বিভীষিকাময় রেলসফর! দেশের যে দুর্ঘটনাগুলি আজও ভোলা যায়নি

By: Sindhu Som

January 14, 2022

Share

২০১৭ সালে দুর্ঘটনাগ্রস্থ উৎকল এক্সপ্রেস।

ময়নাগুড়িতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনা ঘুম কেড়ে নিয়েছে হাজারো মানুষের। করোনাকালে দীর্ঘ বছর দুয়েক রেলের ওপর বলবৎ নানা বিধিনিষেধে দুর্ঘটনার খবর প্রায় ছিল না। কিছুটা আচমকাই ঘটল এই ঘটনা। দোমহনীর কাছে বৃহস্পতিবার বিকানের গুয়াহাটি এক্সপ্রেসের অন্তত এক ডজন বগি উল্টে গেল। এই পরিস্থিতিতে অনেকের মনে পড়বে গাইসাল দুর্ঘটনার কথা। কারও স্মৃতিতে আজও জেগে রয়েছে জ্ঞানেশ্বরী কাণ্ড। আসুন, দেখে নিই ভারতীয় রেলের ইতিহাসে সেইসব ভয়ঙ্কর ও গায়ে কাঁটা দেওয়া ঘটনাগুলিকে আরও একটি বার।

বিহার রেল দুর্ঘটনা, ৬ই জুন ১৯৮১, (৫০০-৮০০ নিহত)

বাঘমতী নদী পার হওয়ার সময় একটি প্যাসেঞ্জার ট্রেনের সাতটি কামরা লাইনচ্যুত হয়ে নদীতে গিয়ে পড়ে। ট্রেনটি মান্‌সি থেকে সহর্ষের দিকে যাচ্ছিল। দুর্ঘটনার সঠিক কারণ আজ পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে কয়েকটি নথি অনুযায়ী, লাইনের উপর একটি গরু এসে পড়ায় চালক গতির মাথায় জোর ব্রেক লাগাতে বাধ্য হন। তার আগেই দু’এক পশলা বৃষ্টিতে লাইন পিচ্ছিল হয়ে ছিল। বর্ষার ভরা নদী। উদ্ধারকার্য সেভাবে চালানোরও উপায় ছিল না। সরকারী হিসেবে নিহতের সংখ্যা ২৫০, নিখোঁজ আরো শতখানেক। স্থানীয় লোকেদের মতে সংখ্যাটা ৫০০ থেকে ৮০০ হতে পারে।

ফিরোজাবাদ রেল দুর্ঘটনা, ২০ অগাস্ট ১৯৯৫ (নিহত ৩৫৮)

মূলত পরিচালনার ভুলের জন্য এই দুর্ঘটনা। ইন্ডিয়ান নর্দান রেলওয়ের দিল্লি-কানপুর অঞ্চলে দাঁড়িয়ে ছিল কালিন্দি এক্সপ্রেস। গোরুর সঙ্গে সংঘর্ষে ব্রেকে সমস্যা দেখা যাওয়ায় যাত্রা সম্ভব ছিল না। সেই একই লাইনে পুরুষোত্তম এক্সপ্রেসকে যাত্রার অনুমতি দেওয়া হয়। ৭০ কিমি প্রতি ঘন্টা বেগে দ্বিতীয় ট্রেনটি প্রথমটির পিছনে ধাক্কা মারে। কালিন্দি এক্সপ্রেসের তিনটি কামরা সম্পূর্ণ দুমড়েমুচড়ে যায় । পুরুষোত্তোম এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন ও সামনের দুটি কামরা লাইনচ্যুত হয়। রাত ২টো ৫৫ মিনিট। দুটি ট্রেনের ২২০০ যাত্রীর বেশিরভাগই তখন ঘুমন্ত। আচমকা এই দুর্ঘটনায় নিহত হন ৩৫৮ জন মানুষ।

আয়োধ-অসম এক্সপ্রেস ও ব্রহ্মপুত্র মেলের সংঘর্ষ, ২ আগস্ট ১৯৯৯ (নিহত ২৬৮)

নর্থ ফ্রণ্টিয়ার রেলওয়ের কাটিহার অঞ্চলে এই দুর্ঘটনায় আহতের সংখ্যা ৩৫৯। ব্রহ্মপুত্র মেলে ভারতীয় সেনারা সীমার দিকে যাচ্ছিলেন। গুয়াহাটিগামী আয়োধ-আসাম এক্সপ্রেস গাইসল স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিল। এক্ষেত্রেও পরিচালনার ভুল। যে লাইনে দ্বিতীয় ট্রেনটি দাঁড়িয়ে ছিল সেই লাইনেই প্রথমটিকে চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়। রাত দেড়টা নাগাদ ব্রহ্মপুত্র মেল আয়োধ-আসাম এক্সপ্রেসের মুখোমুখি ধাক্কা মারে।

