রোগী নয়, রোগের মৃত্যু! পোলিও মুক্তির অসম্ভব যেভাবে সম্ভব হলো এদেশে

Polio Free India: ভারতবর্ষের সর্বশেষ পোলিও আক্রান্ত শিশুটির নিবাস এই পশ্চিমবঙ্গেই।

inscript
৩ মিনিট
রোগী নয়, রোগের মৃত্যু! পোলিও মুক্তির অসম্ভব যেভাবে সম্ভব হলো এদেশে

রোগ থেকে মৃত্যু সর্বকালীন সত্য কিন্তু রোগের মৃত্যু? শুনতে আশ্চর্য লাগলেও একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমের সাফল্যের সুবাদে এই আপাত অসম্ভব আজ বাস্তব। জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার আমরা একটি রোগকে চিরতরে বিদায় জানাবার সম্মুখীন| সত্তরের দশকের শেষের দিকে গুটি বসন্ত রোগ নির্মূল হয় গোটা বিশ্ব থেকে। টিকাকরণ কর্মসূচির বিশ্বব্যাপী প্রয়োগ এবং সাফল্যের নিরিখে এটি একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। এই সাফল্যে ভর করে ১৯৮৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল এবং অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত হয় পোলিও উন্মুলন কর্মসূচি।

পোলিও একটি ভাইরাস জনিত সংক্রামক ব্যাধি এবং শিশুদের পঙ্গুত্বের অন্যতম কারণ। পোলিও উন্মুলন কর্মসূচি প্রথম গৃহীত হওয়ার সময়ে সারা বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার শিশু এই রোগে আক্রান্ত হয়ে সারা জীবনের মতো পঙ্গুত্বের শিকার হতো। বিগত প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে এই বিশ্বব্যাপী পোলিও নির্মূল প্রয়াসে যোগদান করেছে প্রায় দু' কোটি স্বেচ্ছাসেবক এবং স্বাস্থ্যকর্মী যারা পোলিও প্রতিষেধক টিকা পৌঁছে দিয়েছে প্রতিটি ঘরে ঘরে – ‘পালস পোলিও’ কর্মসূচির মাধ্যমে। ফলস্বরূপ, আজ পোলিওর সংক্রমণ ও এই রোগে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা তলানিতে এসে ঠেকেছে। ভারতবর্ষের সর্বশেষ পোলিও আক্রান্ত শিশুটির নিবাস এই পশ্চিমবঙ্গেই। কলকাতা থেকে অদূরে, ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে পাওয়া গেছিল এদেশের শেষতম পোলিও আক্রান্ত শিশু। এরপর আরও তিন বছর কোনও নতুন পোলিও রোগে আক্রান্ত শিশুর সন্ধান না মেলায় আজ থেকে ঠিক এক দশক আগে, ২০১৪ সালের মার্চ মাসে ভারতবর্ষ তথা সমগ্র দক্ষিণপূর্ব এশিয়াকে পোলিও রোগ মুক্ত ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

নবজাতকের প্রথম টিকাকরণ: মধুবনী, বিহার

পোলিও নির্মূল করার ভারতবর্ষের এই সাফল্য জন স্বাস্থ্য কর্মসূচির ইতিহাসে এক অনন্য, নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। কেন্দ্রীয় তথা রাজ্য সরকারের তত্ত্বাবধান, আন্তর্জাতিক সহযোগ, স্বাস্থ্যকর্মীদের অনলস একনিষ্ঠতা এবং সর্বোপরি তৃণমূলস্তরে স্বেচ্ছাসেবক ও টিকাকর্মীদের নিরন্তর পরিশ্রম - এই সকলের এক অসাধারণ সমন্বয়ে বাস্তবায়িত হয়েছিল পোলিও নিধন যজ্ঞ। আসমুদ্র হিমাচল ভারতবাসী এই কর্মসূচিতে সামিল হয়ে পোলিওকে চিরতরে নির্বাসিত করতে সক্ষম হয়। যার ফলে আজ এক দশক পরেও এ দেশের শিশুরা এই ভয়ানক রোগের থেকে সুরক্ষিত। দেশের জনপ্রিয় তারকারাও সামিল হয়েছিলেন এই কার্যক্রমকে মানুষের আরও কাছে পৌঁছে দিতে। বারো-মাসে-তেরো-পার্বণের এই দেশ যেন আরও একটি উৎসব খুঁজে পেয়েছিল ‘পোলিও রবিবার’-গুলির মাধ্যমে।

