুরুতর সংক্রমণের ক্ষেত্রে ভ্যাকসিনিয়া ইমিউন গ্লোবিউলিন ব্যবহার করা যেতে পারে।

ভ্যাকসিন
এক্ষেত্রে স্মল পক্সের জন্য ব্যবহৃত ট্যাকোভিরিম্যাট ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। এছাড়া স্মল পক্সের জন্য বাজারে যে ভ্যাকসিন রয়েছে, তাও সাময়িকভাবে সংক্রমণ রুখতে সম্ভব। তাই যাঁদের স্মল পক্সের ভ্যাকসিন দেওয়া আছে তাঁদের সংক্রামিত হওয়ার সম্ভাবনা কম।

মৃত্যুর সম্ভাবনা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মধ্য আফ্রিকায় সমীক্ষা করে দেখা গেছে যে, সেখানে মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবা উন্নত নয়, সেখানে এই রোগে ১০ জন সংক্রামিত ব্যক্তির মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। বেশিরভাগ রোগী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন।

কীভাবে প্রতিরোধ সম্ভব?
চিকিৎসক মারিয়া ভ্যান কার্কহোভ, হু-র এপিডেমিওলজিস্টের কথা অনুযায়ী, মাঙ্কিপক্স ঠেকাতে যে পাঁচটি জিনিস মনে রাখতে হবে:

১. মাঙ্কিপক্স সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন। পাশাপাশি টেস্টিং বাড়িয়ে প্রথম থেকে সরকার ও চিকিৎসকদেরও নজরদারি চালাতে হবে।

২. মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ রুখতে হবে।

৩. স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রথম থেকেই রক্ষা করতে হবে। মারিয়া বলেছেন, চিকিৎসকের পাশাপাশি যাঁরা আক্রান্তদের নমুনা সংগ্রহ করেন, তাঁদের কাছেও যেন উপযুক্ত তথ্য থাকে মাঙ্কিপক্স সম্পর্কে।

৪. বাজারে মাঙ্কিপক্সের যে ভ্যাকসিন ও ওষুধ রয়েছে, তা যথেষ্ট পরিমাণে মজুত রাখতে হবে এবং যাঁরা সামনের সারিতে থেকে রোগপ্রতিরোধে সাহায্য করছে তাঁদের রক্ষা করতে হবে।

৫. মাঙ্কিপক্স সম্পর্কে আরও বেশি গবেষণার প্রয়োজন। এ-বিষয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনার আয়োজন করা হবে পরের সপ্তাহে। এই আলোচনায় মাঙ্কিপক্সের ভাইরাস, সংক্রমণ পদ্ধতি এমন নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে।

 

 

 

 

 

More Articles

;