অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় বসে 'ম্যাজিক' শুরু, যেভাবে তৈরি হল 'নাটু নাটু' গান

Naatu Naatu Golden Globe: ‘মিরাপা টোক্কু’ (লাল লঙ্কা) ‘দুমুকুল্লাদাতাম’ (উপরে নিচে লাফানো) শব্দগুলি তেলেঙ্গানায় খুব সাধারণ কথ্য শব্দ। সেই সময় তেলেঙ্গানার প্রধান খাবার ছিল জোয়ার। এই খাবার খাওয়া হতো ঝাল ঝাল লাল লঙ্কা দিয়ে।

Madhurima Dutta
৪ মিনিট
অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় বসে 'ম্যাজিক' শুরু, যেভাবে তৈরি হল 'নাটু নাটু' গান

তেলগু সিনেমা 'RRR'-এর বিখ্যাত গান 'নাটু নাটু' সেরা মৌলিক গানের গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার জিতেছে। বলাবাহুল্য, বেশ কয়েক বছর ধরেই বলিউডি সিনেমার জনপ্রিয়তাকে হেলায় পিছনে ফেলে দিয়েছে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা। বিষয়ে হোক বা নির্মাণে, অভিনয়ের সাবলীলতা হোক বা প্রযুক্তির ব্যবহারে মালয়ালম, তামিল, তেলগু ভাষার সিনেমা প্রকৃত সিনেপ্রেমীদের পছন্দের তালিকায় উঠে এসেছে অচিরেই। দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা তার 'লার্জার দ্যান লাইফ'- ঘরানার জন্য পরিচিত ছিল। এখনও অনেকক্ষেত্রে তাই রয়েছে, তবে তাতেও যেভাবে বিষয়, অভিনয় আর যাবতীয় প্রযুক্তিকে তুলে ধরা হচ্ছে তাতে শুধু ভারত নয়, বিশ্বই হাঁ! দক্ষিণ ভারতীয় সঙ্গীতের আভিজাত্য সুপ্রাচীন। ধ্রুপদী ঘরানার পাশাপাশিই সমসাময়িক সঙ্গীতও বিশ্বের কাছে ভারতীয় সঙ্গীতচর্চার মাটি-ধুলো মাখা গন্ধ নিয়ে গেছে। দক্ষিণ ভারতীয় সুরের জাদুতে গোল্ডেন গ্লোবের মতো মঞ্চও মুগ্ধ! সারা দেশ নাটু নাটু অথবা তার হিন্দি ভার্সন নাচো নাচোতে মেতে রয়েছে বেশ কিছুকাল ধরেই। কীভাবে তৈরি হল এই গান?

'নাটু-নাটু' (হিন্দিতে নাচো-নাচো) গানটিতে নেচে তাক লাগিয়েছেন এনটিআর আর রামচরণ। গোল্ডেন গ্লোবের মঞ্চ অবধি এই ভারতীয় গানের যাত্রাপথও ছিল আসলে সিনেমার মতোই। এই গানটি বড়পর্দায় আনার আগে সিনেমার পরিচালক এসএস রাজামৌলি, সঙ্গীত পরিচালক কিরাবাণী এবং গীতিকার চন্দ্রবোস ঠিক কী পরিকল্পনা করেছিলেন জানলেও অবাক হতে হয়। সেরা মৌলিক গান বলতে সেই গানটিকেই বোঝানো হয় যা বিশ্বের যে কোনও ভাষায় একটি চলচ্চিত্রের জন্য ব্যবহৃত গান, যে গানে আগের কোনও গান, সুর, বিষয়বস্তু বা অর্থের কোনও প্রভাব নেই। এই বিভাগে নাটু নাটুকে লড়তে হয়েছে মনোনয়ন পাওয়া অন্য ৮০টি গানের সঙ্গে।

‘নাটু-নাটু’ শব্দ থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় একটি ‘জনগণের গান’। এসএস রাজামৌলি জানতেন এনটিআর জুনিয়র এবং রাম চরণ দুজনেই তেলগু সিনেমা জগতের সেরা নৃত্যশিল্পী। দু’জনেই নিজেদের মেধা আর প্রতিভার বহু প্রমাণ বারবার দিয়েছেন। দু'জনকে পর্দায় একসঙ্গে নাচানোর সুযোগ তাই হাতছাড়া করতে চাননি রাজামৌলি। নিজের এই ইচ্ছার কথা সিনেমার সঙ্গীত পরিচালক কিরাবাণীকেও জানান রাজামৌলি। এর আগে বিবিসিকে এই বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে কিরাবাণী জানিয়েছিলেন, "রাজামৌলি আমাকে বলেছিলেন, বড় ভাই, আমি এমন একটা গান চাই যেখানে দুই বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী একে অপরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নাচবে।" কিরাবাণী তখন গানটি লেখার জন্য তেলগু চলচ্চিত্রের এই যুগের অন্যতম বিখ্যাত এবং তাঁর প্রিয় গীতিকার চন্দ্রবোসকে বেছে নেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জনপ্রিয় গানের সুর নকল করেই বাজিমাত? কোন জাদুতে ৫০ বছরেও অমলিন 'চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে'!

