রহস্যময় স্বপ্নাদেশ পেয়েই হলেন চিকিৎসক থেকে আদ্যাপীঠের সন্ন্যাসী! কে এই অন্নদা ঠাকুর?

Adyapeeth: শ্রীরামকৃষ্ণ অন্নদা ঠাকুরকে বলেন ইডেন গার্ডেনসে যেতে। এক ঝিলের পাশে নারকেল আর পাকুড় গাছের কাছ থেকে একটি কালীমূর্তি নিয়ে আসতে বলেন শ্রীরামকৃষ্ণ।

আদ্যাপীঠ। দক্ষিণেশ্বরের রানি রাসমণির স্মৃতিবিজড়িত ভবতারিণীর পরেই এই দেবীকে নিয়েও রয়েছে একাধিক কথকতার ভিড়। লীলা, রামকৃষ্ণ পরমংসদেবের কাহিনি জড়িয়ে থাকার মধ্যেই এখনও আদ্যার জাগ্রত-শরণে উপস্থিত হন ভক্তরা। আর যাঁর জন্য এই দেবীর প্রতিষ্ঠা হয় উত্তর ২৪ পরগনার আদ্যাপীঠে, আজ তাঁর আবির্ভাব দিবস। দেবীর সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে ঘিরেও রয়েছে নানা কথা।

আদ্যা শব্দের অর্থ কী?

আদ্যা; আদিভূতা, আদিতে জন্ম হয়েছে এমন। শক্তির দেবী। লোকবিশ্বাস, মহামায়াই জগৎ সৃষ্টির আদি কারণ। পরমেশ্বরীও বলা হয় তাঁকে। দশমহাবিদ্যার পৌরাণিক অনুষঙ্গে আদ্যার কথা অনেকক্ষেত্রে না বলা হলেও আদ্যাও কালীর এক রূপ। যাঁকেও শিবের ঘরণী হিসেবেই অভিহিত করা হয়। শক্তির দেবী হিসেবেই প্রতিষ্ঠা এই রূপের। মূলত, ‘কালী’ শব্দটি ‘কাল’ শব্দের স্ত্রী-লিঙ্গ। কাল যুক্ত ই। মহাভারতের ‘ভদ্রকালী’ পার্বতীর রূপ। আবার পুরাণে দুর্গার একাধিক রূপ এবং অনুষঙ্গে কালীর কথা পাওয়া যায়। ‘তোড়লতন্ত্র’ অনুসারে কালীর ন’টি রূপ রয়েছে। দশমহাবিদ্যার প্রথম কালীর রূপ নিয়েও রয়েছে একাধিক রটনা। সেখানেই শ্মশান কালী থেকে শুরু করে গুহ্যকালী, বিভিন্নরূপে পূজিতা হন তিনি। আবার ভবতারিণী থেকে করুণাময়ী, অপেক্ষাকৃত শান্তস্নিগ্ধ রূপেও প্রতিষ্ঠা পান দেবী। এইরকম এক ক্ষেত্রই হল আদ্যা।

আরও পড়ুন- পুরুষকে দেখে লজ্জায় জিভ কাটা! নবদ্বীপে যেভাবে তৈরি হয়েছিল প্রথম কালীমূর্তি

আদ্যার মূর্তি বিশেষত্ব

আদ্যার মূর্তির অবস্থানে রয়েছে বিশেষত্ব। মন্দিরের ওঙ্কারের মধ্যে রয়েছে আদ্যার মূর্তি। মূর্তির মাথার উপরে রাখা হয় রাধাকৃষ্ণের ছবি বা মূর্তি। পায়ের কাছে থাকেন রামকৃষ্ণদেব। আর এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতার মূর্তি বা ছবিও থাকে কাছেই। কিন্তু রাধাকৃষ্ণ এবং রামকৃষ্ণের প্রাধান্য বেশি এখানে। বেদিতে লেখা থাকে জ্ঞান, কর্ম এবং রামকৃষ্ণের মূর্তির নিচে লেখা থাকে গুরু। আদ্যার গায়ের বর্ণ কালো হলেও তাঁর সাজে থাকে অভিনবত্ব। নবদ্বীপের আগম্বেশ্বরী দেবীর মুকুটের মতো তাঁর মুকুট। যেখানে বিভেদ নেই শাক্ত এবং বৈষ্ণবের। এখানে দেবী আড়ম্বরহীন। এবার আসা যাক অন্নদা ঠাকুরের রহস্য। মর্ত্যে আদ্যা বা আদ্যাশক্তির আরাধনায় জড়িয়ে রয়েছে অন্নদা ঠাকুরের নাম। যাঁকে ঘিরে রয়েছে রহস্যের ভিড়ও। 

কে তিনি?

এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অন্নদা ঠাকুর (Annada Thakur)। অন্নদা ঠাকুর আসলে ছিলেন অবিভক্ত বাংলার চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দা। সেখানেই জন্ম তাঁর। আসল নাম অন্নদাচরণ ভট্টাচার্য। মা তিলোত্তমা দেবী। বাবা অভয়চরণ ভট্টাচার্য। অভয় ও তিলোত্তমার মোট তিন সন্তান। যাঁদের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান অন্নদাচরণ। বরাবর মেধাবী অভয়চরণ পড়াশুনার জন্য কলকাতায় আসেন। আয়ুর্বেদ চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা ছিল। অবশেষে কবিরাজি নিয়ে পড়তে শুরু করেন অন্নদা। ১৩২১ সাল (বাংলার) নাগাদ কবিরাজি পাশও করেন তিনি। তাঁর বাস ছিল, কলকাতার আর্মহাস্ট স্ট্রিটে এক বন্ধুর বাড়িতে। সেখান থেকেই বৃত্তি নিয়ে কবিরাজি পাশ করেন। বন্ধুর পরিবার, বিশেষত বন্ধুর বাবার সহযোগিতায় একটি কবিরাজি ওষুধের দোকান খোলেন ভাড়ায়।