খান্না রেল দুর্ঘটনা, ২৬ নভেম্বর ১৯৯৮ (নিহত ২১২)

লাইন ভাঙা থাকায় অমৃতসর গোল্ডেন টেম্পল মেলের ছটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে গিয়েছিল। ওই সময় জম্মু তাওই–শিয়ালদহ এক্সপ্রেস এসে প্রথম ট্রেনটির পিছনে ধাক্কা মারে।

 

জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেস দুর্ঘটনা, ২৮ মে, ২০১০ (নিহত ১৭০)

মুম্বইগামী হাওড়া কার্লা লোকমান্য তিলক জ্ঞানেশ্বরী সুপার ডিলাক্স এক্সপ্রেস রাত দেড়টা নাগাদ পশ্চিম মেদিনীপুরের ক্ষেমাসুলি ও সরদিহার মাঝামাঝি একটি প্রবল বিষ্ফোরণে লাইনচ্যুত হয়। সেইসময় একটি মালগাড়িও লাইনচ্যুত ট্রেনটির ওপর এসে পড়ে। সন্দেহ করা হয় বিষ্ফোরণের জন্য দায়ী মাওবাদীরা।

আরও পড়ুন-ভারতের হিরে চোরাপথে ফ্রান্সে! হোপ ডায়মন্ড যেন অভিশাপ হয়ে এসেছিল ফরাসিদের কাছে

পাম্বান-ধনুষকোড়ি প্যাসেঞ্জার ট্রেন, ২৩শে ডিসেম্বর, ১৯৬৪ (নিহত ১৫০)

রামেশ্বরম সাইক্লোন বা ধনুষকোড়ি সাইক্লোনে পাম্বান-ধনুষকোড়ি প্যাসেঞ্জার ট্রেনকে ১৫০ জন যাত্রীসহ ভাসিয়ে নিয়ে যায়। অনেকের মতে নেহাতই অফ সিজন বলে ট্রেনে মাত্র ১৫০ জন যাত্রী হল। নয়তো হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি দাঁড়াত।

 

হাওড়া–নিউ দিল্লি রাজধানী এক্সপ্রেস, ৯ই সেপ্টেম্বর ২০০২ (নিহত ১৪০)

রাত দশটা নাগাদ গয়া এবং দেহরি অন শোন স্টেশনের মাঝামাঝি রফিগঞ্জ স্টেশনের কাছে হাওড়া-নিউ দিল্লি রাজধানী এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হয়। এই দুর্ঘটনার জন্যেও পরিচালনা ব্যবস্থার ত্রুটি দায়ী। লাইনটি ব্রিটিশ আমলের এবং যথেষ্ট দুর্বল। তার ওপরে ভারী বৃষ্টিপাতে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা আরও বেড়ে গিয়েছিল। লাইনে ফাটল ধরে। ১০০ কিমি প্রতি ঘন্টা বেগে ধেয়ে আসা রেলগাড়ির ভার সামলাতে পারেনি ঐ দুর্বল লাইন।

হায়দরাবাদ দুর্ঘটনা, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ১৯৫৪ (নিহত ১৩৯)

হায়দরাবাদ ৭৫ মাইল দক্ষিণে যশন্তী নদীর ব্রিজের ওপর একটি রেলদুর্ঘটনায় মারা যান ১৩৯ জন, আহত প্রায় ১০০।

আরও পড়ুন-কলকাতার কেবিনে আজও কান পাতলে শোনা যাবে বিপ্লবীদের নিঃশ্বাস

মাহবুবনগরের কাছে দুর্ঘটনা, ২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৬, (নিহত ১২৫)

হায়দরাবাদ থেকে ১০০ কিমি দূরে জাড়চেরলা ও মাহবুবনগরের মাঝামাঝি যত্রীবাহী একটি ট্রেনের ওপর  ব্রিজ ভেঙে পড়ে মৃত্যু হয় ১২৫ জনের, আহত ২২ জন।

 

পাটনার কাছে দুর্ঘটনা, ১৭ জুলাই ১৯৩৭ (নিহত ১১৯ জন)

কলকাতা থেকে আসা একটি এক্সপ্রেস ট্রেন বিহতা স্টেশনের কাছে একটি বাঁধের উপর থেকে গড়িয়ে পড়ে। ১১৯ জন মারা যায়, আহতের সংখ্যা প্রায় ১৮০-র কাছাকাছি।

 

  • “Bihar Train Disaster | Train Derailment, Bihar, India [1981] | Britannica.” 
  • “Firozabad Rail Disaster.” n.d. railenquiry.in
  • Report, Star Online. 2016. “10 Deadliest Train Accidents in India.” The Daily Star. November 20, 2016.

More Articles