৩৬ বছর ধরে মাতৃগর্ভে রইল পাথর হয়ে যাওয়া শিশু

By: Aheli Paul

October 4, 2021

Share

চিত্রঋণঃ গুগল

ছেলেবেলায় রূপকথার গল্পে প্রায়শই পাথর কিংবা ব্রোঞ্জের রাজকুমারের গল্প শুনলে আমাদের বিস্ময়-এর অন্ত থাকতো না। কিন্তু, গল্পের মতো বাস্তবের মাটিতেও যদি এমনটা হয় তখন? হ্যাঁ, চোখ ছানাবড়া হলেও এরকম ঘটনা আমাদের সাদামাটা জীবনেও ঘটতে দেখা যায়। অসুখটার নাম ‘লিথোপেডিয়া’। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ০০০.৫৪ % গর্ভে পাথরের ভ্রূণ জন্মাতে দেখা যায়। চিকিৎসাশাস্ত্রে এটি “স্টোন বেবি” নামে খ্যাত। বর্তমানে অনেক সমালোচকদের মতে, রূপকথার কিংবা প্রাচীন অনেক লোকগাথা  যেমন রোমান উপগাথা “দ্য মেন্ অফ স্টোন”-এর অলীক কল্পনা যে শুধুই ছেলেভোলানো গল্প না, তা যে আসলে প্রতিদিনের জীবনের দৈনন্দিন রোজনামচা থেকে উঠে এসে অনেকাংশেই কখনও কখনও সেই লেখকের দূরদর্শিতার পরিচয় দেয় তার সাক্ষী এরকম অনেক বিরল ঘটনা। যা, অনেক ক্ষেত্রেই, আমাদের তথাকথিত আধুনিক ঝাঁ-চকচকে সমাজকে চমকে দেয়।

২০১৪ সালের ৫ আগস্ট লতা মঙ্গেশকর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্ট্রোলজি বিভাগে বছর ষাটের এক দরিদ্র পরিবারের মহিলা দুই মাসব্যাপী তলপেটের যন্ত্রণা নিয়ে ভর্তি হন। তিনি প্রায় ১৫ দিন ধরে জ্বরে কাবু ছিলেন। তেরো-চোদ্দো বছর বয়সে তিনি প্রথমবার ঋতুমতী হন এবং ১০- ১২ বছর আগেই তার ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে তিনি চার সন্তানের মা।  কিন্তু তা হলেও, ১৯৭৮ সালে শেষবারের মতো গর্ভবতী হওয়ার সময় গর্ভেই তাঁর ভ্রূণের মৃত্যু ঘটে। চিকিৎসকরা তাঁকে অপারেশন করে নেওয়ার পরামর্শ দিলে তিনি ভয়ে করাননি। বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর থেকে প্রায়ই তার তলপেটে যন্ত্রণা হতে শুরু করে।  স্থানীয় চিকিৎসকদের দেখান তিনি। তাঁরা উপসর্গানুযায়ী চিকিৎসাও করেন।

তলপেটের পরীক্ষায় হাইপোগ্যাসট্রিক অঞ্চলে স্পন্দনশীল পিণ্ড পাওয়া গিয়েছিল, যা প্রায় নাভিতলদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। স্পন্দন থাকলেও নড়াচড়া ছিল না।

২৬ জুলাই, ২০১৪ ইউএসজি করা হলে পেলভিক অঞ্চলে পাওয়া যায় জমাট পাথর।

চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুসারে লিথোপেডিয়ন-এর সম্ভাব্য কারণ অনুসারে দেখা যায়, প্রাথমিক পাথুরে ভ্রূণ বা আধা পরিণত ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের সময়ে যদি গর্ভেই নষ্ট হয়ে যায় অথবা তার নিষ্কাশন করা হয় ভ্রূণের তিন মাস বয়সের মধ্যে, তখন এরকম অস্বাভাবিক অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে।