কোশি নদীর বন্যাপীড়িত এলাকায় পোলিও টিকাকরণ কর্মসূচি : মধুবনী, বিহার

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জীবনের ৭২ বছর লোহার ফুসফুসে বেঁচে আছেন! অবাক করবে এই বৃদ্ধের কাহিনি

Polio Iron Lungs : ২০২০ সালে আলেকজান্ডার তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে একটি বই লিখেছিলেন, থ্রি মিনিটস ফর আ ডগ: মাই লাইফ ইন অ্যান আয়রন লাং।

তবে, বিশ্বের নানা প্রান্তে অসামান্য সাফল্যের পরও পোলিও নির্মূল করার কাজ আজও অসম্পূর্ণ। মূলত রাজনৈতিক অস্থিতরতা ও ভৌগোলিক অবস্থানগত বাধা বিপত্তির জেরে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান - এই দুই দেশে পোলিও তথা অন্যান্য টিকাকরণ কর্মসূচি অনেকাংশেই ব্যাহত হচ্ছে। এই অঞ্চলের বিক্ষিপ্ত হিংসাত্মক ঘটনায় স্বাস্থ্য তথা জনহিতকর কর্মসূচির ব্যাঘাত ঘটেছে, এমনকী বেশ কিছু স্বাস্থ্যকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবক নিহতও হয়েছেন। মানব সমাজের কিছু অংশের এই আত্মঘাতী অভিমুখ সম্ভবত আপামর ভাইরাসকুলকেও বিব্রত করবে।

নবজাতকের প্রথম টিকাকরণ : পুরুলিয়া, পশ্চিমবঙ্গ

করোনা অতিমারীর আবর্তে ভারতবর্ষের আজকের এই পোলিও-মুক্তি ঘোষণার দশকপূর্তি ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ। করোনা ভাইরাসের মতোই পোলিও ভাইরাস বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে খুব দ্রুত ছড়াতে সক্ষম। স্বভাবতই, ভারত তথা বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলি পোলিও-মুক্ত হলেও পোলিও বিপদমুক্ত নয়, যতদিন না বিশ্বের সকল প্রান্ত থেকে পোলিও নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে। নিয়মিত টিকাকরণের মাধ্যমে শিশুদের যথাযথ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলা একান্ত জরুরি। অন্যদিকে, পোলিও কর্মসূচির দেশব্যাপী সাফল্য ও অভিজ্ঞতা করোনা ভাইরাস টিকাকরণ পরিকল্পনার জন্য এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

পোলিও টিকাকরণ কর্মসূচির সাফল্যের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দৃঢ়ভাবে আশা করা যায় যে, শিশুদের স্নায়ুতন্ত্রে নয়, খুব শীঘ্রই পোলিও ভাইরাসের স্থান হবে জন স্বাস্থ্য কর্মকাণ্ডের উজ্জ্বল সাফল্যের ইতিহাসের পাতায়।

ছবি: পোলিও টিকাকরণ কর্মসূচি ও নবজাতকের স্বাস্থ্য নিরীক্ষণ: মোরাদাবাদ, উত্তর প্রদেশ

লেখক ডাঃ আনন্দ শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম কলকাতায়। কলকাতা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ থেকে স্বর্ণপদক পেয়ে ডাক্তারি ডিগ্রি লাভ ও পরবর্তীকালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতোকত্তোর পড়াশোনা বিশ্ব জন স্বাস্থ্য নিয়ে। কর্মজীবনের প্রথমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হয়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে পোলিও নির্মূলের জন্য কাজ এবং বিগত প্রায় দেড় দশক বিশ্বব্যাপী পোলিও ভাইরাস ও টিকাকরণ গবেষণায় নিয়োজিত। বর্তমানে তাঁর নিবাস ও কর্মস্থল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটেল শহরে। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ব বিদ্যালয়ে সংক্রামক ব্যাধি ও টিকাকরণ সংক্রান্ত বিষয়ের অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।