Zeenat Aman Churaliya Hay Tumne: সবাই এই দৃশ্যে জিনাতের ফ্যাশনে এতই ঘায়েল হয়ে যান যে পরে পরিচালক জিনাতকে নিজের ড্রেসিং স্টাইল বেছে নেওয়ার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেন।

কিরাবাণী চন্দ্রবোসকে বলেছিলেন, গানটা এমন হবে যাতে দুই অভিনেতাই প্রচণ্ড উত্তেজিত থাকবেন আর তাঁদের নাচের মাধ্যমেই এক উত্তেজনা এবং উত্সাহ দর্শক শ্রোতার মধ্যেও ছড়িয়ে পড়বে। সুতরাং যা ইচ্ছা লেখা যায়, শুধু মাথায় রাখতে হবে সিনেমাটি ১৯২০ সালে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। তাই শব্দগুলো যেন সেই সময়েরই হয়। ব্যাস! শুরু হলো কাজ। রাজামৌলি, কিরাবাণী এবং চন্দ্রবোস ২০২০ সালের ১৭ জানুয়ারি এই গানটি নিয়ে কাজ শুরু করেন। হায়দরাবাদের অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় ‘RRR’ অফিসে বসে কাজ শুরু হয়।

চন্দ্রবোস গানের নির্দেশ মাথায় নিয়ে গাড়িতে চাপলেন। রাজামৌলি এবং কিরাবাণীর কথাগুলো তখন মনের মধ্যে ঘুরছে। গাড়ি অ্যালুমিনিয়াম কারখানা থেকে জুবিলি হিলসের দিকে ছুটে চলেছে তখন। হাত গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে আছে, আর মন খুঁজছে ম্যাজিক। সেই ম্যাজিক যা এনটিআর-রামচরণ আর রাজামৌলিকে নয় সারা দেশকে নাচাবে। মনে মনে শব্দ দুটো বারবার ধাক্কা দেয়, নাটু-নাটু। কিন্তু একে বসাবেন কোন সুরে? সুর তো তৈরিই হয়নি। চন্দ্রবোস তাল গুনতে শুরু করলেন। কিরাবাণীর প্রিয় তালের দিকেই এগোচ্ছে এই নাচের ছন্দও। বছর ২৫ আগে কিরাবাণী চন্দ্রবোসকে বলেছিলেন, এই বিশেষ তাল যে কোনও মানুষকেই উত্তেজিত করতে পারে।

নাটু নাটু এমনই এক গান যা এই তালে শুধু দেশের মানুষকে নয়, পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তের মানুষকে পা নাচাতে বাধ্য করতে পারে। দুই দিনে গানের তিনটি অংশ তৈরি করে কিরাবাণীর সঙ্গে দেখা করলেন চন্দ্রবোস। প্রথমে দুইখানি শুনিয়ে শেষে নিজের প্রিয় কবিতাটি পড়ে শোনালেন চন্দ্রবোস।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সিনেমা নয়, ওয়েবসিরিজই মাত করেছে ২০২২! কোন কোন সিরিজ, সিনেমা জিতেছে মন?

Best Web Series and Cinema of 2022: ২০২২ সালে এই সিনেমা আর ওয়েবসিরিজ না দেখা থাকলে সত্যিই মিস!

"পোলামাগাট্টু ধুম্মুলোনা পোটলগিত্তা ধুকিনাত্তু / পোলেরাম্মা জাতরালো পোথারাজু ওগিনাত্তু / কিরুসেপলু এসিকোনি কারাসামু সেসিনাত্তু / মারিসেত্তু নিদালোনা কুরাগুম্পু কোডিনাত্তু।"

কিরাবাণী তো চমৎকৃত! এইটাই হবে! এই কথাতেই বসবে সুর! দুই দিনেই গানটির নব্বই শতাংশ কাজ শেষ। তারপর অবশ্য একেবারে ফাইনাল করতে সময় লেগে যায় ১৯ মাস!

সিনেমাতে, ভীম মানে জুনিয়র এনটিআরে চরিত্রটি তেলেঙ্গানার এবং রাম অর্থাৎ রাম চরণের চরিত্রটি অন্ধ্র প্রদেশের। তাই গানটিতে দুই ক্ষেত্রেই ১৯২০ সালের কথ্য ভাষার শব্দ নেওয়া হয়েছে। যেমন, ‘মিরাপা টোক্কু’ (লাল লঙ্কা) ‘দুমুকুল্লাদাতাম’ (উপরে নিচে লাফানো)। এই শব্দগুলি তেলেঙ্গানায় খুব সাধারণ কথ্য শব্দ। সেই সময় তেলেঙ্গানার প্রধান খাবার ছিল জোয়ার। এই খাবার খাওয়া হতো ঝাল ঝাল লাল লঙ্কা দিয়ে। তেলগুতে অনেক লোককাহিনি আছে যাদের চরিত্রগুলোও ব্যবহার করা হয়েছে এই গানে। গানটি গেয়েছেন কালভৈরব ও রাহুল সিপলিগঞ্জ।

'নাটু নাটু' গানে এনটিআর এবং রাম চরণের নাচের ক্ষমতা দেখে বলিউডের তাবড় শিল্পীরাও স্তব্ধ! কোরিওগ্রাফার প্রেম রক্ষিত এই গানটির জন্য প্রায় ৯৫টি স্টেপ তৈরি করেছিলেন। সেই স্টেপের ৩০ খানা সংস্করণও তৈরি করেছিলেন। বিশেষ করে সেই দৃশ্যে যেখানে এনটিআর এবং রামচরণ হাত ধরে নাচছেন। গানটি ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনে শুট করা হয়েছে। এখানে শুটিং চলাকালীনই রাজামৌলি এবং কিরাবাণী গানের শেষ স্তবকটি পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেন। চন্দ্রবোস তখন ‘পুষ্পা’ ছবির সেটে ব্যস্ত। কনফারেন্স কলে জুড়লেন তিন জন। শেষ স্তবকটি পালটে গেল ১৫ মিনিটের মধ্যে।

বাকিটা? ইতিহাস...

লিখেছেন
Madhurima Dutta
Madhurima Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।