অন্নদা ঠাকুর

অন্নদাচরণের আদ্যাপীঠ

জানা যায়, কলকাতায় থাকতে থাকতেই একবার নাকি বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে বাংলাদেশে যান অন্নদাচরণ। কিন্তু তার আগে থেকেই অন্নদাকে ভাবাচ্ছিল এক সন্ন্যাসীর স্বপ্ন। তিনি নিজের বাড়িতে ফিরেও সেই একই স্বপ্ন দেখতে থাকেন। বারবার একই সন্ন্যাসীর স্বপ্নাদেশ পান তিনি। আর দেরি করেননি, ফের ফিরে আসেন কলকাতায়। ওঠেন সেই আর্মহাস্ট স্ট্রিটের বন্ধুর বাড়িতে। ফের একই স্বপ্ন দেখেন। আবারও অভয়চরণের স্বপ্নে আসেন সেই সন্ন্যাসী। এরপর ঘটে আরও চমৎকার! এবার অন্নদা ঠাকুর স্বপ্নাদেশ পেলেন শ্রীরামকৃষ্ণের। সেই স্বপ্নাদেশ ছিল খানিক এইরকম; শ্রীরামকৃষ্ণ অন্নদা ঠাকুরকে বলেন ইডেন গার্ডেনসে যেতে। এক ঝিলের পাশে নারকেল আর পাকুড় গাছের কাছ থেকে একটি কালীমূর্তি নিয়ে আসতে বলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। স্বপ্নাদেশ মেনেই অভয়চরণ ঝিলের পাশ থেকে উদ্ধার করেন ওই কালীমূর্তি। সেটিই ছিল আদ্যামূর্তি। পরে জানা যায়, ওই দেবী অর্থাৎ আদ্যার স্বপ্নাদেশ পেয়ে দুর্গাপুজোর বিজয়া দশমীর তিথিতে সেই আদ্যামূর্তিটি বিসর্জন দেন অন্নদা ঠাকুর। গঙ্গায় বিসর্জনের আগে নাকি সেই মূর্তির ছবি তুলিয়ে রাখেন। সেই ছবি দিয়েই তৈরি হয়েছে আজকের আদ্যা। পরে অন্নদার দীক্ষা নিয়েও রয়েছে রহস্য। বলা হয় সেটিও নাকি স্বপ্নেই পান তিনি। সেই স্বপ্নদীক্ষা দেন শ্রীরামকৃষ্ণ!

আরও পড়ুন- নেপথ্যে অদ্ভুত এক প্রেমকাহিনি! বর্ধমানের বিদ্যাসুন্দর কালীর ইতিহাস আজও রহস্যে ভরা

অন্নদা-উবাচ

দক্ষিণেশ্বরের কাছের এই আদ্যাপীঠের সমস্ত উপাচার পালন হয় অন্নদা ঠাকুরের দিয়ে যাওয়া নির্দেশ অনুয়ায়ীই। কথিত আছে অন্নদা ঠাকুর বলেন, মন্দিরের আয় যা হবে, সেই টাকায় বালকদের জন্য তৈরি হবে ব্রহ্মচর্যাশ্রম। আর শুধু বালক নয়, বালিকাদের জন্যও তৈরি হবে আর্য নারী সংক্রান্ত শিক্ষাদানের জন্য প্রতিষ্ঠান। সংসার ত্যাগ করেছেন যাঁরা সেই সন্ন্যসী বা সন্ন্যাসীসমদের জন্য তৈরি করা হবে বাণপ্রস্থ আশ্রম। একদা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক হতে চাওয়া অন্নদা সংক্রামক রোগ নিবারণের চেষ্টা করলেন ফের। হাসপাতাল তৈরির ইচ্ছাও ছিল তাঁর। কিন্তু মাত্র ৩৮ হছর বয়সে পুরীতে প্রয়াত হতেই সেই ভাবনা পূরণ হয়নি আর। তবে সেই ইচ্ছা থেকেই চালু হয়েছে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসার ব্যবস্থা। রয়েছে অ্যাম্বুল্যান্স। যার গায়ে অন্য অ্যাম্বুল্যান্সের মতো লেখা নেই 'সংক্রামক ব্যাধির জন্য নহে।'

আদ্যা-ভোগের বিশেষত্ব

আদ্যাপীঠের ভোগ রান্নায় রয়েছে আলাদা আলাদা নিয়ম। এই মন্দিরে আদ্যার পাশাপাশিই রোজ ভোগ রান্না হয় শ্রীরামকৃষ্ণের জন্য, রাধাকৃষ্ণের জন্যও। আদ্যার ভোগের জন্য সাড়ে বাইশ সের চাল নেওয়া হয় নিয়মিত। আর রাধাকৃষ্ণের জন্য থাকে সাড়ে বত্রিশ সের চালের ভোগ রান্নার ব্যবস্থা। রামকৃষ্ণদেবের ভোগ হয় সাড়ে বারো সের চালে। পঞ্চব্যঞ্জনে নিবেদন হয় তাঁদের ভোগ। থাকে পরমান্ন বা পায়েস। অন্নদা ঠাকুরের নির্দেশে এখানে বড় বা মূল মন্দিরে সব ভোগ যায় না। শুধু পরমান্ন নিবেদন করা হয় দেবীকে। বাকি ভোগ নিবেদন হয় পাশের ভোগালয়ে। ভক্তদের জন্যও এখানে রোজ ভোগ খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

More Articles