বঙ্গভঙ্গ থেকে নকশাল আন্দোলন, ১২০ পেরিয়েও কলকাতার সেরা কেক ঠিকানা নাহুমস

Nahoum and sons Bakery : কলকাতার কেক সাম্রাজ্যে এখনও স্বমহিমায় নাহুমস

Kankana Mukherjee
৩ মিনিট
বঙ্গভঙ্গ থেকে নকশাল আন্দোলন, ১২০ পেরিয়েও কলকাতার সেরা কেক ঠিকানা নাহুমস

কেক নিয়ে বাঙালির এক চিরন্তন ভালোবাসা। বছরভর যে কোনও উৎসবেই আজকাল জাঁকিয়ে বসেছে কেক। উৎসবের অভিনবত্ব যেন ওখানেই। আজকাল কেকের বাজারে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। বাজারের নামজাদা দোকানের পাশাপাশি এখন বাড়ি বাড়ি কেক মেকিংয়ের হুজুগ। বাহারি সাজের কাস্টোমাইজ কেকে বাজার ছেয়েছে। কিন্তু সাবেকি স্বাদের নস্টালজিয়া আজও বাঙালিকে টেনে নিয়ে যায় শতাব্দী প্রাচীন আস্তানায়।

নাহুমস বেকারি। শহর কলকাতার বুকে টিকে থাকা সেকেলে কেকের ডেরা। সময়ের স্রোতে ঘষা লেগে আজও বাজার চলতি আধুনিকতায় পাল্লা দিচ্ছে নিয়ত। সেলেব্রিটি শেফ থেকে ফুড ব্লগার— কলকাতায় এলে একবার অন্তত এখানে পা পড়া চাই এ দোকানে। বাঙালির রসনা তৃপ্তির যে গোপন রসায়ন তাঁরা আয়ত্ত করেছেন তার শুরুটা হয় ১৯০২ সালে, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ১২০ বছর আগে। নাহুম ইজরায়েল মরদেকাই নামের এক ইহুদি তৈরি করেন এই বেকারির দোকান। উত্তরাধিকার সূত্রে এ দোকানের আজকের মালিক তাঁর নাতি ৮০ ঊর্ধ্ব আইজ্যাক নাহুমস। তিনিও এ দোকানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন একেবারে ছোট বয়স থেকে। তাঁর দীর্ঘ ৬৮ বছরের সফরে কতো বদলই না দেখলেন কলকাতার সার্বিক কেক ব্যবসার। চোখের সামনে ইতিউতি গজিয়ে উঠতে দেখলে নামি বেনামী কতো কতো দোকানও কিন্তু তার জেরে নাহুমসের ব্যবসায় ঘাটতি পড়েনি একরত্তিও। আজও কলকাতার বিখ্যাত গলি হগ মার্কেটে রমরমিয়ে চলে নাহুম পরিবারের ব্যবসা। কলকাতায় টিকে থাকা শেষ ইহুদি কেকের দোকানও এটিই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সাধ্যের মধ্যে সাবেকি স্বাদ, ৯০ বছর পার করে এসেও যেভাবে বাঙালির প্রিয় 'বড়ুয়া বেকারি'

Baruya Bakery : যুগের পর যুগ ধরে বাঙালির রসনা-ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করছে কলকাতার বড়ুয়া বেকারি

নাহুমস, নিউ মার্কেটের এই দোকানটি শহরের হেরিটেজের সঙ্গে একদম মিশে গেছে। অবশ্য শুরুতেই দোকান করতে পারেননি ইহুদি ব্যবসায়ী। শুরুর দিকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কেক, পেস্ট্রি বিক্রি করতেন তিনি। স্বাদের ঘরে যাতায়াতের শুরুটা হয় এভাবেই। পরবর্তীতে ১৯১৬ সালে নিউ মার্কেটে এক চিলতে দোকানঘরে শুরু হয় স্থায়ী ব্যবসা। তারপর থেকে বহুকিছু দেখেছে এ দোকান। প্রজন্মের হাত বদল হয়েছে কিন্তু আজও স্বমহিমায় হগ মার্কেটের ঘিঞ্জি এলাকায় টিকে রয়েছে নহুমস বেকারি।

কেক, প্যাটিস, বিস্কুট থেকে শুরু করে হাল আমলের কুকিস, মিলিয়ে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ রকমের মনকাড়া খাবারের সম্ভার রয়েছে এ দোকানে। যদিও এ দোকানের ক্রেতাদের প্রধান আকর্ষণ চকলেট, স্ট্রবেরি কেক কিংবা রাম বল। তবে শীতের সময় প্রধানত বড়দিন এবং নতুন বছরে ক্রেতাদের চোখের মণি হয়ে ওঠে রিচ ফ্রুট কেক। আধুনিকতার চাপে সারা বছর কেকের ব্যবসায় খানিকটা মন্দা গেলেও এই বড়দিনের ভিড়ে মানুষ ফিরে যায় সাবেকিয়ানার কাছেই। নানা রকম স্বাদের রিচ ফ্রুট কেকে মানুষের মন ভোলাতে এ দোকানের জুড়ি মেলা ভার। এছাড়াও শীতকালে আরও একটা জিনিসের চাহিদা তুঙ্গে থাকে, তা হল নাহুমস স্পেশাল পুডিং। বাইরের আবহাওয়ার সঙ্গে যেন ওই উষ্ণ পুডিংয়ের স্বাদ মিলেমিশে একটা অন্য রসায়ন তৈরি করে, জ্বর থেকে চাইলেও পালানো যায় না। তাছাড়াও বছরের অন্যান্য সময়ের জন্য তো রয়েছেই ব্রাটুনি, ব্ল্যাক ফরেস্ট, ক্রুজের মতো নানা কেক ও পেস্ট্রির সম্ভার। শুধু তাই নয়, প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে থেমে থাকেননি এঁরাও। যুগের সঙ্গে 5আল মিলিয়ে অভিনব কেকের ছোঁয়াচ লেগেছে শতাব্দী প্রাচীন দোকানেও। নতুন নতুন কেকের পাশাপাশি এসেছে নানা ধরনের বাজারচলতি বিস্কুট, কুকিসের রকমফের। কিন্তু তাও নস্টালজিয়া টিকে আছে ঐতিহ্যেই।

বঙ্গভঙ্গ, অসহযোগ, স্বাধীনতা, দেশভাগ, নকশাল, কত কত ওঠাপড়ার সাক্ষী থেকেছে এ দোকান। সাক্ষী থেকে যুগ বদলের। সবটুকুই নাহুমস আগলে রেখেছে বুকে করে। ১২০ টা বছর পেরিয়ে এসেও স্বপ্ন দেখছে আরও ১০০ বছরের। যেখানে হয়তো আরও বদলে যাবে এ শহরটা কিন্তু সে বদলের সঙ্গেও অষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকতে থাকতে চায় ইহুদিরা। জড়িয়ে রাখতে চায় তাঁদের প্রিয় নাহুমসকেও।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।