‘লিথোপেডিয়ান’ শব্দটি আসলে একটি গ্রিক শব্দ। এর  ব্যুৎপত্তিগত অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘লিথো’ অর্থাৎ পাথর এবং ‘পেডিয়ন’ শব্দের অর্থ ‘শিশু’। যার একটা মজার নামকরণ করা হয়েছে- ‘স্টোন চাইল্ড’। এইসব ঘটনা শুনলে আমাদের মনে হতেই পারে এইসব রোগ আজকাল বেপরোয়া জীবনযাপন কিংবা হয়তো… ধার্মিকরা বলে বসবেন, কলি যুগের পাপের ফল। কিন্তু, সভ্যতার শিকড় অনুসরণ করলে দেখা যায় দশম শতকে প্রথম সাহিত্যের পাতায় এই লিথোপেডিয়ন রোগটির কথা জানা যায়।  তখনকার এক বিখ্যাত শল্যচিকিৎসক আলবুকাসিস তাঁর ত্রি-বিংশ খণ্ডে রচিত “কিতাব-আল-তাশরিফ” গ্রন্থে এর এই প্রস্তর শিশু এবং তার জীবনকাল সমন্ধে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। আনুমানিক এগারোশো  খ্রিস্টপূর্বাব্দে কের রাষ্ট্রে সম্রাট এডওয়ার্ড প্লেটুর রাজত্বকালে সম্ভবত  বিশ্বের প্রাচীন লিথোপেডিয়নের কঙ্কালের সন্ধান পাওয়া যায়। সেই সময়কালে প্রত্নতাত্বিকরা এক খননকার্য চলাকালীন একটি গর্তে এই বিশ্বের সর্বাপেক্ষা প্রাচীন লিথোপেডিয়ানের সন্ধান পান। পরবর্তীকালে, চতুর্থ শতকে দক্ষিণ ফ্রান্সেও লিথোপেডিয়ানের অংশবিশেষ পাওয়া যায় বলে ঐতিহাসিকরা দাবি করেন। সমাজ সভ্যতার ইতিহাসে খেটে খাওয়া মানুষের গল্পগুলো বোধ হয় একই থেকে যায়। ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা জরিপ করতে বসলে খুব স্বভাবতই যে প্রশ্ন সবার আগে মাথায় আসে সত্যিই কি অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে বা গল্পগুলো পাল্টেছে? নাকি যুগের সঙ্গে শুধু গল্পের চরিত্র আর স্থানের হেরফের ঘটেছে? একটু আগে যে বৃদ্ধার কথা উঠে এসেছিল, তাঁর শেষ সন্তান হওয়ার সময় চিকিৎসকরা জানান, গর্ভাবস্থা থাকাকালীনই তার ভ্রূণের মৃত্যু ঘটে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই চিকিৎসাশাস্ত্রের বিধি অনুসারে তাঁকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেই মৃত ভ্রূণ কেটে বাদ দিতে বলা হয়। কিন্তু, এ পোড়া দেশে রোজ যেখানে পেটের ভাত কিংবা মাথার ছাদের মতো বিষয়েরই ঠিক থাকে না,সেখানে একটা নষ্ট হয়ে যাওয়া ভ্রূণের পিছনে কেন টাকা খরচ করবেন এবং না করলে তার পরিণাম কী হতে পারে স্বভাবতই সে কথাটা ওই বৃদ্ধার মাথায় আসেনি। তার পরিণামস্বরূপ দীর্ঘ ছত্রিশ বছর ধরে ক্রমাগত যন্ত্রনা সহ্য করে যেতে হয় তাঁকে। এরকম একটি ঘটনা ২০০১ সালে মরোক্কতেও দেখা গিয়েছিল। মরক্কোর এক শহর কাসাব্লাঙ্কায় জারা আবুতালিব নামের এক সত্তর বছরের বৃদ্ধা তাঁর যৌবনকালে প্রসব বেদনার সময় অস্ত্রোপচার চলাকালীন ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে আসেন। ওই হাসপাতালে তাঁরই চোখের সামনে অন্য একজন অন্তঃসত্ত্বা মহিলার অস্ত্রোপচারের পর মৃত্যু দেখে তিনি এত ভয় পেয়ে যান যে,  হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসার পরে আর কোনওদিন হাসপাতালে ঘুরে যাওয়ার কথা ভাবেননি। ইতিমধ্যে, তাঁর ব্যথা প্রশমিত হলেও ভ্রূণটি তার জরায়ুর মধ্যেই বেড়ে উঠতে থাকে। তিনিও পূর্বের ওই বৃদ্ধাটির মতোই বছরের পর বছর ধরে শারীরিক যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করেই চলছিলেন। শেষে তাঁর পুত্র একরকম জোর করেই তাঁকে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। প্রথমে চিকিৎসক ভেবেছিলেন যে, তাঁর জরায়ুতে টিউমার হয়েছে। তারপর নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা যায়, তাঁর জরায়ুতে কোনও টিউমারই  নেই। তাহলে কেন এরকম শারীরিক বিকৃতি? সেই রহস্যোদ্ঘাটন স্থানীয় চিকিৎসকদের পক্ষে করা সম্ভব হয়নি। অতঃপর চিকিৎসকদের কথা অনুযায়ী সেই বৃদ্ধাকে তাঁর পুত্র ফ্রান্সে নিয়ে যান এবং সেখানে তাঁর অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকরা প্রায় সেভেন পাউন্ডের লিথোপেডিয়ন তার তলপেট থেকে বাদ দেন! জানা যায়, তাঁর গর্ভে প্রায় অর্ধ-শতকের বেশি সময় ধরে এই লিথোপেডিয়ন! সোজা ভাষায়, এতগুলো বছর ধরে এই স্টোন চাইল্ডকে নিজের মধ্যে বহন করে চলেছেন তিনি! বেশিরভাগ চিকিৎসকরা অবশ্য এই অসুখের পেছনে রোগি এবং রোগির বাড়ির লোকজনের গাফিলতি এবং তাঁদের অশিক্ষাকে দায়ী করেছেন। কিন্তু আমাদের সমগ্র বিশ্বে এখনও যেখানে পুঁজিবাদের প্রবল কোপের ফল স্বরূপ মুষ্টিমেয় কয়েকজনের হাতে প্রভূত জন্মসম্পদ এবং বাকি  সমাজের অবস্থা প্রদীপের নিচের অন্ধকারের মতো, সেখানে একটি দেশের  সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটাতে পারলে কি এই অন্ধকার দূর করা সম্ভব? হয়তো প্রকৃতির এই অদ্ভুত পরিহাস বারবার আমাদের এই প্রশ্নের সম্মুখীন করাবে।

More Articles